ড. কামরুল হাসান মামুন: গিয়েছিলাম কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজে। অনেক আদর, আপ্যায়ন আর ভালোবাসা পেয়েছি। পুরো হলরুম শিক্ষক আর শিক্ষার্থী দিয়ে কানায় কানায় পূর্ণ ছিলো। লেকচারের সময় কখনো কখনো ছাত্রীদের প্রশ্ন করেছি এবং একদম সঠিক উত্তর পেয়েছি। সবকিছু ছাপিয়ে কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক লিয়াকত আলী লিকু যখন কলেজটি একটু ঘুরিয়ে দেখাতে গিয়ে যখন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে গেলাম মনটা একদম কেঁদে উঠলো। কী জরাজীর্ণ রুম। ছোট দুটো রুম হলো শ্রেণিকক্ষ, ছোট আরেকটি রুম হলো ল্যাব আর অন্য আরেকটি রুমে চার পাঁচজন শিক্ষক বসেন। এরাও বিসিএস ক্যাডার আর বিসিএস প্রশাসনও বিসিএস ক্যাডার। আমার ছাত্র ফারুক এখন মাত্র সহকারী অধ্যাপক। তার সহপাঠীরা যারা বিসিএস অন্য ক্যাডারে যোগ দিয়েছে কোটি টাকার গাড়িতে চড়ে অফিসে যায়, সরকারি বাগানবাড়িতে হয়তো থাকে, তেল খরচ ড্রাইভার পায়, ডেকোরেটেড অফিস পায়। শিক্ষা ক্যাডারে ছাত্রছাত্রীরা কেন আসবে।
এই মহিলা কলেজটি কুমিল্লা জেলা শহরে। কুমিল্লা একটি বিখ্যাত জেলা। এখানকার অনেক মন্ত্রী, আমলা আছে। এই কাজে এইচএসসি, ডিগ্রি পাস, অনার্স এবং মাস্টার্স আছে। আর সবকিছুর জন্য মাত্র দুই/তিনটা রুম। আর সেই তিনটা রুম দেখতে যেন দুর্ভিক্ষে মানুষ যেমন কঙ্কালসার হয় তেমনি এই তিনটি রুমের অবস্থা। সেখানে হোয়াইট বোর্ডের অবস্থাও খুব খারাপ। চেয়ার টেবিলের অবস্থা আরও খারাপ। পুরো ভবনটি ডেম্প, আস্তর খুলে খুলে পড়ছে। এই তিন রুমের একটি বিভাগ যেখানে মাত্র চার পাঁচজন শিক্ষক আছে সেখানে কীভাবে এইচএসসি, ডিগ্রি পাস, অনার্স এবং মাস্টার্স পড়ানো সম্ভব? বড়জোর শুধু এইচএসসি থাকা সম্ভব। তার জন্যও শ্রেণিকক্ষগুলো আর সুন্দর করা উচিত। এই রুমে ছাত্রীরা কিছুক্ষণ বসে থাকবে কীভাবে? আবার সেখানে বসে লেখাপড়া? আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এমন শ্রেণিক্ষক দিয়ে প্রশাসনের লোকজন এসির মধ্যে বিলাসবহুল অফিসে বসতে লজ্জা লাগে না? কুমিল্লায় এতো এতো ক্ষমতাবান এমপি, মন্ত্রী আছেন তাদের লজ্জা লাগে না? এক আ হ ম মুস্তফা কামাল ইচ্ছে করলেইতো সব বদলে দিতে পারতেন। কিন্তু শিক্ষায় কারো কোনো দরদ নেই। তাহলে এই দেশে দুর্নীতিবাজ, ধান্দাবাজ তৈরি হবে নাতো কোন দেশে হবে?
দেশে যুগ্ম সচিবের পদ আছে ৫০২টি, কিন্তু যুগ্ম সচিব পদে কর্মরত আছেন ৯০০-র বেশি। সচিব, উপসচিবসহ অন্যান্য সকল পদের চিত্র একই। শুধু পদ না। সুবিধার দিকেও এরা চরম এগিয়ে। তারা কোটি টাকার ঝটঠ ছাড়া অফিসে যেতে পারেন না। দেশের চরম অর্থনৈতিক সংকটকালেও কোটি টাকার গাড়ি কেনার প্রকল্প পাস হয়েছে মাত্র কদিন আগে। আর কলেজে যেখানে এইচএসসি, ডিগ্রি পাস, অনার্স এবং মাস্টার্স পড়ানো হয় সেখানে শিক্ষক থাকার কথা ন্যূনতম ২৫ জন আছে চার পাঁচ জন শিক্ষক। যেখানে ন্যূনতম ১০ টি স্টেট অফ আর্ট ক্লাস রুম থাকার কথা আছে দুটি জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ। এই দেশ যারা চালায় তাদের লজ্জা হয় না? পাশেই আরেকটি নতুন ১০ তলা ভবন হচ্ছে। সেটির কাজ নাকি ২০১৭ সালে শুরু হয়েছে কিন্তু প্রথম দ্বিতীয় তলা তুলে এখন কাজ প্রায় বন্ধ। শুনলাম ঠিকাদাররা খুব ক্ষমতাবান।
জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ার অজুহাতে যেই দামে কাজ পেয়েছিলো সেই দামে এখন কাজ করবে না। এটা এ একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এখানে যে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে এসব তারা তোয়াক্কা করে না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণে আরও বেশি করে টাকা মারার ধান্দায় থাকে সংশ্লিষ্টরা। শুনলাম এই কলেজের অবস্থাতো বাংলাদেশের শত শত কলেজের চেয়ে ভালো। এর চেয়েও খারাপ অবস্থার সংখ্যা অনেক। আসলে শিক্ষা আমাদের কোনো সরকারের প্রায়োরিটির মধ্যে ছিলো না এবং এখনো নেই। ভালো করার ইচ্ছে নেই বলেই প্রতি বছর শিক্ষায় বরাদ্দ আগের বছরের চেয়ে কমায়। এবার জিডিপির মাত্র ১.৬৯ শতাংশ। অথচ ইউনেস্কো শিক্ষায় জিডিপির ন্যূনতম ৬ শতাংশ দিতে বলে। কোরিয়া, ইসরাইল, জাপান জিডিপির ৫.৫ শতাংশ থেকে ৭.৫ শতাংশ বরাদ্দ দেয়। এমনকি ভিয়েতনামও জিডিপির ৪.৫ শতাংশ দিয়ে আসছে আজ প্রায় বেশ কয়েক বছর ধরে এবং বেশি বরাদ্দের ফলও তারা পাচ্ছে।
লেখক: অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত ও সাক্ষাৎকার কলামে প্রকাশিত নিবন্ধ লেখকের নিজস্ব। শিক্ষাবার্তা’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে মতামত ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক ও আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের;- শিক্ষাবার্তা কর্তৃপক্ষের নয়।”
শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/২৭/০৬/২০২৪
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
