বাবাজি ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল সাহেব,
চিঠির শুরুতেই মোর মতো গেরামের অশিক্ষিত, নাখান্দা নসিয়ত চাচার সালাম নিবা। আশা করি আল্লাহ মালিকের অশেষ রহমতে এখনও চেয়ারখান আঁকড়াইয়া ধইরা বহাল তবিয়তে আছো। আমরা গরিব পাবলিক দূর থিকা তোমাগো প্রতিষ্ঠান দেখি আর আফসোস করি—এইডা স্কুল-কলেজ, না যুদ্ধের ময়দান!
বাজান,
শুনছিলাম তোমারে নাকি তিন মাসের লাইগ্যা ভার দেওয়া হইছিল। তখন তুমি কইছিলে আমি তিন মাসের মধ্যে আর্মির প্রিন্সিপাল দিয়া আবার আগের জায়গায় ফিরা যাইবেন।”
কিন্তু হেই তিন মাস কেমনে তিন বছর, তারপর চার বছরে গড়াইল—এইডা বুঝনের আগেই প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার ছাত্র উধাও হইয়া গেল!
মোরে এক কৃষকের কথা মনে পড়তেছে বাজান।
গেরামে এক রাখাল আছিল, গরু চরাইতে গিয়া ধানখেত সাবাড় কইরা ফেলতো। শেষে কৃষক আর সহ্য করতে না পাইরা কইল—
“বাপ, গরু রাখনের আগে ফসল বাঁচানো জরুরি।”
কিন্তু তোমাগো প্রতিষ্ঠানে দেখি উল্টা নিয়ম।
ফসল শেষ, জমি শুকনা, কৃষক কান্দতেছে—আর রাখাল কইতেছে, “আমি কোথাও যামু না!”
বাবাজি,
একসময় এই প্রতিষ্ঠানের নাম শুনলে মানুষ সালাম দিত। অভিভাবকরা লাইনে দাঁড়াইয়া ভর্তি করাইতো। পোলাপান বুক ফুলায়া কইতো—
“আমি অমুক প্রতিষ্ঠানের ছাত্র।”
আর আইজ চায়ের দোকানে বসলে মানুষ কই—
“ওইহানে এখন মামলা আর গ্রুপিং ছাড়া কিছু নাই!”
হায় রে কপাল!
শুনতেছি শিক্ষক শিক্ষকরে মামলা দিতেছে, অভিভাবক আদালতে যাইতেছে, ছাত্ররা মিছিল কইরা গালি দিতেছে!
ফেসবুকে তোমাকে কী কী নাম যে রাখছে—“ভুয়া”, “চোর”, “বাটপার”, “বালের প্রিন্সিপাল”—আল্লাহই মালুম!
বাবাজি,
একজন মাস্টারের জীবনে এইডার চেয়ে বড় অপমান আর কী হইতে পারে?
মাস্টার মানুষরে মানুষ সালাম দেয় ইজ্জতের লাইগ্যা।
আর যদি ছাত্ররা রাস্তায় স্লোগান দেয়—তয় বুঝবা ভিতরে ভিতরে ঘুণ ধইরা গেছে।
আরও ভয়ংকর কথা কানে আইছে।
কওন যায়, তুমি নাকি কখনো কখনো ছাত্রদের শিক্ষকগোর বিরুদ্ধেও খেপাইছো!
যদি এই কথা সত্যি হয়, তয় এইডা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা না—নৈতিক দেউলিয়াপনা।
কারণ শিক্ষক আর ছাত্রের সম্পর্ক হইলো বাপ-পোলার মতো।
এইখানে যদি আগুন লাগানো হয়, তয় পুরো প্রতিষ্ঠান ছাই হইতে বেশি সময় লাগে না।
বাজান,
আমাগো গেরামে এক ইমাম সাব আছিল। মানুষ খুব সম্মান করতো। পরে মসজিদ কমিটির লগে ঝগড়া লাগল। মুসল্লিরা দুই ভাগ। একদল এইপাশে, আরেকদল ওইপাশে।
তখন এক বুড়া মানুষ ইমাম সাবরে কইছিল—
“হুজুর, আপনি ঠিক না ভুল পরে দেখা যাইবো। কিন্তু আপনার কারণে যদি আল্লাহর ঘরে অশান্তি লাগে, তয় আল্লাহর ঘর বাঁচাইতে আপনাকেই সইরা যাইতে হইবো।”
পরদিন ইমাম সাব নিজে থাইকাই চইলা গেলেন।
দেখলা বাবাজি?
সম্মান জোর কইরা ধইরা রাখা যায় না।
সম্মান মানুষ দেয়।
আর চেয়ার?
চেয়ার আইজ আছে, কাইল নাই।
তুমি হয়তো ভাবো—
“আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হইতেছে।”
হইতেই পারে। দুনিয়াতে ষড়যন্ত্র আছে।
কিন্তু শিক্ষক ভুল, ছাত্র ভুল, অভিভাবক ভুল—খালি তুমি ঠিক?
তয় হাজার হাজার ছাত্র কমলো ক্যান?
ডিসিপ্লিন শেষ হইলো ক্যান?
মামলা বাড়লো ক্যান?
ছাত্ররা গালি দিল ক্যান?
এই প্রশ্নগুলা কি কখনো নিজের বুকের ভিতর করছো?
বাবাজি,
চেয়ার ধইরা থাকা খুব সহজ।
নিজের ব্যর্থতা মানা খুব কঠিন।
তোমার আশেপাশে কিছু চামচা টাইপ শিক্ষক কর্মচারী নিশ্চয়ই আছে।
ওরা কই—
“স্যার, আপনি না থাকলে আমাদের বিপদ হবে। লজ্জা-শরম করে লাভ কী। মাসটা গেলে তো টাকা পান।
এই জাতের মানুষ খুব ভয়ংকর।
ওরা তোমার ভালো চায় না—নিজের ফায়দা চায়।
কবরস্থানে গিয়া দেখো।
রাষ্ট্রপতি গেছে, প্রধানমন্ত্রী গেছে, বিচারপতি গেছে, সেনাপ্রধান গেছে।
আর তুমি তো মাত্র একটা প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল!
একজন সাচ্চা মুসলমান এই অপমান মানবো না।
একজন ভালো মানুষ জানে কখন সইরা দাঁড়াইতে হয়।
খারাপ নিলজ্জ মানুষ শুধু চেয়ার বাঁচাইতে জানে।
বাজান,
এখন তোমাগো প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার চেয়ে রাজনীতি বেশি।
শ্রেণিকক্ষের চেয়ে গ্রুপিং বড়।
রেজাল্টের চেয়ে মামলা বেশি আলোচিত।
এইডা কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লক্ষণ না।
একজন অভিভাবক যখন পোলারে অন্য স্কুলে লইয়া যায়, তখন সে শুধু ভর্তি ফরম নেয় না—একটা আস্থাহীনতার গল্পও লইয়া যায়।
সে কই—
“ওইহানে আর ভবিষ্যৎ নাই।”
এই কথাগুলাই একটা প্রতিষ্ঠানের মৃত্যু ঘণ্টা।
বাবাজি,
জামালপুরে এক মাইয়া স্কুলড্রেস পইরা মসজিদের সামনে টিকটকের ভিডিও বানাইছিল—হেই দোষে ভারপ্রাপ্ত হেডস্যার তারে ছাড়পত্র ধরাইয়া দিল!
আর তোমার অবস্থা দেইখা তো গেরামের মানুষ হাসতে হাসতে চায়ের কাপ ফালায়।
তোমার নিজের প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা তোমারে রাস্তায় গালি দেয়, ফেসবুকে গালি দেয়, মিছিল কইরা স্লোগান দেয়—তবুও তুমি চেয়ার ধইরা এমনভাবে বইসা আছো যেন কিছুই হয় নাই!
বাবাজি,
মোর তো মনে হয় তোমার চামড়া মানুষর না—গন্ডারের!
কারণ ইজ্জতওয়ালা মানুষ হইলে এত অপমানের পরে একদিনও ওই চেয়ারে বসে থাকতে পারতা না।
গেরামের ভাষায় একটা কথা আছে—
“মানুষের লাজ গেলে সে আয়না দেখে, আর নির্লজ্জ মানুষ চেয়ার দেখে!”
তুমি কোন দলে, হেইডা এখন পুরো বাংলাদেশের মানুষ বুঝে গেছে।
বাজান
মুই তো গেরামের মুখ্যসুখ্য মানুষ। বেশি কেতাবি বিদ্যা জানি না। তবে চায়ের দোকানে বইসা মানুষের আলাপ-আলোচনা শুনি। আর হেইখান থেইকাই অনেক কিছু কানে আসে।
শুনতেছি, তোমার প্রতিষ্ঠান চালানোর লাইগ্যা নাকি খালি তুমি একলা না—কমিটি টমিটিও আছে। বাহ্! তাইলে তো ভাবছিলাম, এতদিনে প্রতিষ্ঠান স্বর্গ হইয়া যাইবো। কিন্তু অবস্থা দেইখা তো মনে হয়, তোমারে চেয়ারে বসাইয়া সবাই মিলে বাটোয়ারা-মাটোয়ারা কইরা খুব সুন্দর মিলেমিশে চলতেছো!
গেরামের মানুষ কইতেছে—
“এইহানে লাজ-লজ্জা থাকলে এত কাণ্ডের পর কেউ চেয়ারে টিকতে পারতো না!”
বাবাজি,
আরেকটা কথা শুনে মোর মাথা ঘুরে যায়।
সারা বছর নাকি প্রতিষ্ঠানের লক্ষ লক্ষ টাকার কেনাকাটা হয়।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় কী জানো?
একই লোকজন বারবার ঘুরে ফিরে সব কাজ পাইয়া যায়!
এই লোকগুলার মধ্যে কী জাদু আছে বাবাজি?
চায়ের দোকানে মানুষ কয়—
“ওরা নাকি সবাইরে ম্যানেজ করতে পারে!”
মুই তো ভাবি, এরা কোন কারখানার তেল ব্যবহার করে?
এই তেল কি সরিষার তেল, না নারিকেলের তেল, না ক্ষমতার বিশেষ মবিল?
কারণ এমন তেল মর্দন করে যে বড় বড় মানুষও নরম হইয়া যায়!
গেরামের বুড়া মানুষ একটা কথা কইছিল—
“যেই প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতার চেয়ে তেলবাজির দাম বেশি হয়, হেইহানে শিক্ষার বাতি ধীরে ধীরে নিভা যায়।”
বাবাজি,
এই প্রতিষ্ঠানে কি আর ভালো মানুষ আসবো না?
সৎ মানুষ কি ভয় পাইয়া দূরে থাইকাই যাইবো?
যোগ্য লোক কি চেয়ারের আশেপাশে ঘেঁষতেই পারবো না?
যদি তাই হয়, তাইলে তো প্রতিষ্ঠান না—এইডা অল্প দিনের মধ্যে তেলবাজদের আড্ডাখানা হইয়া যাইবো।
মনে রাইখো বাবাজি,
যে ঘরে সত্য কথা বলা মানুষ থাকে না, হেই ঘরে একদিন পতনের কান্না ছাড়া আর কিছু শোনা যায় না।
বাবাজি,
যদি সত্যি প্রতিষ্ঠানরে ভালোবাসো, তয় নিজেরে একবার প্রশ্ন করো—
“আমার থাকার কারণে প্রতিষ্ঠান বাঁচতেছে, না ডুবতেছে?”
যদি মনে হয় ক্ষতি হইতেছে, তয় ইজ্জতের লগে সইরা দাঁড়াও।
ইতিহাসে অনেক মানুষ পদ ছাড়ার কারণে বড় হইছে।
কিন্তু চেয়ার আঁকড়াইয়া কেউ মহান হয় নাই।
মনে রাইখো—
একজন প্রতিষ্ঠানের প্রধানের আসল শক্তি সিল-স্বাক্ষর না, মানুষের বিশ্বাস।
মানুষ যদি বিশ্বাস হারায়, তয় ক্ষমতা কাগজের ওজন ছাড়া কিছুই না।
শেষে নসিয়ত চাচা হিসেবে আরেকটা কথা কইয়া যাই বাজান।
নদীতে পানি কমলে অভিজ্ঞ মাঝি জোর কইরা নৌকা চালায় না।
সে বুঝে—এই পথ নিরাপদ না।
কিন্তু অহংকারী মাঝি দাঁড় বাইতে বাইতে একসময় নৌকাসহ ডুইবা যায়।
বাজান,
তুমি মাঝি।
প্রতিষ্ঠান হইলো নৌকা।
আর শিক্ষার্থীরা যাত্রী।
তোমার একগুঁয়েমির কারণে যদি নৌকা ডুইবা যায়, ইতিহাস কিন্তু মাফ করবো না।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানরে বাঁচাও।
নিজের সম্মানটাও বাঁচাও।
ইতি—
নসিহত চাচা।
শিক্ষাবার্তা /এ/১২ /০৫/২০২৬
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
