এইমাত্র পাওয়া

শিক্ষার মানের কোন পরিবর্তন হল না: ডক্টর কামাল

২০২৪ সালের এসএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশিত হয়েছে। ফল প্রকাশের পর নানাভাবে বিচার বিশ্লেষণ হয়েছে। আনন্দের বন্যা চারদিকে। এবারের পরীক্ষায় ১১টি বোর্ড থেকে মোট ২০ লক্ষ ১৩ হাজার ৫৯৭ জন শিক্ষার্থী অংশ গ্রহণ করে। পাসের হার ৮৩.৪ শতাংশ। এর মধ্যে ১লক্ষ ৮২ হাজার ১২৯জন শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ পায়। হাসের হার ও জিপিএ প্রাপ্তির এই পরিসংখ্যান দেখে শিক্ষার গুণের যেই বিষয়টি রয়েছে তা কিভাবে নির্ণয় করব? এই প্রশ্নটি আমার মত বহুজনের।

এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হারে অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ হয়েছে। শুধু পরীক্ষায় ভালো ফলাফল নয়, সব সূচকেই ঊর্ধ্বমুখী। পরীক্ষার্থীর সংখ্যা, জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা, শতভাগ পাসের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সবই বেড়েছে। আর পরীক্ষা ফলাফল আকাচুম্বী হলেও শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষাবিদরা। তারা বলেছেন, দেশে প্রচলিত শিক্ষাব্যব¯’ার সম্প্রসারণ হলেও শিক্ষার গুণগত মানের ক্রমাগত অবনতি হ”েছ। এ ছাড়া শিক্ষা ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট ও বিস্তৃত শিক্ষানীতির অভাব যেমন রয়েছে তেমনি সরকারের সঠিক পরিকল্পনা এবং দক্ষ শিক্ষকের অভাবও সুস্পষ্ট। সকল মহল থেকে এই পরি¯ি’তি থেকে বের হবার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা ছাড়া শিক্ষার আসলে কোনো অর্থ নেই। শিক্ষাক্ষেত্রে মানের ক্রমাবনতি রোধ না করতে পারলে জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকারা”ছন্ন হয়ে পড়বে। গুগণত শিক্ষা অর্জনে টেকসইকরণসহ বিশ্বমানের শিক্ষা এবং যুগোপযোগী শিক্ষার জন্য যুগোপযোগী নীতি এবং এর যথাযথ বাস্তবায়ন প্রয়োজন। জিপিএ ও পাসের হার বাড়লেও শিক্ষার মানের যে কোন পরিবর্তন হয়নি সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার চিত্র দেখলে বুঝা সম্ভব। ভর্তি পরীক্ষার ক্ষেত্রে এই ফল কাজে আসেনি। দুইটি জিপিএ-৫ কোন কাজে আসেনি-

শিক্ষার মান উন্নয়নে ভবিষ্যতে কীভাবে এগিয়ে যেতে হবে তার একটি কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ আবশ্যক। পাসের হার বাড়লেই আমরা বলতে পারব না শিক্ষার মান বেড়েছে। এই যে এ বছর এত শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেল তাদের সবার মান তো এক নয়। আর শিক্ষার মান বাড়াতে বাংলাদেশের মানের শিক্ষা নয়, আমাদের প্রয়োজন বিশ্বমানের শিক্ষা। এই প্রসঙ্গে একটি তথ্য তুলে ধরতে চাই। ২০২৩ সালের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ইউনিটের ফল তারই ইঙ্গিত দেয়, ভর্তি পরীক্ষায় ৫৯, ৫০২ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদেও মধ্যে ৪০,৬০১ জন শিক্ষার্থী পাসের ৪০ নম্বর পায়নি। তারা ফেল করেছে। ফেল করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১৬,৮৮৬জন শিক্ষার্থী এসএসসি এবং ১৬০৬৮জন শিক্ষার্থী এইচএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়েছিল। আবার এসএসসি ও এইচএসসি দুটিতে জিপিএ-৫ ছিল ১১,১০০ জন শিক্ষার্থী।

এই ফলাফল কিসের ইঙ্গিত দেয়?

আমাদের শিক্ষাব্যব¯’া যে কতটা মেধাহীন, প্রতিযোগিতাহীন হয়ে পড়েছে তা বুঝবার কোন পথ আর অবশিষ্ট রয়েছে কী?

পরি¯ি’তির উন্নতি হবার কোন সুযোগ আমি আপাতত দেখি না। বর্তমানে করোনা পরবর্তী শিক্ষাঘাটতি চলছে। এরেই মধ্যে নতুন পাঠ্যক্রম। শিক্ষার মেধাহীনতা আরো প্রকট হবে আগামী কয়েক বছরে। সংখ্যা দিয়ে ফল বিবেচনা না করে শিক্ষার মান বাড়াতে প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে উৎপাদশীল শিক্ষাব্যব¯’া তৈরি করতে কাজ করার তাগিদ দেন অনেকেই।

দেশের শিক্ষার গুনগত মান এখনও সেই পর্যায়ে উন্নত করা যায়নি উল্লেখ করেন সকল শ্রেণির পেশার মানুষজন, আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা এবং মাধ্যমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে ভবিষ্যতে কীভাবে এগিয়ে যেতে হবে তার একটি কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা জরুরি।

উন্নয়ন আর অগ্রগতির মহাসড়কে বাংলাদেশের অব¯’ান এখন বেশ পাকাপোক্ত। দারিদ্র্যের খাঁচা থেকে বের হয়ে সমৃদ্ধির পথে সাবলীল গতির সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষা, স্বা¯’্য, খাদ্যসহ জাতিসংঘ ঘোষিত এমডিজি অর্জনেও অব¯’ান বেশ সন্তোষজনক। স্বাবলম্বী হওয়ার কঠিন যুদ্ধে বড়ো অর্জন মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর। বিশ্বব্যাংকের ঘোষণা অনুযায়ী নিম্ন আয়ের দেশ থেকে বেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশ। সময়ের পরিক্রমায় বেড়েছে শিক্ষার হার। উ”চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বেড়েছে অনেক।

উ”চশিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং তা বিতরণ। অথচ আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সার্বিক গবেষণা কার্যক্রমের চিত্র হতাশাজনক। মানসম্মত শিক্ষা কিংবা গবেষণায় উদাসীন হলেও অবকাঠামো নির্মাণে ব্যতিব্যস্ত দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, বিশেষত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। অপরিকল্পিতভাবে শিক্ষার্থীসংখ্যা বৃদ্ধি, অপ্রয়োজনীয় বিভাগ চালু, নিয়োগ বাণিজ্যসহ নানা অনিয়মের সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের শিক্ষার সকল সেক্টর।

মানসম্মত শিক্ষা ছাড়া কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন তলাবিহীন ঝুড়ির মতো। একুশ শতকের উপযোগী শিক্ষা ও উন্নয়ন সহায়ক মানবসম্পদ তৈরিতে শিক্ষার মান উন্নয়ন ও গুণমানের দিকে ‘সর্বো”চ মনোযোগ দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।’ সেই বিকল্প কিভাবে, কখন, কোন পর্যায়ে হতে পারে? আদৌ হবে কিনা এইসব আলোচনার অপেক্ষা রাখে।

বিশ্বের সব দেশ এসডিজি অর্জনে কাজ করছে, আমাদেরও কাজ চলছে। কাজের অগ্রগতিও আশাব্যাঞ্জক। লক্ষ্য অনুযায়ী কর্ম পরিকল্পনা সাজালে আমরা লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবো। কিš‘ বার বারই ঘুওে আসে তাও আদৌ সম্ভব কিনা? সবার মধ্যে শিক্ষার মানের প্রশ্নে ফলাফল। কিš‘ দিন শেষে এই ফলাফল মানের যেই বিস্তর দুরত্ব হয়ে উঠছে তা কতটুকুন আমরা আদৌ বিবেচনায় আনছি। একজন শিক্ষার্থী তার মূল্যায়নের সূচকে কতটুকু এগিয়ে আছে বিষয়ের উপর সেটি বিশেষ বিবেচনায় আনা দরকার, তার নম্বও প্রাপ্তিতে না। অথচ সেই ব্যব¯’া কখনও হয়নি।

ফলাফলের এই চমকপদ বিষয় শেষে দেখা যায় অনেক শিক্ষার্থী কলেজে ভর্তি হয় না। তাদেও ঝওে পড়ার বিষয়টিও বিবেচনায় আনা দরকার। সময়ের সাথে সঙ্গতি রেখে কিভাবে কোন পদ্ধতিতে আমাদেও শিক্ষাকে আরো সমৃদ্ধ করা যায় সেই চিন্তা সকলের মধ্যথেকে আসা উচিত।

দেশে প্রচলিত শিক্ষাব্যব¯’ার সম্প্রসারণ হলেও শিক্ষার গুণগত মানের ক্রমাগত অবনতি হ”েছ। এ ছাড়া শিক্ষা ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট ও বিস্তৃত শিক্ষানীতির অভাব যেমন রয়েছে তেমনি সরকারের সঠিক পরিকল্পনা এবং দক্ষ শিক্ষকের অভাবও সুস্পষ্ট। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বেশি হওয়াতে আনন্দের কিছু নেই। শিক্ষার্থীরা কী শিখতে পেরেছে এটা বেশি গুরুত্ব¡পূর্ণ। যেসব শিক্ষার্থী শিখন ঘাটতি রেখেই জিপিএ-৫ পা”েছ তাদের পরবর্তীতে উ”চশিক্ষায় একটি সংকট দেখা দিতে পারে। ইতিমধ্যে তা দেখা দিয়েছে। যার একটি পরিসংখ্যান আমি তুলে ধরেছি। জিপিএ-৫ এর সংখ্যা বৃদ্ধি না করে বরং শিক্ষার্থীদের বাস্তবিক জ্ঞান এবং তারা কতটা রপ্ত করতে পেরেছে সেদিকে খেয়াল রাখা এই সময়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি। একইসাথে মানবিক মূল্যবোধ, সততা, দেশপ্রেম এবং গভীর জীবনবোধ সম্পন্ন মানুষ হওয়ার দিকেও খেয়াল রাখা জরুরি৷

এইসব অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গুলোতে মনোযোগ না দিলে আমি ভালো কিছুর সম্ভাবনা দেখছি না।

জিপিএ ৫ বাড়লেও শিক্ষায় মান কমার ঘটনাটি উদ্বেগজনক। এবং কোনক্রমেই জিপিএ শিক্ষার মূল সূচক হতে পারে না-কেননা জনসংখ্যার যে বিপুল অংশ তরুণ, যারা জাতিকে ‘তারুণ্যের ডিভিডেন্ড’ দেবে বলে প্রত্যাশা করি, তারাই ক্রমাগত জাতির জন্য বোঝা হয়ে উঠছে। মানহীন শিক্ষা নিয়ে বেড়ে ওঠা এই বিপুল জনগোষ্ঠী একসময় দেশের জন্য ভার হয়ে উঠতে পারে। এইসব আশংকা দিন দিন বেড়ে চলেছে। হতাশার বিষয় হল, তবুও এই বিষয় গুলোকে সামনে আনা হ”েছ না, প্রতিকারের কোন পথও দেখানো হ্েছ না। মানহীন, সমন্বয়হীন এই অব¯’ার পরিসমাপ্তি জরুরী অনেকের মত আমিও মনেকরি। তবেই একটি সুন্দর শিক্ষা দিকে, মানের শিক্ষার দিকে আমরা যেতে পারব।

লেখক : শিক্ষাবিদ-নজরুল গবেষক।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/জামান/২৩/০৫/২৪


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.