রাগিব হাসান: বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে একটা বড় সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলছে। এটা অনেকটাই এক্সপেরিমেন্টাল। আসলে ভুল বললাম, পুরাটাই এক্সপেরিমেন্টাল, বেটা ভার্সন। অন্যান্য দেশে স্কুলের সিলেবাস বা শিক্ষা ও পরীক্ষাপদ্ধতি পাল্টানো হয় অনেক গবেষণা ও ফিল্ড টেস্টিংয়ের পরে। রাতারাতি এই বছর এক পদ্ধতি, পরের বছর অন্য পদ্ধতিÑ এমনটা হয় না। অথচ বাংলাদেশেÑ আজ এটা, কাল সেটা। স্থিরতা বলতে কিছুই নেই। বহুকাল আগে যখন স্কুলে পড়তাম, সেই আশি নব্বইয়ের দশকে স্কুলের বিজ্ঞানের বইতে এক অদ্ভূত জিনিস ছিলো- এসো নিজে করি। আমার বয়সীরা সেই তামাশার কথা মনে করতে পারবেন সবাই। থিওরেটিকালি ওইটা খারাপ নয়, প্রতি চ্যাপ্টারে হাতে কলমে শেখার অন্য এক্সপেরিমেন্ট দেওয়া আছে। কিন্তু একটু খেয়াল করলেই দেখা যায়, এই এক্সপেরিমেন্টগুলো সম্ভবত কোনো আমেরিকান টেক্সট বুক থেকে কপি করা। কেমনে বুঝলাম? সেই এসো নিজে করির কাল্পনিক জগতের স্কুলে প্রতি ক্লাসে টেস্ট টিউব থাকে, নানা কেমিক্যাল দ্রবণ থাকে, ব্যারোমিটার থাকে, আর টিচার সেটা ক্লাসের ছাত্রদের হাতে কলমে দেখাতে পারেন। আমি পড়েছি শহরের স্কুলে, প্রথম সারির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। কিন্তু সেই সেরা স্কুলেও ক্লাসে ক্লাসে টেস্টটিউব মজুদ থাকতো না, অথবা ২০ জন ছাত্রের ক্লাসে সবাইকে নিয়ে টিচার হাতে কলমে কিছু করে দেখাবেন, তার সুযোগ ছিলো না।
ক্লাসের ৬০ থেকে ৮০ জন ছাত্রের সামনে শিক্ষক বাধ্য হয়ে এসো নিজে করি পড়াতেন এভাবে, মনে করো আমার হাতে একটা টেস্টটিউব আছে। আমরা তাকিয়ে আছি সেই অদৃশ্য টেস্টটিউবের দিকে, আর বলছি, জ্বি স্যার। স্যার বলে চলেছেন, ‘সেই টেস্টটিউবে সোডিয়াম হাইড্রক্সাইডের দ্রবণ ঢালছি। তাতে দিচ্ছি লিটমাস, আর তার পরে ঢালছি সালফিউরিক এসিড। দেখতেই পাচ্ছো যে, লিটমাসের রঙ নীল হলো।’ আমরা শূন্যের দিকে তাকিয়ে কল্পনার চোখে দেখছি লাল-নীল-গোলাপী নানা রঙের লিটমাস আর অদৃশ্য সেই টেস্টটিউবের বিক্রিয়ার কথা। এই যে এসো নিজে করি নামের তামাশাটা ছিলো স্কুলের বিজ্ঞানে, তা কীভাবে ঢুকেছিলো, আন্দাজ করতে পারি এখন। হয় বিদেশি দাতা সংস্থার অনুদানের প্রজেক্টে বিদেশি কনসাল্টেন্ট আনা হয়েছিলো, অথবা বই প্রণেতারা কেউ কোনো আমেরিকান স্কুলের টেক্সটবুক কপি করে মেরে দিয়েছিলেন। ফলাফল, বাস্তবের সঙ্গে সম্পর্কহীন এমন মনগড়া বিষয়, যাতে হাতে কলমে বিজ্ঞান শেখার বদলে আমাদের অদৃশ্য গোলাপী-লাল-নীল সবকিছু দেখতে হতো কল্পনার চোখে। এভাবে কি বিজ্ঞান শেখা যায়? তারপরে এসএসসি পরীক্ষার সময়ে এলো অবজেক্টিভ প্রশ্ন। আবারও, আইডিয়া ভালো। কিন্তু কিছু বখাটে ছাত্রের দুই দিনের আন্দোলনেই সিদ্ধান্ত এলো, ৫০০ টি প্রশ্নের নমুনা প্রশ্ন ব্যাংক থেকেই কেবল প্রশ্ন হবে। বাংলাদেশের বাস্তবতা না জেনে না বুঝে বিদেশের সিস্টেম কপি করার ফল। আমি স্কুল ছেড়েছি ৩০ বছর হয়, কিন্তু এই সময়টাতে তামাশা দিনে দিনে বেড়েছে। স্কুলে কী পড়ানো হবে, কীভাবে পড়ানো হবে, সেটা নিয়ে হুটহাট পরিবর্তন চলছে। আজ জেএসসি, পিএসসি পরীক্ষা আছে, কাল নেই, পরশু আবার আছে। ভর্তি পরীক্ষা আছে, নেই, আবার আছে। জিপিএ আসে, তাতে সবাই এক কাতারে চলে আসার পরে আসে গোল্ডেন জিপিএ, আরও কতো কী।
শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে এভাবে হঠকারী কাজ করা কি খুব বুদ্ধিমানের কাজ? শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে আমার চাইতে অনেক বেশি জানেন এমন অনেকেই আছেন। শিক্ষা বিষয়ে গবেষণা করেছেন তাঁরা, জানেন বুঝেন অনেক কিছু। কিন্তু এভাবে বছরে বছরে নানা এক্সপেরিমেন্ট চালানো যে শিক্ষার্থীদের জন্য ক্ষতিকর, সেটা কি বোঝা কঠিন? আমাদের দুনিয়াটা পাল্টে যাচ্ছে প্রযুক্তির কল্যাণে। লো লেভেল স্কিল নিয়ে সামনের বিশ্বে টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে। যে জনশক্তি নিয়ে আমরা এতোদূর এসেছি, সামনের বিশ্বে সেই শ্রমিকদের চাহিদা কমবে, আর বাড়বে নানা প্রযুক্তিতে অভিজ্ঞ দক্ষ জনশক্তির চাহিদা। সেই নতুন বিশ্বে টিকে থাকতে হলে বিজ্ঞান শিক্ষার বিকল্প নেই। আর দরকার, খুব বেশি দরকার, একটা স্থিতিশীল শিক্ষা ব্যবস্থা। যেখানে শিক্ষা পদ্ধতি পাল্টায় না বছর বছর। শিক্ষার উপকরণ আর প্রশিক্ষিত শিক্ষক আছেন এমনকি গ্রামের স্কুলেও। শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে দুনিয়ার প্রচুর দেশ এগিয়ে গেছে। আমরা হাঁটি উল্টা দিকে। কবে আসবে আমাদের দিন? কবে বন্ধ হবে স্কুলের শিক্ষার্থীদের নিয়ে এমন এক্সপেরিমেন্ট? লেখক: গবেষক। ফেসবুকে ২০-১-২০২৪ প্রকাশিত হয়েছে।
লেখকঃ রাগিব হাসান
“মতামত ও সাক্ষাৎকার কলামে প্রকাশিত নিবন্ধ লেখকের নিজস্ব। শিক্ষাবার্তা’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে মতামত ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক ও আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের;- শিক্ষাবার্তা কর্তৃপক্ষের নয়।”
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২১/০১/২০২৪
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
