।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
একটি জাতির উন্নয়ন ও অগ্রগতির ভিত্তি গড়ে ওঠে তার শিক্ষাব্যবস্থার উপর। আর সেই ব্যবস্থার কেন্দ্রে অবস্থান করেন শিক্ষক—যিনি শুধু পাঠ্যবই পড়ান না, বরং একটি শিশুকে মানবিক, চিন্তাশীল ও সুশৃঙ্খল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলেন। কিন্তু আফসোসের বিষয়, আমাদের দেশে এই শিক্ষক পেশা এখনও সবচেয়ে অবহেলিত ও মূল্যহীন পেশাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মুখে মুখে ‘শিক্ষক জাতি গড়ার কারিগর’ বলা হলেও বাস্তব প্রেক্ষাপটে তারা বারবার বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে বেতন কাঠামো ও আর্থিক নিরাপত্তার দিক দিয়ে তাদের অবস্থান অত্যন্ত নাজুক।
বর্তমানে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী শিক্ষকতা পেশায় আসতে চান না—এর প্রধান কারণ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক মর্যাদার অভাব। সরকারি শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও অনেক ক্ষেত্রে বেতন কাঠামো যুগোপযোগী নয়, আর বেসরকারি শিক্ষকদের বাস্তবতা তো আরও ভয়াবহ—অনেকে মাসের পর মাস বেতন পান না, আবার অনেকের বেতন পরিবার চালানোর ন্যূনতম প্রয়োজনও মেটায় না। এমন পরিস্থিতিতে একজন শিক্ষক নিজের জীবন-জীবিকা নিয়ে চিন্তিত থাকলে, তিনি শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে কীভাবে গঠন করবেন?
শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন বা পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন করলেই শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন আসে না। বরং একজন শিক্ষককে যত বেশি মানসিকভাবে উদ্বুদ্ধ করা যায়, তার কর্মদক্ষতা ততই বাড়ে। এই উদ্বুদ্ধকরণের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে একটি সম্মানজনক, ন্যায্য ও স্থিতিশীল বেতন কাঠামো নিশ্চিত করা। উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালেই দেখা যায়, যেখানে শিক্ষক পেশা মর্যাদাসম্পন্ন ও আর্থিকভাবে আকর্ষণীয়, সেখানে শিক্ষার মানও অনেক উচ্চস্তরে অবস্থান করছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে শিক্ষক পেশার বাস্তবতা অত্যন্ত জটিল ও হতাশাজনক। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা, স্বীকৃতি না পাওয়া এবং আর্থিক অনিরাপত্তার কারণে এই পেশাটি এখন মেধাবীদের কাছে আকর্ষণ হারাচ্ছে।
প্রথমত, শিক্ষকদের বেতন কাঠামো এখনও প্রয়োজন অনুযায়ী উন্নত হয়নি। সরকারি পর্যায়ে নবম গ্রেডে বেতন স্কেল থাকলেও বাস্তব সম্মান, সুযোগ-সুবিধা এবং কর্মপরিবেশ অনেক সময় সেই গ্রেডের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। শিক্ষককে প্রশাসনিকভাবে ও সামাজিকভাবে যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় না। ফলে অনুপ্রেরণার অভাবে তাঁদের কর্মদক্ষতা প্রভাবিত হয়।
দ্বিতীয়ত, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকরা সবচেয়ে বেশি অবহেলার শিকার। অগণিত শিক্ষক মাসিক ৫ হাজার টাকারও কম বেতনে চাকরি করছেন, আবার অনেক সময় নিয়মিত বেতনও পান না। এমপিওভুক্ত না হলে তাঁরা সরকারি কোনো সুবিধাও পান না। অথচ একই পাঠ্যক্রম অনুযায়ী তাঁদেরকেও শিক্ষাদান করতে হয়।
তৃতীয়ত, শিক্ষক পেশায় পদোন্নতির সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। বছরের পর বছর একই পদে চাকরি করে গেলেও পদোন্নতির কোনো নিশ্চয়তা থাকে না। এতে পেশাগত আগ্রহ ও কর্মস্পৃহা হারিয়ে যায়।
এইসব কারণে নতুন প্রজন্মের মেধাবী তরুণ-তরুণীরা এখন আর শিক্ষকতা পেশাকে ভবিষ্যৎ হিসেবে ভাবতে চান না। তাঁদের চোখে এটি একটি অনিরাপদ, অস্থির ও মর্যাদাহীন পেশা।
অথচ একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষকের উপর। তাই শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই শিক্ষক পেশাকে মর্যাদাপূর্ণ ও আর্থিকভাবে নিরাপদ করে তুলতে হবে।
একটি মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে শিক্ষককে শুধু প্রশিক্ষণ বা পাঠ্যবই দিয়েই যথেষ্ট নয়—তাঁদের আর্থিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা ও মনোবল নিশ্চিত করাও অত্যাবশ্যক। কারণ, শিক্ষকের মান উন্নয়নের সঙ্গে তাঁর বেতন স্কেল সরাসরি সম্পর্কযুক্ত।
ভালো বেতন মানেই একজন শিক্ষকের জন্য মানসিক নিশ্চয়তা। যখন শিক্ষক আর্থিক দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত থাকেন, তখন তিনি শিক্ষাদানে পুরোপুরি মনোযোগী হতে পারেন। তাঁকে অন্য উপার্জনের পথ খুঁজে বেড়াতে হয় না বা ক্লাসের বাইরে বাড়তি আয় করতে গিয়ে সময় নষ্ট করতে হয় না। এর ফলে শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর যত্ন, পাঠদানের মান এবং জবাবদিহিতা বহুগুণে বেড়ে যায়।
অন্যদিকে, কম বেতন বা আর্থিক অনিরাপত্তা শিক্ষকের মনে অসন্তোষ তৈরি করে। একজন শিক্ষক যখন নিজের পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খায়, তখন শিক্ষাদানের মানও বাধাগ্রস্ত হয়। এই বাস্তবতা শুধু একটি দেশের সমস্যা নয়, এটি একটি বৈশ্বিক বাস্তবতা।
বিশ্বের যেসব দেশে শিক্ষক পেশাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেখানে শিক্ষার গুণগত মানও সর্বোচ্চ পর্যায়ে। উদাহরণস্বরূপ, ফিনল্যান্ড, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া—এই দেশগুলোতে শিক্ষকরা পান সম্মানজনক বেতন ও সামাজিক মর্যাদা। ফলস্বরূপ, এই দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থা এখন বিশ্বের রোল মডেল।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষককে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ও মর্যাদাসম্পন্ন অবস্থানে নিয়ে আসা জরুরি। তাই একটি সময়োপযোগী, সম্মানজনক বেতন কাঠামোই হতে পারে গুণগত শিক্ষার ভিত্তি।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এক দীর্ঘদিনের চর্চিত বৈষম্য হলো—সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যে বেতন ও সুযোগ-সুবিধার বিশাল ফারাক। একই পাঠ্যক্রম, একই ক্লাসঘণ্টা ও প্রায় সমপরিমাণ দায়িত্ব পালন করলেও সরকারি শিক্ষকেরা তুলনামূলকভাবে অধিক বেতন, নিয়োগ স্থায়িত্ব, পেনশন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পান। বিপরীতে, অধিকাংশ বেসরকারি শিক্ষককে অস্বাভাবিকভাবে কম বেতনে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। অনেকেই মাস শেষে ঠিকমতো বেতনও পান না।
এই বৈষম্যের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে শিক্ষকের মনোবলে। একজন বেসরকারি শিক্ষক যখন জানেন, তাঁর সহকর্মী সরকারি প্রতিষ্ঠানে একই কাজ করে দ্বিগুণ-তিনগুণ বেতন পাচ্ছেন, তখন তাঁর ভেতরে হতাশা জন্ম নেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই হতাশা তাঁর পেশাগত একাগ্রতা ও উৎসাহে ছেদ টানে। ফলে শ্রেণিকক্ষে তাঁর পাঠদানের মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মেধাবীরা এই পেশায় আসতে অনিচ্ছুক হয়ে পড়ে, যার ফলাফল শিক্ষার মানে অবনতি।
অন্যদিকে, সরকারি শিক্ষকরা তুলনামূলক সুবিধা পেলেও তাঁদের মধ্যেও অনেক সময় মূল্যায়নের ঘাটতি, পদোন্নতির অভাব এবং কাজের চাপ থেকে অনুপ্রেরণার ঘাটতি তৈরি হয়। ফলে সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, শিক্ষকেরা সমাজে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করলেও তাঁরা ন্যায্য আর্থিক ও সামাজিক স্বীকৃতি পাচ্ছেন না।
এই বৈষম্য দূর করতে হলে একটি সর্বজনীন ও সম্মানজনক শিক্ষক বেতন কাঠামো গঠন করতে হবে, যেখানে সরকারি-বেসরকারি শিক্ষক উভয়ের মর্যাদা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত হবে। কারণ, হতাশ শিক্ষক দিয়ে কখনোই একটি গুণগত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা যায় না।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন আনতে হলে শিক্ষক পেশার প্রতি রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও নীতিমালায় মৌলিক সংস্কার আনা জরুরি। একদিকে যেমন শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা প্রয়োজন, অন্যদিকে এই পেশাকে মেধাবীদের জন্য আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। এজন্য কিছু বাস্তবধর্মী সমাধান ও সুপারিশ নিচে তুলে ধরা হলো।
প্রথমত, দেশে একটি জাতীয় শিক্ষক বেতন স্কেল প্রণয়ন করতে হবে, যা সরকারি ও বেসরকারি সব পর্যায়ের শিক্ষকদের জন্য একটি ন্যূনতম মান নির্ধারণ করবে। এতে সরকারি-বেসরকারি বৈষম্য হ্রাস পাবে এবং শিক্ষকরা তাঁদের কাজের যথাযথ মূল্যায়ন পাবেন।
দ্বিতীয়ত, বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য সর্বনিম্ন বেতন নির্ধারণ করে তা আইনি বাধ্যবাধকতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যেন কোনো প্রতিষ্ঠান ইচ্ছেমতো অল্প বেতন দিয়ে শিক্ষক নিয়োগ করতে না পারে।
তৃতীয়ত, শিক্ষক প্রশিক্ষণকে বাধ্যতামূলক করে তাতে ইনসেনটিভ যুক্ত করতে হবে। এতে একজন শিক্ষক প্রশিক্ষণ গ্রহণে আগ্রহী হবেন এবং দক্ষতাও বৃদ্ধি পাবে।
চতুর্থত, শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হলে এ পেশায় আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা বাড়াতে হবে। প্রচার, পুরস্কার ও সম্মাননাভিত্তিক কার্যক্রম চালু করতে হবে।
সবশেষে, নিয়মিত পদোন্নতি ও ইনক্রিমেন্ট নিশ্চিত করা শিক্ষক পেশায় গতিশীলতা আনবে এবং দীর্ঘ সময় একই পদে চাকরি করার হতাশা দূর করবে।
এই সব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে শিক্ষক পেশা শক্তিশালী হবে, এবং শিক্ষাব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত গুণগত পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।
শিক্ষা একটি জাতির ভিত্তি, আর সেই ভিত্তিকে মজবুত করার মূল কারিগর হলেন শিক্ষক। কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তবতায় সেই শিক্ষকরাই সবচেয়ে অবহেলিত একটি পেশার প্রতিনিধি। তাঁদের বেতন, সুযোগ-সুবিধা, প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত মর্যাদা—সব কিছুতেই ঘাটতি প্রকট। ফলে শিক্ষকদের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে চরম হতাশা ও নিরাপত্তাহীনতা, যা শিক্ষাদানে তাঁদের মনোযোগ ও একাগ্রতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। এই অব্যবস্থাপনার সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার মানের ওপর। দুর্বল ও বৈষম্যপূর্ণ বেতন কাঠামোর মধ্য দিয়ে কখনোই একজন শিক্ষককে তাঁর সর্বোচ্চ সামর্থ্য অনুযায়ী কাজে উৎসাহিত করা সম্ভব নয়।
বিশ্বের যেসব দেশে শিক্ষকেরা আর্থিকভাবে স্বচ্ছল, পেশাগতভাবে মর্যাদাসম্পন্ন ও প্রশিক্ষণে দক্ষ, সেসব দেশেই শিক্ষার গুণগত মান শীর্ষে। বাংলাদেশেও শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মানোন্নয়ন ঘটাতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন শিক্ষকদের জন্য একটি সময়োপযোগী, ন্যায্য ও সম্মানজনক বেতন কাঠামো প্রণয়ন করা। এ কাঠামোতে সরকারি ও বেসরকারি সকল শিক্ষকের বেতন ও সুযোগ-সুবিধায় একটি সমতা নিশ্চিত করতে হবে।
একইসঙ্গে শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণ, পদোন্নতি, ইনসেনটিভ ও পেশাগত স্বীকৃতি বাড়াতে হবে, যাতে এই পেশায় আবারও মেধাবীরা আকৃষ্ট হয়। মনে রাখতে হবে, অবহেলিত শিক্ষক দিয়ে উন্নত জাতি গড়া যায় না। তাই শিক্ষকের প্রতি যথাযথ সম্মান এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই শিক্ষার গুণগত উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত।
সুতরাং, শিক্ষক ও শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রকৃত সমাধান লুকিয়ে আছে একটি শক্তিশালী ও সমতাভিত্তিক বেতন স্কেলে।
লেখক : সম্পাদক, শিক্ষাবার্তা।
শিক্ষাবার্তা /এ/০৭/০৮/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
