এইমাত্র পাওয়া

শিক্ষার উন্নয়নে অত্যন্ত জরুরি একটি পদক্ষেপ হলো উপযুক্ত শিক্ষক প্রশিক্ষণ

ঢাকাঃ আমরা এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থার স্বপ্ন দেখি, যেখানে শিক্ষার্থীরা কোনো কিছু পড়ার আগে জানবে কেন তারা সেটি পড়ছে। মানুষের মনে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে এসব পড়ে কী হয় বা কী হবে? বর্তমান বিশ্বে দাঁড়িয়ে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন। কারণ মানুষ নানা উদ্দেশে শিক্ষা-অর্জন করে। এখানে কারও লক্ষ্য স্রেফ দার্শনিক জ্ঞান-অর্জন, কারও লক্ষ্য বিজ্ঞানশিক্ষা, কারও লক্ষ্য পারলৌকিক, কারও ইহজাগতিক। আবার শিক্ষার প্রয়োজনও মানুষে-মানুষে, সমাজে-সমাজে, দেশে-দেশে ভিন্ন। এমনকি জ্ঞানী ব্যক্তিদের অভিমতের মধ্যেও শিক্ষার উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনের বিচিত্রতা বা সীমা নির্ধারণ সহজসাধ্য নয়। তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়Ñ কেন ও কীভাবে শিক্ষা অর্জন করবো?

ইউরোপীয় রেনেসাঁর পূর্বে শিক্ষাদর্শন ছিল অতীন্দ্রিয়বাদী। শিক্ষা কেন? এর জবাব কিন্তু প্রাচীন জগৎও দিয়েছে। মানুষের চঞ্চল মন, অসংযত ইন্দ্রিয়কে বাঁধতে নৈতিক শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। মানুষের কাজকর্মভিত্তিক শিক্ষাকে অতীতে মামুলি ব্যাপার বলে ধরে নেওয়া হতো। প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে সমাজব্যবস্থা চলতো কী করে? কেননা সমাজের জন্য প্রয়োজন কর্ম, বৃত্তি, পেশা ইত্যাদি। মানুষের পারস্পরিক প্রয়োজন মেটানোর জন্যই সেই সংগঠন সমাজের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত বলবৎ রয়েছে।

শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য সমতাভিত্তিক ও কল্যাণকামী সমাজ ও মানুষ তৈরি করা। কিন্তু বাস্তব অবস্থা তো সেকথা বলে না। করোনা মহামরিতে এই বিষয়গুলো আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। ধনী-দরিদ্রের শিক্ষা-প্রাপ্তির মধ্যে মেরু-ব্যবধান এখন স্পষ্ট। নানা মিডিয়াম বা নানা ধরনের বিদ্যাশিক্ষায়তনে ভরে গেছে দেশ। এই পরিস্থিতি সমাজকে কোনদিকে নিয়ে যাবে তা ভেবে আসলেই শঙ্কিত হই। ইতিহাসে মহামারি বারবারই ফিরে আসে। একেকটি মহামারি আমাদের যথেষ্ট শিক্ষাও দিয়ে যায়। কিন্তু সেই শিক্ষাকে আমরা কেউ গ্রহণ করি, বেশির ভাগই করি না। ইতিহাস ঘাটলেই দেখা যাবে, বিশ শতকের শুরুতে যক্ষ্মারোগ মহামারি আকার ধারণ করেছিল। তখন শিক্ষাব্যবস্থা গতিশীল রাখতে প্রথম দিকেই ‘ওপেন এয়ার স্কুল’ চালু করে জার্মানি ও বেলজিয়াম। আসলে রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থার জন্য চিন্তাশীলতার বিকল্প কিছু নেই। নতুন ধরনের চিন্তা, উদ্যোগ ও রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপই কেবল এক্ষেত্রে সবচে বড় নিয়ন্ত্রক শক্তি।

শিক্ষার উন্নয়নে অত্যন্ত জরুরি একটি পদক্ষেপ হলো উপযুক্ত শিক্ষক প্রশিক্ষণ। আজ থেকে প্রায় দুশ বছর আগে বঙ্গদেশে তা প্রথম বুঝেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। শিক্ষকদের নজরদারিতে আনতে তিনি নিজ উদ্যোগে নিজ ব্যয়ে গ্রামবাংলার স্কুলগুলো পরিদর্শন করতেন। তাঁর এ-উদ্যোগ দেখে ব্রিটিশ সরকার তাকে বঙ্গীয় স্কুল পরিদর্শক হিসেবে সরকারি দায়িত্ব দেয়। শিখন-শেখানো প্রণালী যথাযথ করতে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রয়োজনে তিনি নিজেই কলকাতায় ১৮৬০-এর দিকে শিক্ষক প্রশিক্ষণ একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কলেজ নামে তা আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সেই পদাঙ্ক অনুসরণ করে দেশভাগের পর বাংলাদেশে শিক্ষক প্রশিক্ষণ একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু কেনো যেনো সেসব কাক্সিক্ষত মানে পৌঁছুতে পারছে না। নীতিমালা প্রণয়ন ও সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রণালয়ের হাতে থাকলেও বাস্তবায়ন সুদূরপরাহত। অনেকেই বলবেন দেশ দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে, তাই সম্ভব নয়। কিন্তু দুর্নীতি যেমন হয়, তেমনি একে নিয়ন্ত্রণও করা যায়। ইন্দোনেশিয়া, নাইজেরিয়া ও ফিলিপাইন এর সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত।

উচ্চশিক্ষাসহ অন্যান্য শিক্ষা বিষয়ে ইতোমধ্যে আমাদের দেশে বেশকিছু নতুন চিন্তার প্রকাশ ঘটেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটে ফিল্ডওয়ার্ক ও গবেষণা কার্যক্রম চলছে। শিক্ষাপদ্ধতি, শিক্ষার ভিত্তি, নন-ফরমাল এডুকেশন, শিক্ষা প্রশাসন, শিক্ষাক্রম, জেন্ডার এডুকেশন, শিক্ষা-গবেষণা, শিক্ষা মনোবিজ্ঞান, কম্পিউটার, বাংলা ও ইংরেজি বিষয়ে পাঠদান ইত্যাদির মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থীকে শিক্ষাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ হিসেবে গড়ে তোলেন তারা। কিন্তু এরপরও কেনো বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় খুব একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না? কারণটা খুব সোজাÑনীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এসব বিষয়কে খুব একটা আমলে না নেওয়া। জনসাধারণের মধ্যে শিক্ষাবিষয়ক ধারণাগুলো বাস্তবায়নে যথাযথ ব্যবস্থা-গ্রহণ ও সহযোগিতা না করা।

সবচে বড় কথা বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে একটি জাতি কখনোই শিক্ষার ফল লাভ করতে পারে না। উন্নতবিশ্ব সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীরতর পাঠ্যক্রম প্রণয়নের দিকে যাচ্ছে। উচ্চতর শিক্ষাকেও সীমিত মানুষের মধ্যে না রেখে যথাসম্ভব ছড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। প্রতিবছর অন্তত ১০০ ঘণ্টার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা সহ শিক্ষাদানের কৌশলগুলো হালনাগাদ করার প্রচেষ্টা খোদ্ সিঙ্গাপুরেই করা হচ্ছে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা নির্বাচন নিয়েও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একটি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী হওয়া উচিত ২৪। তবে স্থান বিশেষে ৩৬ জন পর্যন্ত শিক্ষার্থী একসঙ্গে পাঠগ্রহণ করতে পারে। এর বেশি হলে শিক্ষার্থীর প্রতি শিক্ষকের মনোযোগ অবশ্যম্ভাবীরূপে কমে যায়। আরও কিছু বিষয় বাকি থাকলো। পরে সেগুলো উপস্থাপন করবো। আর তরুণ সমাজের প্রতি কিছু দিক-নির্দেশনা রেখে সমাপ্ত করবো।

লেখকঃ খোরশেদ আলম

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০৪/০১/২০২৪

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়

“মুক্তমত ও সাক্ষাৎকার কলামে প্রকাশিত নিবন্ধ লেখকের নিজস্ব। শিক্ষাবার্তা’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে মুক্তমত ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক ও আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের;- শিক্ষাবার্তা কর্তৃপক্ষের নয়।”


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.