ফিরোজ আলমঃ সম্প্রতি এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি নিয়ে গেজেট প্রকাশিত হয়েছে।সেখানে বলা হয়েছে ম্যানেজিং কমিটিতে পরপর ২ বারের অধিক সভাপতি, শিক্ষক প্রতিনিধি সদস্য, অভিভাবক প্রতিনিধি সদস্য হওয়া যাবে না। সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি পাশ……।অন্যদিকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সভাপতির যোগ্যতা নির্ধারন হয়েছে ডিগ্রি পাস।
২০০৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষণা করা হয় যে ২০২১ সালে স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশ ‘ডিজিটাল বাংলাদেশে’ পরিণত হবে।সেটি হয়েছে ও অনেক ক্ষেত্রে।ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দশ লাখ থেকে দশ কোটি হয়েছে।শিক্ষার হার এই সময় দ্বিগুন হয়েছে।কিন্তু বদল হয়নি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনাকারীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা।কম শিক্ষিত,অশিক্ষিত,মধ্য শিক্ষিত অযোগ্য লোক দিয়ে এখনো হরহামেশাই চলছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।অথচ দেশে স্নাতকধারী শিক্ষিত লোকের অভাব নেই।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে শুধু শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৪ লাখের কাছাকাছি।কয়েক বছর আগে ইকোনমিক ইনটেলিজেন্স ইউনিটের জরিপে বলা হয়েছিল, বিশ্বে বাংলাদেশেই শিক্ষিত বেকারের হার সর্বোচ্চ।প্রতিবেদন বলছে, দেশে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করা বেকার যুবকের সংখ্যা ৪ লাখ ১০ হাজারের বেশি। একদিকে স্নাতকধারী লক্ষ যুবক বেকারত্বের গ্লানি বহন করছে অন্যদিকে অষ্টম শ্রেণী পাস, এস এস সি পাস কম শিক্ষিতরা এখনো স্নাতকধারী শিক্ষকদের পরিচালনা করছে।এই সমস্যার সমাধানে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষকরা দীর্ঘদিন প্রতিবাদ করছে।স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর সভাপতি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দরকার বলে জোর তাগিদ দিচ্ছে।অথচ এক শ্রেণীর জ্ঞান পাপীরা আইন প্রকাশ করল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি হতে যোগ্যতা স্নাতক আর মাধ্যমিকের সভাপতির যোগ্যতা এইচ এস সি।এরাই নাকি বঙ্গবন্ধু এবং শেখ হাসিনার স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরন করবে।
২০১৯ সালে দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ন্যূনতম স্নাতক শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়া সভাপতি নয় বলে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই বিধান চালু হলো। কিন্তু সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানিজিং কমিটির ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হল এখন এইচ. এস. সি ।এখন যখন প্রতিষ্ঠান পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির যোগ্যতা এইচ.এস.সি করার গেজেট প্রকাশ হল তখন শিক্ষা ক্ষেত্রে সরকারের ভুল ভাবনা আমাদেরকে চরমভাবে ভাবিয়ে তুলছে নি:সন্দেহে।এমনটির ফলে যা হবে-
ক• প্রতিষ্ঠান সভাপতির হাতে অতীতে প্রায়ই লাঞ্চিত হয়েছেন প্রতিষ্ঠান প্রধান কিংবা স্নাতক/ স্নাতকোত্তরধারী শিক্ষকরা।এখনও সে লাঞ্চনা অব্যাহত থাকবে কিংবা আরো বেশি হবে।যথা লক্ষীপুরে ১৬জুলাই ২০১৯ রোজ মঙ্গলবার মাছিমপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মোঃ কামাল হোসেন প্রকাশ পিচ্চি কামালের হাতে ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমির হোসেনকে লাঞ্চিত করা হয়।নওগাঁয় বিদ্যালয় সভাপতি কর্তৃক প্রধান শিক্ষক লাঞ্ছিত হয় ১৮ আগস্ট, ২০১৯।২৫ এপ্রিল, ২০১৮ বাগেরহাটের মোল্লাহাটে শহীদ হেমায়েত উদ্দিন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আম্বিয়া জামানকে বিদ্যালয়ের সভাপতি হারুন শিকদার কর্তৃক লাঞ্চিত করা হয়। এরকম হাজারো উদাহরন দেওয়া সম্ভব।
খ. কম যোগ্যতার সভাপতির কারনে শিক্ষার গুনগত মান হুমকীর মুখে পড়ছে,পড়বে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের ছোয়ায় প্রযুক্তির সহায়তায় যেখানে দিন দিন শিক্ষার মান উন্নতির দিকে যাওয়ার কথা, সেখানে বহু স্কুলের শিক্ষার মান কোন দিকে যাচ্ছে সেটি বোঝার ক্ষমতা ও নেই বহু প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির। সেটি আবারো অব্যাহত থাকবে।
গ. কম শিক্ষিত এসব সভাপতির কারনে শিক্ষা দানে অরুচি বাড়ছে,আরো বাড়বে শিক্ষকদের।শিক্ষকরা যেখানে নামি দামি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক কিংবা স্নাতকোত্তর নিয়ে শিক্ষকতা করছেন তাদের পরিচালকরা স্বল্প শিক্ষিত হওয়ায় তাদের মাঝে হতাশা বিরাজ করছে,করবে এটাই স্বাভাবিক।
ঘ. কম শিক্ষিত প্রতিষ্ঠান সভাপতি অভিভাবকদের দু:শ্চিন্তা বাড়াচ্ছে,বাড়াবে প্রতিনিয়ত।কারন বিদ্যালয় হল নিজেকে গড়ার এবং নিজেক উপযুক্তভাবে বিকশিত করার সঠিক স্থান।অথচ হাজার হাজার পরিচালনা পর্ষদ সদস্য কিংবা সভাপতি আছেন যারা একেবারেই অক্ষরজ্ঞানহীন, ধূমপানকারী,অস্ত্র মামলার আসামী ,দূর্নিতিবাজ,কালোবাজারী,কিংবা তার চেয়ে ভয়ংকর নিন্দনীয় দোষের অধিকারী। ফলে অভিভাবকদের মধ্যে দু:শ্চিন্তা বাড়ছে এবং বাড়বেই প্রতিনিয়ত।
ঙ• কম যোগ্যতার এসব তথাকথিত সভাপতি শিক্ষার চেয়ে অর্থ বিত্তকেই উৎসাহিত করবে।এমনকি ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে এমন চিন্তার উদ্রেক ঘটাবে যে জীবনে হয়ত শিক্ষা অর্জন নয়, বিত্ত অর্জনে অধিক গুরুত্বপূর্ন।কারন শিক্ষা অর্জনে শিক্ষকরা ছাত্র-ছাত্রীদের পরিচালক হতে পারে কিন্তু বিত্ত অর্জনে সরাসরি শিক্ষকদের পরিচালক হতে পারবে।আর শিক্ষকদের পরিচালক হওয়ার এত মোক্ষম সুযোগ মিস করা বোকামি নয় কি?
চ. বহু সরকারি কিংবা এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সংসদ সদস্য,সচিব,জেলা প্রশাসক,এডিসি জেনারেল,ইউএনও,এ্যাসিল্যান্ডসহ যোগ্য দক্ষ শিক্ষানুরাগী শিক্ষাবিদগন ম্যানেজিং কমিটির পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।এইচএসসি পাস সভাপতির যোগ্যতা নির্ধারিত হওয়ায় উপরে উল্লেখিত শিক্ষাবিদদের জন্য অনেকটাই অসন্মানজনক হবে সন্দেহ নাই।এটির কারনে বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃকোড়ে নামক বচন গুলি বিলিন হয়ে যাবে।উচ্চ শিক্ষিত মানুষজন বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটিতে থাকতে চাইবে না কিংবা চাইলে ও অনেকটা অপমানবোধ করবে।কারন ভেড়া আর সিংহ যেমন বিপরীত মুখী, শিক্ষিত সভাপতি আর কম শিক্ষিত সভাপতি ও তেমনি।
এসমস্যা অতিক্রম করতে গত বছর ২৪ শে আগস্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ১৩ তম বৈঠকে কমিটির সভাপতি আফছারুল আমীনের সভাপতিত্বে সাব কমিটির সদস্য এমপি ফজলে হোসেন বাদশা ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির নুণ্যতম যোগ্যতা স্নাতক করার প্রস্তাব করলে ও তৎকালীন শিক্ষা মন্ত্রী,শিক্ষা উপমন্ত্রী ( বর্তমান শিক্ষা মন্ত্রী) এবং কমিটির সভাপতি বিষয়টি নাকচ করে দেন।তাদের যুক্তি হচ্ছে এমনটি করা হলে নাকি দেশের সব খানে ঐ যোগ্যতার সভাপতি না ও পাওয়া যেতে পারে। কী বিস্ময়কর হাস্যকর যুক্তি!যেখানে প্রতি জেলায় কয়েক হাজার করে শিক্ষিত স্নাতকধারী বেকার ঘুরে বেড়াচ্ছে, সেখানে তাদের এই যুক্তি হাস্যকর নয় কী?সমালোচনাকারীরা হয়ত বলবেন স্নাতকধারী শিক্ষিত বেকাররা কি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য যথার্থ হবেন?তাদের জন্য বলি অক্ষরজ্ঞানহীন,ধূমপানকারী,
অস্ত্র মামলার আসামী ,দূর্নিতিবাজ,কালোবাজারী,কিংবা তার চেয়ে ভয়ংকর নিন্দনীয় দোষের অধিকারী ব্যক্তির প্রতিষ্ঠান সভাপতি হওয়ার তুলনায় স্নাতকধারী বেকারের প্রতিষ্ঠান সভাপতি হওয়া কয়েক গুন অতি উত্তম মনে করি।কারন প্রতিষ্ঠানে কমশিক্ষিত বেশির ভাগ সভাপতি হওয়ার পিছনের গল্পে থাকবে নোংরা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার,অর্থনৈতিক ফায়দা হাসিল কিংবা সামাজিক আধিপত্য বিস্তার।
অনেক জ্ঞানপাপীদের যুক্তি হল অনেকে বিদ্যালয়ের স্থান দান করেন তাদের অগ্রাধিকার দিতে যোগ্যতা এইচএসসির বেশি প্রয়োজন নাই। গ্রাজুয়েট বড় বেশি হয়ে যায়।
কেউ যদি গ্রাজুয়েট হতে হবে- এটাকে চ্যালেঞ্জ করেন তাহলে সমস্যা দেখা দেবে। তাই এ পদের জন্য কিছুটা কম শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পন্ন মানুষও নির্বাচিত বা মনোনীত হতে পারেন।
অপদার্থ ঐ সব লোকের বক্তব্য এ যুগে মেনে নিলে অচিরেই হয়ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে রুপ নেবে।কারন সম্পদ যার যত বেশি হবে বিদ্যালয়ে প্রভাব তার তত বেশি হবে।এটি শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যে কে ব্যহত করবে সন্দেহ নাই। তাই পরিশেষে বলতে চাই শিক্ষার গুনগত মান নিশ্চিত করতে, শিক্ষকদের সন্মানজনক পেশা সৃষ্টি করতে,অভিভাবকদের উৎকন্ঠা দূর করতে,ধূমপানকারী,মাদকাসক্ত,দূর্নিতিবাজ,অস্ত্রধারী কিংবা তার চেয়ে নোংরা পরিবেশ সৃষ্টিকারীদেরকে দূরে রাখতে, শিক্ষাবিদদের সন্মান ঠিক রাখতে,আধুনিক ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে এবং শিক্ষকদের ভাতে নয় সন্মানে মারা বন্ধ করতে সরকারি প্রাথমিক,মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির যোগ্যতা স্নাতক কিংবা স্নাতকোত্তর হওয়া আজ সময়ের দাবী।এমনটি না হলে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার সপ্ন এবং উদ্দেশ্য বারো আনাই অসম্পূর্ন থেকে যাবে।
লেখকঃ কলামিস্ট, বিভাগীয় প্রধান (অনার্স,এম এ শাখা)।আয়েশা( রা:) মহিলা কামিল (অনার্স,এম.এ) মাদ্রাসা, সদর, লক্ষীপুর ও সদস্য, কেন্দ্রীয় স্থায়ী কমিটি ও সাধারন সম্পাদক , লক্ষীপুর জেলা শাখা এবং সিনিয়র সাংগঠনিক সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি, বিএমজিটিএ।
শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/১১/০৫/২০২৪
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
