এইমাত্র পাওয়া

ষাণ্মাসিক মূল্যায়ন: নতুন শিক্ষা কার্যক্রম শিক্ষার্থী বান্ধব নয়

এএন রাশেদা: ‘যেখানে চাষ হইতেছে, কলুর ঘানি ও কুমারের চাক ঘুরিতেছে, সেখানে এ শিক্ষার কোনো স্পর্শও পৌঁছায় নাই। অন্য কোনো শিক্ষিত দেশে এমন দুর্যোগ ঘটিতে দেখা যায় না। তাহার কারণ, আমাদের নূতন বিশ্ববিদ্যালয়গুলি দেশের মাটির উপরে নাই, তাহা পরগাছার মতো পরদেশীয় বনস্পতির শাখায় ঝুলিতেছে’। আজ থেকে শতবর্ষ আগে শিক্ষা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের এই উক্তি আজও কতটা প্রাসঙ্গিক তা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালেই বোঝা যায়। নতুন শিক্ষাক্রমের আওতায় মাধ্যমিকের ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণিতে ষাণ্মাসিক মূল্যায়ন বা অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা শুরু হয় ৩ জুলাই। কিন্তু পরীক্ষার আগের রাতে প্রশ্ন এবং উত্তর ফাঁস হওয়ার অভিযোগ ওঠার পর থেকেই নতুন এই কারিকুলাম নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। প্রশ্নগুলো অবান্তর নয়।

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবম শ্রেণির পরীক্ষা শুরুর আগের দিন অর্থাৎ ২ জুলাই দুপুরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানের কাছে প্রশ্ন পাঠায় এনসিটিবি। নিয়ম অনুযায়ী প্রশ্ন স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কাছে পাঠানো হয়। এনসিটিবি সূত্র অনুযায়ী, অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ‘নৈপুণ্য’ অ্যাপের মাধ্যমে সরাসরি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের আইডিতে দেওয়া হয়। বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রত্যেক শিক্ষার্থীর অগ্রগতির রেকর্ড রাখার জন্য অ্যাপটির অ্যাক্সেস পান। নৈপুণ্য অ্যাপের ইউজার আইডির মাধ্যমে এই মূল্যায়ন নির্দেশনা ডাউনলোড ও বিতরণ কার্যক্রম ট্র্যাকিং করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা আছে। নিয়ম অনুযায়ী সেই প্রশ্নের ফটোকপি করে ৩ জুলাই পরীক্ষা নেওয়া হয়। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) অধীনে সারা দেশের এক কোটির মতো শিক্ষার্থী ষাণ্মাসিক মূল্যায়নে অংশ নিয়েছে। তবে প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার বিষয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের পর শিক্ষা বোর্ড নতুন করে একটি নোটিস জারি করে জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এখন থেকে পরীক্ষার আগের দিন সন্ধ্যায় প্রশ্নপত্র সরবরাহ করা হবে। গত বছর প্রথম, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রম শুরু হয়েছে। চলতি বছর দ্বিতীয়, তৃতীয়, অষ্টম ও নবম শ্রেণিতেও চালু হয়েছে এ শিক্ষাক্রম। অতীতের যেকোনো শিক্ষাকার্যক্রমের মতো নতুন এ শিক্ষাকার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। শিক্ষার সঙ্গে রাষ্ট্রের অনেক কিছুই জড়িত। পরীক্ষাপদ্ধতি, পাঠদান এবং সামগ্রিকভাবে মূল্যায়নÑ সবকিছুর সঙ্গে শিক্ষার সামগ্রিক সম্পর্ক রয়েছে। শিক্ষা কারিকুলাম যখন শিক্ষা সংবেদনশীল হয়ে ওঠে তখন তা শিক্ষার্থী তো বটেই, জাতির জন্যও নানা সুফল বয়ে আনে। নতুন শিক্ষাপদ্ধতিতে এবার হাতে-কলমে কাজ এবং কার্যক্রমভিত্তিক লিখিত অংশের ভিত্তিতে হচ্ছে মূল্যায়ন। প্রশ্নের ধরন একেবারে ভিন্ন। যেমন, বাংলা বিষয়ের মূল্যায়নে হয়তো একটি অনুষ্ঠান কীভাবে আয়োজন করতে হবে, তাতে শিক্ষার্থীরা কীভাবে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করবে ইত্যাদি জানতে চাওয়া হতে পারে। শিক্ষার্থীদের জোড়ায় আলোচনা করে এর ভিত্তিতে নিজ নিজ উত্তরপত্রে লিখতে হচ্ছে। আছে দলগত কাজও। ওই অনুষ্ঠান আয়োজন ঘিরে ব্যানার, আমন্ত্রণ, পোস্টার ইত্যাদির নমুনা তৈরির বিষয়ও আছে। কিন্তু এ পদ্ধতি নিয়ে রয়ে গেছে প্রশ্নও।

নব্বইয়ের দশকে শিক্ষাপদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আনা হলো। তখন পরীক্ষার অর্ধেক নম্বর আনা হলো টিক চিহ্নের ভিত্তিতে। পরবর্তীতে সৃজনশীল পদ্ধতিতে আনা হলো বহুনির্বাচনী প্রশ্ন। নব্বইয়ের দশকে টিক চিহ্নের ভিত্তিতে পরীক্ষা নেওয়ার ফলে শিক্ষার্থীদের খুব বেশি পড়তে হতো না। কারণ সামনে প্রশ্নপত্রে তারা না বুঝে কিছু দাগালেও সম্ভাবনার ভিত্তিতে পাস করে যেতে পারত। বহুনির্বাচনী প্রশ্নপত্রের ক্ষেত্রেও আমরা একই চিত্র দেখেছি। পরীক্ষায় একটা বড় অংশ বহুনির্বাচনী হওয়ায় তা অনেক শিক্ষার্থীর জন্য নিশ্চিত নম্বর। আবার একটি অংশের জন্য পাস করার সুবর্ণ সুযোগ। নব্বইয়ের দশকের পর থেকে যখন পাস করা সহজ হলো তখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে স্কুল-কলেজ চালু হলো। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে গড়ে ওঠা এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষকরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার্থীদের ভর্তি করার বিষয়ে উৎসাহ দিতেন। এমন অনেক ঘটনাই সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

নতুন কারিকুলামে দলগত কাজ, বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে যাওয়ার মতো ভালো কিছু উদ্যোগ রয়েছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে কি তা আমাদের জন্য ভালো, এ প্রশ্নও সংগতকারণেই উঠে আসে। শহর বা মফস্বল অঞ্চলেও অধিকাংশ বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়ে গেছে। অনেক স্কুল এমনকি কলেজে শিক্ষকদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই। দলগত কাজ কিংবা হাতে করা কাজের ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। মফস্বল বা গ্রামীণ অঞ্চলে অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের অভাব রয়েছে। ক্লাসরুম সংকট রয়েছে। ফলে দলগত এই কাজ সমন্বয়ের ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকা নগণ্য হয়ে পড়ছে। আর শিক্ষক না থাকলে শেষ পর্যন্ত অনেক স্থানেই তা পাঠ্যপুস্তকে চমকপ্রদ কিছু পাঠ হিসেবেই থাকে। গ্রামীণ অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা এ ধরনের শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত হতে পারে না। ব্যক্তিগতভাবে মফস্বলের বেশ কজন শিক্ষকের সঙ্গে কথা হয়। তারা জানিয়েছেন, গ্রামীণ অঞ্চলে শহরের মতো এমন সুযোগ-সুবিধা না থাকায় দলগত অনেক কাজই তারা করতে পারেন না। বিদ্যালয়ের ভেতরে ল্যাব বা আনুষঙ্গিক সুবিধা না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই পাঠদানে অসুবিধা হয়। অর্থাৎ নতুন এই কারিকুলাম শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীবান্ধব সামগ্রিক অর্থে নয়।

ষাণ্মাসিক মূল্যায়নের একটি বড় ত্রুটি, এ ধরনের পরীক্ষায় পাঠ্যবই ব্যবহার করা যাবেÑ এমনকি সহপাঠী কিংবা শিক্ষকেরও সহায়তা নেওয়া যাবে। এভাবে শিক্ষার্থী নিজে কতটা আত্মস্থ করতে পারছে তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যদিও বলা হচ্ছে, দলগত কাজ বা কারিগরি নানা শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা প্রশিক্ষিত হয়ে উঠবে। দেশের শিক্ষার্থীরা কারিগরিগতভাবে দক্ষ নয় এমন অভিযোগ বহুদিনের। তাই নতুন কারিকুলামের মাধ্যমে তাদের কারিগরি দক্ষতা বাড়াতেই এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এভাবে সমস্যার সমাধান হবে না। শিক্ষা খাতে এখনও বৈষম্য রয়েছে। কারিগরি, সাধারণ, মাদ্রাসা, ইংরেজি মাধ্যম বাদেও রয়েছে ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষাব্যবস্থা। এখনও আমরা সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন করতে পারিনি। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও রয়েছে শঙ্কা। শিক্ষাপদ্ধতিতে কারিকুলাম প্রণয়নের ক্ষেত্রে আমলা ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থই বেশি প্রাধান্য পায়। সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হওয়ার সময় এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছিল। আমলারা প্রতিবার শিক্ষা উন্নয়নের নামে এই বরাদ্দ পাওয়ার দিকেই মনোযোগী থাকেন। ফলে অপচয় হয় অর্থ এবং শিক্ষাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। এডিবি নিঃস্বার্থভাবে আমাদের এই বরাদ্দ দেয় না। শিক্ষায় বৈষম্য, অবকাঠামোগত সংকট, শিক্ষকদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা, পাঠ্যবই এবং সিলেবাসকে আধুনিকায়ন ব্যতীত বিদ্যমান সংকট কোনোদিন দূর করা সম্ভব নয়।

লেখক: শিক্ষাবিদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

মতামত ও সাক্ষাৎকার কলামে প্রকাশিত নিবন্ধ লেখকের নিজস্ব। শিক্ষাবার্তা’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে মতামত ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক ও আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের;- শিক্ষাবার্তা কর্তৃপক্ষের নয়।”

শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/০৬/০৭/২০২৪


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.