আল আমিন হোসেন মৃধা, ঢাকাঃ বরগুনার সদর উপজেলার ঢলুয়া ইউনিয়নের লেমুয়া খাজুরা পি. কে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ পাঁচ শিক্ষককে মারধর করার ঘটনাকে সাজানো ও মিথ্যা দাবি করে উল্টো প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেছেন বিদ্যালয়টির সভাপতি ইমতিয়াজ হোসেন সোহেল।
মারধর করার ঘটনায় জেলা প্রশাসক কর্তৃক তদন্তাধীন থাকা অবস্থাতেই তিনি সংবাদ সম্মেলন করে নিজেকে বাঁচাতে ও মারধরের ঘটনাটিকে ভিন্নদিকে মোড় দিতেই এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে বলে জানান বিদ্যালয়টির শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও একাধিক অভিভাবকরা। অনৈতিক অর্থনৈতিক আবদার, বিদ্যালয়ের গাছ বিক্রি, ফান্ড আত্মসাৎসহ একাধিক অভিযোগ রয়েছে সভাপতির বিরুদ্ধে।
রবিবার দুপুরে বরগুনা প্রেসক্লাবে করা সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে খাজুরা পি.কে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ইমতিয়াজ হোসেন সোহেল জানান, “বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ ইউসুফ আলী তার বিরুদ্ধে শিক্ষককে মারধর,বিদ্যালয়ের গাছ কাটা, টাকা লুটের যে অভিযোগ এনেছেন তা সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট,উদ্দেশ্য প্রণোদিত এবং ভিত্তিহীন। তিনি এ অপপ্রচারের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন,এ বিষয়ে সভাপতিসহ ম্যানেজিং কমিটির কারো কোন সম্পৃক্ততা নেই। প্রধান শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে মিথ্যা সাক্ষী দিতে বাধ্য করিয়েছেন। স্কুল ম্যানেজিং কমিটির বিরুদ্ধে গত আগস্ট মাসে যে গাছ কাটার মামলা হয়েছে তা থেকে বিজ্ঞ আদালত নভেম্বর মাসে মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় ম্যানেজিং কমিটির সকলকে অব্যাহতি দিয়েছেন।”

বাস্তবে শিক্ষাবার্তা’র অনুসন্ধানে যা জানা গেছে, গত রবিবার (২১ জানুয়ারী) সকালে খাজুরা পি .কে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এসেম্বলি চলাকালে সভাপতি তার কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে অতর্কিত এই হামলা চালান। ঘটনার সময় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থী ও বিদ্যালয়টির শিক্ষকদের উপস্থিতিতেই এই হামলা হয়। যার প্রত্যক্ষদর্শী স্বাক্ষী উপস্থিত সকল শিক্ষার্থী। প্রধান শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে মিথ্যা সাক্ষী দিতে বাধ্য করিয়েছে বলে যে অভিযোগ সংবাদ সম্মেলনে সভাপতি করেছেন, তার ভিত্তি নেই। কেননা শিক্ষাবার্তা’র পক্ষ থেকে ঘটনার সময় উপস্থিত একাধিক শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলে মারধরের বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত হওয়া গেছে। এছাড়াও স্থানীয় একাধিক অভিভাবকও শিক্ষাবার্তা’র কাছে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
সভাপতি সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেছেন, “স্কুল ম্যানেজিং কমিটির বিরুদ্ধে গত আগস্ট মাসে যে গাছ কাটার মামলা হয়েছে তা থেকে বিজ্ঞ আদালত নভেম্বর মাসে মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় ম্যানেজিং কমিটির সকলকে অব্যাহতি দিয়েছেন।” বাস্তবে অব্যাহতি পাওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট কেননা মামলাটি এখনও চলমান রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতি আরও বলেন, “প্রধান শিক্ষক মোঃ ইউসুফ আলী এই বিদ্যালয়ে ২০১৪ সালের জুন মাসে যোগদান করার পর থেকেই বিভিন্ন মামলা-মোকদ্দমা জড়িয়ে যান এবং বিদ্যালয়ের অর্থ অবৈধভাবে আত্মসাৎ করেন। সভাপতি হিসেবে আমি দায়িত্বভার গ্রহণ করার পরে তার অনৈতিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে তিনি আমার উপর অসন্তুষ্ট ও ক্ষিপ্ত হয়ে আমার মান সম্মান ও সামাজিক অবস্থানকে নষ্ট করার জন্য উঠে পড়ে লাগেন। গত আগস্ট মাসের ম্যানেজিং কমিটির সভায় বিদ্যালয়ের টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়ায় ম্যানেজিং কমিটি কর্তৃক বিধিমত তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং বিদ্যালয়ের টাকা ফিরিয়ে পাওয়ার জন্য ২০ আগস্ট ২০২৩ তারিখে বরগুনার চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মামলা দায়ের করা হয়। যার নং সিআর ১০৫৩/২৩ (বর)। বর্তমানে এই মামলাটি পিবিআইতে তদন্তনাধীন রয়েছে।”
শিক্ষাবার্তা’র অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রধান শিক্ষককে যে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে তার কোন ধরণের ম্যানেজিং কমিটির মিটিং করা হয়নি।কমিটির একাধিক সদস্য শিক্ষাবার্তা’কে নিশ্চিত করেছেন প্রধান শিক্ষককে বরখাস্তের বিষয়ে কোন রেজুলেশনে তাঁরা স্বাক্ষর করেননি। সভাপতি শুধুমাত্র বরখাস্তের একটি কপি প্রধান শিক্ষকের কাছে দিয়ে গেছেন। যা প্রধান শিক্ষক প্রত্যাখ্যান করে স্বপদে বহাল আছে। আর আর্থিক অনিয়মের যে অভিযোগ তুলেছেন সভাপতি বাস্তবে কোন স্কুলের প্রধান শিক্ষক দিয়ে আর্থিক নিরীক্ষা কমিটি না করে সভাপতির ইচ্ছে মত একখানা “চিঠির মাধ্যমে” অভিযোগ তুলে তা প্রমাণ পেয়েছেন বলে ঢাকঢোল পিটিয়েছেন। অন্যদিকে “গত আগস্ট মাসের ম্যানেজিং কমিটির সভায় বিদ্যালয়ের টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়ায় ম্যানেজিং কমিটি কর্তৃক বিধিমত তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং বিদ্যালয়ের টাকা ফিরিয়ে পাওয়ার জন্য ২০ আগস্ট ২০২৩ তারিখে বরগুনার চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মামলা দায়ের করা হয়। যার নং সিআর ১০৫৩/২৩ (বর)। বর্তমানে এই মামলাটি পিবিআইতে তদন্তনাধীন রয়েছে।” মামলাটি পিবিআইতে তদন্তনাধীন রয়েছে সভাপতির এই ভাষ্যটি সঠিক। তবে জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা কর্তৃক তদন্ত রিপোর্ট প্রধান শিক্ষকের পক্ষ থাকায় এই মামলাটি সভাপতি পিবিআইতে নিয়েছেন রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে। যা সংশ্লিষ্ট সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এছাড়া স্কুলের রেজুলেশনের বই গত আট মাস ধরে সভাপতি নিজের দখলে রেখেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতি বলেন, “প্রধান শিক্ষক মোঃ ইউসুফ আলী এনটিআরসিএ কর্তৃক দ্বিতীয় মেধা তালিকায় উত্তীর্ণ সহকারী শিক্ষক (বাংলা) মোঃ ইসমাইল হোসেনকে বিদ্যালয় যোগদান করতে না দিলে তৎকালীন এডিসি মহোদয়ের নির্দেশক্রমে নিয়োগ দিতে বাধ্য হন এবং ইসমাইল হোসেনের নিকট থেকে আর্থিক সুবিধা ভোগ করেন। তিনি ২০১৫ সাল থেকেই দুর্নীতির সাথে জড়িত। তিনি লেবুয়া খাজুরা পিকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়টিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। বিদ্যালয়ের অভিভাবকদের সাথে সবসময় দুর্ব্যবহার করেন বিধায় বিদ্যালয়ের অনেক ছাত্র-ছাত্রী অন্যত্র গিয়ে লেখাপড়া করছেন।”
এনটিআরসিএ কর্তৃক দ্বিতীয় মেধা তালিকায় উত্তীর্ণ সহকারী শিক্ষক (বাংলা) মোঃ ইসমাইল হোসেন এর যে প্রসঙ্গ আনা হয়েছে, তার একটি ভিডিও বার্তা শনিবার শিক্ষাবার্তা’কে পাঠায় সভাপতি। শিক্ষাবার্তা’ তার অনুসন্ধান চালায়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই শিক্ষক বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নেই। তিনি এনটিআরসিএ’র চতুর্থ গণবিজ্ঞপ্তিতে বরগুনা জেলার আমতলী উপজেলার গাজীপুর সিনিয়র ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসায় বাংলা প্রভাষক হিসেবে কর্মরত। এই প্রতিষ্ঠানে থাকাকালীন তিনি শিক্ষার্থীদের ইউনিক আইডির অর্থ আত্মসাৎ করে চলে গেছেন। যার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ শিক্ষাবার্তা’র কাছে রয়েছে। এতদিন পরে এসে মোঃ ইসমাইল হোসেন যে ভিডিও বার্তায় এই অভিযোগ গুলো করলেন বাস্তবে ইউনিক আইডির অর্থ তছরুপের ঘটনাকে ভিন্নখাতে ধাবিত করার জন্য কুটকৌশল অবলম্বন মাত্র।
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২৮/০১/২০২৪
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.