আল আমিন হোসেন মৃধা, ঢাকাঃ বরগুনার সদর উপজেলার ঢলুয়া ইউনিয়নের খাজুরা পি.কে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ পাঁচ শিক্ষককে মারধর করার অভিযোগ উঠেছে বিদ্যালয়টির সভাপতি ইমতিয়াজ হোসেন সোহেলের বিরুদ্ধে। অনৈতিক অর্থনৈতিক আবদারে সমর্থণ না করায় এবং বিদ্যালয়ের ফান্ডের টাকা আত্মসাতের প্রতিবাদ করায় এই হামলা হয়েছে বলে ভুক্তোভুগি শিক্ষকরা ও এলাকাবাসী জানিয়েছেন।
গত রবিবার (২১ জানুয়ারী) সকালে খাজুরা পি.কে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এসেম্বলি চলাকালে সভাপতি তার কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে অতর্কিত এই হামলা চালায় বলে জানা গেছে। ঘটনার সময় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। মারধরের ঘটনায় ভুক্তোভুগি শিক্ষকরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক এবং থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন।
ভুক্তোভুগি শিক্ষক, এলাকাবাসী ও শিক্ষার্থী সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্নভাবে বিদ্যালয়ের ফান্ডের অর্থ জোরপূর্বক আত্মসাৎ করে আসছেন সভাপতি। শিক্ষকদের বেতন বিলে স্বাক্ষর না করে এক মাসের বেতন দাবি, শিক্ষার্থীদের থেকে অতিরিক্ত ফি আদায়, স্কুলের গাছ বিক্রি করে তা আত্মসাৎসহ নানা অনিয়মের প্রতিবাদ করেন প্রধান শিক্ষক সহ স্কুলের শিক্ষক প্রতিনিধিরা। এই প্রতিবাদের ফলেই প্রতিবাদকারী প্রধান শিক্ষকসহ পাঁচ শিক্ষকের উপর হামলা করে।
প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজনের সাথে কথা হয় শিক্ষাবার্তা’র। তারা বলেন, রবিবার সকালে স্কুলে নিয়মিত অ্যাসেম্বলি চলছিল। সভাপতিসহ কয়েকজন এসে প্রধান শিক্ষককে অ্যাসেম্বলি থেকে ধরে নিয়ে তার রুমে গিয়ে চেকে স্বাক্ষর করতে বলেন। তিনি স্বাক্ষর না করলে এলোপাথারি মারধর শুরু করেন এবং প্রধান শিক্ষকের রুমের আসবাব পত্র ভাংচুর করেন। ঐ চার শিক্ষক প্রধান শিক্ষক বাঁচাতে গেলে তাদের উপরেও হামলা শুরু করেন। এসময় স্কুলে শিক্ষার্থীদের মাঝে ভীতিকর পরিস্থিতির স্বীকার হয়। ঘটনা কাউকে জানালে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের হুমকি দেন সভাপতি ও তার সঙ্গীরা।
জানা গেছে, এর আগেও সভাপতি বিভিন্ন ভাবে স্কুল ফান্ডের লক্ষাধিক টাকা জোরপূর্বক আত্মসাৎ করেন। বিনা টেন্ডারে এবং বন অধিদপ্তরের অনুমতি না নিয়ে কোন রেজুলেশন ছাড়া গাছ বিক্রি করে সেই টাকা আত্মসাৎ করেন। এই নিয়ে একজন অভিভাবক মামলা দায়ের করেছেন যা চলমান। এছাড়াও শিক্ষকদের এক মাসের বেতনের টাকা না দিলে বেতন বিলে প্রতিস্বাক্ষর করবেন না বলে জানান। শিক্ষকরা ইউএনও’র নিকট সরনাপন্ন হলে তিনি স্বাক্ষর করেন।২০২৩ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে জনপ্রতি পাঁচ হাজার টাকা করে উত্তোলন করে আতসাৎ করেন সভাপতি। ছয় জন শিক্ষকের টাইম স্কেলের জন্য অর্থ দাবি করাসহ নানা সময়ের এই সভাপতির অনৈতিক আবদার ও অব্যাহত হুমকি ধামকির ফলে গত ৯ অক্টোবর ২০২৩ ইং তারিখে প্রধান শিক্ষক, ম্যানেজিং কমিটির তিন জন শিক্ষক প্রতিনিধি ও একজন অভিভাবক প্রতিনিধি এবং পাঁচ জন শিক্ষক সহ মোট ১২ জন স্বাক্ষরিত একটি অভিযোগ পত্র বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের নিকট জমা দেন। সভাপতির বিভিন্ন অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার ফলে তার অব্যাহতি চেয়ে এই অভিযোগ দেওয়া হয়। তবে তার কোন তদন্ত করেনি শিক্ষা বোর্ডটি।
ভুক্তভোগী প্রধান শিক্ষক ইউসুফ আলী শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, সম্প্রতি বিদ্যালয়ের গাছ কেটে নেওয়াসহ সভাপতি বিভিন্ন কর্মকাণ্ড করে আসছেন। বিষয়টি নিয়ে মামলা দায়ের হয়েছে। এছাড়া তার অব্যাহত অনিয়মের প্রতিবাদ করায় স্কুলের সভাপতি ইমতিয়াজ হোসেন সোহেল ক্ষিপ্ত হয়ে প্রথমে শিক্ষকদের বেতন-ভাতার এমপিও’র চেকের প্রতিস্বাক্ষর বন্ধ করে দেন।
তিনি বলেন, সভাপতির অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও প্রতিস্বাক্ষর না করার বিষয়টি আমি স্থানীয় ব্যক্তিবর্গদেরকে অবহিত করি। সব মিলিয়ে সভাপতি ক্ষিপ্ত হয়ে নিজের অপকর্ম ঢাকতে রবিবার স্কুলের এসেম্বলি চলার সময় শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে আমাকে রুমে নিয়ে গিয়ে আমিসহ আমার চারজন শিক্ষককে এলোপাথারী ভাবে মারপিট করে এবং আমার অফিস রুমের টেবিলের ড্রয়ারের তালা ভেঙ্গে এক লক্ষ সাত চল্লিশ হাজার টাকা নিয়ে যান। শিক্ষার্থীর সামনে থেকে আমাকে আমার কক্ষে নিয়ে মারধর করেন এবং আমার কক্ষের আসবাবপত্র ভাঙ্গচুর করেন।
মারধরের শিকার শিক্ষকরা জানান, সভাপতি স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী হওয়ায় আজ তিনটা দিন হয়ে গেলো আমরা এর কোন প্রতিকার পেলাম না। থানায় অভিযোগ দায়ের করলেও থানা থেকে জানানো হয় মারধরের মোটা দাগের চিহ্ন না থাকলে মামলা হবে না। স্কুলে ঘটনার দিন উপস্থিত পুরো শিক্ষার্থীরা স্বাক্ষী তবুও পুলিশ মামলা দায়ের করেনি। জেলা প্রশাসক মহোদয় তদন্ত করবেন বলে আশস্ত করেছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সভাপতি স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক প্রভাবশালী হওয়ায় তিনি তার ইচ্ছামত এই অপকর্মগুলো করে আসছেন। কেউ কোন প্রতিবাদ করলে তাদেরকে সে মারতে উদ্ধত হন। ফলে প্রকাশ্যে কেউ কোন প্রতিবাদ করা তো দূরে থাক কোন কথাই বলতে সাহস করে না।
মারধরের বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যালয়টির ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ইমতিয়াজ হোসেন সোহেল অভিযোগ অস্বীকার করে শিক্ষাবার্তা’র কাছে দাবি করেন, তিনি রবিবারে বিদ্যালয় যান তখন প্রধান শিক্ষক ছিলেন বিদ্যালয়ের তিন তলায় তার রুমে। আমি গিয়ে বলি আপনি অ্যাসেম্বলিতে না গিয়ে এখানে কেন প্রশ্ন করি এবং আমার যে চেয়ার ছিল তিনি সেই চেয়ারে পা তুলে দিয়ে বসে ছিলেন। এটা নিয়ে বাগবিতণ্ডা হয়েছে। মারধরের কোন ঘটনা ঘটেনি। আমরা চলে আসার পরে তিনি নিজেই তার কক্ষ ভাংচুর করেন। আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য। বিদ্যালয়ের গাছ তিনি কাটেননি বলে দাবি করেন।
উপস্থিত একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তির সাথে কথা হলে তারা জানান সভাপতি ও তার লোকজন প্রধান শিক্ষক যে মারধর করে ভাঙ্গচুর করেছেন এটা তারা দেখেছেন। পুরো স্কুলে পরিস্থিতি একটা আতংক বিরাজ করে। শিক্ষাবার্তা রবিবার উপস্থিত থাকা একাধিক শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলেও মারধরের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে।
এ বিষয়ে বরগুনা সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো: জিয়াদ হাসান শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমি অবগতি আছি। ঘটনা শোনার পরেই আমি হাসপাতালে গিয়েছিলাম তবে তারা সেখান থেকে শুনেছি থানায় গিয়েছে। আমার সাথে দেখা হয়নি। পরে এটা নিয়ে জেলা শিক্ষা অফিসে বসাবসি হয়েছিল। শুনেছি স্থানীয় মাননীয় সংসদ সদস্য বিষয়টি সমাধান করে দিয়েছেন এবং সভাপতিকে তাৎক্ষণাক মৌখিক তিরস্কার করেছেন।
তবে মারধরের শিকার শিক্ষকরা বলেন, তাদের সাথে কোন ধরণের মিমাংশা হয়নি। শিক্ষকরা শারীরিকভাবে লাঞ্চিত হয়েছে, মারধরের শিকার হয়েছে এটা নিয়ে মিমাংশার কি বিষয়। কমিটির অনিয়মের বিরুদ্ধে কোন কথা না বলে মারধরের মিমাংশার কথা বলছেন তারা বিষয়টি দুঃখজনক।
জানতে চাইলে বরগুনা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শামীম মিঞা শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, বিষয়টি আমি অবগত। শিক্ষকদের উপর হামলা কোন ভাবেই কাম্য নয়। শিক্ষকরা আমার কাছে এসেছিলেন অভিযোগ দিয়েছেন। জেলা প্রশাসক মহোদয়ের কাছেও তারা অভিযোগ দিয়েছেন। স্কুলটির বিষয়ে আগে থেকেই আমি জানি। একটা তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছি উপজেলার এক কর্মকর্তাকে প্রধান করি। তদন্তে প্রমাণিত হলে আমরা এই কমিটি ভেঙ্গে দেওয়ার সুপারিশ করব।
বরগুনা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, ঘটনা আমি শুনেছি। তাদের সাথে কথা বলেছি। এ বিষয়ে জেলা শিক্ষা অফিসের পক্ষ থেকে কোন তদন্ত করবেন কি’না জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, স্থানীয় এমপি মহোদয় দুই পক্ষথেকে কথা বলে মিটমাট করে দিয়েছেন। এরআগেও আমি এই স্কুলের দুইটা তদন্ত করেছি। আমার নলজে আছে দেখি কি করা যায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বরগুনা জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলাম শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, এ বিষয়ে তদন্ত করার জন্য আমি নির্দেশ দিয়েছি। তদন্ত প্রতিবেদন পেলে তদন্তের আলোকে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বরিশাল আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ-পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো: আনোয়ার হোসেন মিটিংয়ে থাকায় তিনি বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে পারেননি।
জানতে চাইলে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক মো: রফিকুল ইসলাম খান শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। আমাদের কাছে কেউ লিখিত অভিযোগ করেনি। স্কুলের এই সভাপতির বিরুদ্ধে গতবছরের অক্টোবরেও প্রধান শিক্ষক শিক্ষক প্রতিনিধিও শিক্ষকরা সহ ১২ জন স্বাক্ষরিত একটি অভিযোগ বোর্ডে দিয়েছিলেন সেটার বিষয়ে কোন ব্যবস্থা নিয়েছেন কি’না জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, অভিযোগের তো একটা প্রসিডিউর আছে একটা ফি জমা দিয়ে অভিযোগ পত্র দাখিল করে ফাইলিং করতে হয়। তাঁরা কিভাবে করেছেন তা তো বলতে পারব না। মারধরের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে কমিটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২৪/০১/২০২৪
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
