৪ সিটিতে মেট্রোপলিটন পুলিশ প্রতিষ্ঠার দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও বগুড়া সিটি করপোরেশনে চারটি মেট্রোপলিটন পুলিশ ইউনিট গঠনের দাবি জানিয়েছে পুলিশ। এ ছাড়া পুলিশ বিভাগের অধীনে একটি ‘এভিয়েশন পুলিশ’ এবং সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে স্বতন্ত্র একটি ‘সাইবার ইউনিট’ গঠনেরও দাবি করা হয়েছে। বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোয় পুলিশ লিয়াঁজো অফিসার নিয়োগ এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর ও দুর্নীতি দমন কমিশনে প্রেষণে পুলিশ কর্মকর্তা পদায়নেরও দাবি করেছে পুলিশ। গতকাল সোমবার সকালে পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে পুলিশ বাহিনীর পক্ষ থেকে এসব দাবি উত্থাপন করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে ছয়জন পুলিশ কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্দেশে দাবিগুলো উপস্থাপন করেন। অনুষ্ঠানে প্রতি বছর ভূমি অধিগ্রহণ ও নির্মাণ খাতে হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ, পুলিশের জন্য আধুনিক ক্রীড়া কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা, প্রতিবছর যানবাহন ক্রয়ে রাজস্ব খাতে ৩০০ কোটি বরাদ্দ এবং সিলেট ও বরিশালে ২টি পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার স্থাপনেরও দাবি করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ঊত্থাপিত দাবিগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি (পার্সোনেল ম্যানেজমেন্ট-১) রায়হান উদ্দিন খান বলেন, দেশের জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। তারাই মূলত বাংলাদেশের অন্যতম অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং স্থিতিশীলতায় অসামান্য অবদান রাখছেন। কিন্তু এই রেমিট্যান্সযোদ্ধারা জীবনযুদ্ধে বিদেশে প্রতিনিয়ত নানাবিধ হয়রানি, ঝুঁকি, শারীরিক নির্যাতন, আন্তঃদেশীয় মানবপাচার, অপহরণ, মুক্তিপণ এমনকি হত্যাকাণ্ডেরও শিকার হচ্ছেন। অনেকেই মানবপাচারকারীদের ফাঁদে পড়ে উন্নত জীবনের আশায় ইউরোপগামী ভূমধ্যসাগরে পাড়ি দিতে গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন।

রায়হান উদ্দিন খান বলেন, এই ধরনের আন্তঃদেশীয় ফৌজদারি অপরাধ মোকাবিলায় একমাত্র পুলিশ বাহিনীর কার্যকর এবং সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, লিবিয়া, ইতালি, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরসহ গুরুত্বপূর্ণ দেশসমূহে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোয় পুলিশ লিয়াঁজো অফিসার বা লিগ্যাল এটাচি নিয়োগ দেওয়া হলে এ ধরনের আন্তঃদেশীয় অপরাধ মোকাবিলায় এটা একটি কার্যকর উদ্যোগ হতে পারে। এ ছাড়া যৌথ তদন্ত এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়, তদন্তের তথ্য বিনিময় এবং ক্রিমিনাল ইন্টেলিজেন্সের তথ্য শেয়ার করার কাজ সহজ হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ থেকে পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারের ক্ষেত্রেও পুলিশ লিয়াঁজো অফিসার কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন বলে তিনি জানান।

অতিরিক্ত ডিআইজি রায়হান উদ্দিন প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে আরও বলেন, মাদ্রকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মতো সরকারি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে প্রেষণে অভিজ্ঞ পুলিশ কর্মকর্তা নিয়োগ করা হলে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, জবাবদিহি, সুশাসন এবং জনসেবার মান আরও উন্নত করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আধুনিকায়নে এভিয়েশন পুলিশ ইউনিট গঠনের দাবি জানিয়ে সিআইডি প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মোসলেহ উদ্দিন আহমদ প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশে করে বলেন, বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীকে আধুনিক ও ত্রিমাত্রিক বাহিনী হিসেবে উন্নীত করার ধারাবাহিকতায় অপারেশাল কাজে ব্যবহারের জন্য দুটি হেলিকপ্টার সংস্থান হয়েছে। ছয়জন পুলিশ কর্মকর্তা পাইলট হিসেবে এবং ৪০ জন কর্মকর্তা হেলিকপ্টার রক্ষণাবেক্ষণে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়েছেন। ভৌগলিক বাস্তবতায় পার্বত্যঞ্চল, হাওর, চরাঞ্চল, দীপাঞ্চল এবং সুন্দরবনের মতো দুর্গম এলাকায় দ্রুত পুলিশিং সাড়া প্রদান, উদ্ধার তৎপরতা এবং অপরাধ দমন এবং নজরদারির জন্য আকাশপথে সক্ষমতা অত্যন্ত প্রয়োজন। পাশাপাশি উগ্রবাদ, মাদক, অস্ত্র পাচার, মানব পাচারসহ সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে একটি বিশেষায়িত এভিয়েশন পুলিশ ইউনিট গঠন এখন সময়ের অনিবার্য দাবি।

মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সন্ত্রাস দমন, ভিআইপি প্রটেকশন, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার প্রটেকশন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং জরুরি সেবা অত্যন্ত পেশাদারত্বের সঙ্গে পালন করছে পুলিশ। তবে দায়িত্ব বহুগুণ বাড়লেও প্রয়োজনীয় যানবাহন ও লজিস্টিক সক্ষমতা সমানভাবে বৃদ্ধি পায়নি। বর্তমানে ১৬ হাজার টিঅ্যান্ডওভুক্ত যানবাহনের মধ্যে সচল রয়েছে মাত্র ১১ হাজার। ফলে ৬ হাজার যানবাহনের ঘাটতি রয়েছে। এ ছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ৫২৬টি গাড়ি ভস্মীভূত, ৬৮২টি গাড়ি ভাঙচুর হয়েছে। ফলে জননিরাপত্তায় পুলিশের অপারেশনাল কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ৬৬৪টি থানায় অনেকগুলোয় মাত্র একটি বা দুটি প্যাট্রল পিকাপ রয়েছে, যা বিশাল এলাকায় সেবা দেওয়া দুরূহ। প্রতিটি থানায় ৪টি করে প্যাট্রল পিকাপ নিশ্চিত করা গেলে পুলিশের রেসপন্স টাইম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে এবং জনগণ দ্রুত পুলিশি সেবা পাবে। ২০১৮ সালের তুলনায় বর্তমানে যানবাহন ১৭ শতাংশ এবং জলযান ১৮ শতাংশ কমেছে। অথচ পুলিশের জনবল বৃদ্ধি পেয়েছে এবং একই সময়ে কয়েকটি নতুন ইউনিটের জন্য চারশটির অধিক যানবাহন ক্রয় অনুমোদন পেয়েছে। যা এখনও ক্রয় করা সম্ভব হয়নি। গত ৮ বছরে গড়ে ৪৪৯টি যানবাহন অচল হলেও নতুন ক্রয় করা হযেছে মাত্র ১৮৪টি। তিনি প্রতিবছর যানবাহন ক্রয়ে রাজস্ব খাতে ৩০০ কোটি বরাদ্দ প্রদানের দাবি করেন।

ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশে করে বলেন, বাংলাদেশ পুলিশ সদস্যদের দক্ষতা ও পেশাগত সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বর্তমানে প্রশিক্ষণ অবকাঠামোর সীমাবদ্ধার কারণে প্রয়োজনীয় মৌলিক ও উন্নত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমানে সিলেট ও বরিশাল অঞ্চলে পৃথক পিটিসি না থাকায় প্রশিক্ষণার্থীদের দূরবর্তী স্থানে যেতে হচ্ছে। এতে সময় ও অর্থ ব্যয় এবং কার্যকারিতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। একই সঙ্গে বিদ্যমান প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর সীমিত সক্ষমতার কারণে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এ লক্ষ্যে সিলেট ও বরিশাল অঞ্চলে ২টি পিটিসি প্রতিষ্ঠা জরুরিভাবে অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

তিনি আরও বলেন, দেশের ৪টি গুরুত্বপূর্ণ সিটি করপোরেশন ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও বগড়ায় দ্রুত নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, শিল্প বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও যানবাহনের চাপ বৃদ্ধির কারণে নগর ব্যবস্থায় জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এসব নগরে ট্রাফিক জট, কিশোর অপরাধ, মাদক, সাইবার অপরাধসহ অপরাধ প্রবণতা মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে জেলা পুলিশ দিয়ে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই সিটি করপোরেশন এলাকা হিসেবে ময়মনসিং, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও বগুড়ায় মেট্রোপলিটন পুলিশ গঠন বিশেষ প্রয়োজন। তিনি প্রতি বছর ভূমি অধিগ্রহণ এবং নির্মাণ খাতে এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের দাবি করেন। এ ছাড়া অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যমান ডবল স্টার কোড জটিলতা প্রত্যাহারের আবেদন করেন।

ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন পুলিশের জন্য আধুনিক সুযোগ সুবিধা সংবলিত একটি আধুুনিক ক্রীড়া কম্পপ্লেক্স গড়ে তোলার দাবি করেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি আহম্মদ মুঈদ পুলিশের সন্তানদের জন্য প্রতিটি জেলায় স্কুল, পুলিশের আবাসন সংকট নিরসনে প্রতিটি বিভাগে আবাসন প্রকল্প এবং রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালসহ পুলিশের জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির দাবি করেন। বিশেষ করে রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে অভিজ্ঞ ডাক্তার, টেকনিশিয়ানসহ ইক্যুইপমেন্টের ঘাটতির কথা তুলে ধরে এ সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণের দাবি করেন।

ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার প্রধানমন্ত্রীর কাছে সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে একটি স্বতন্ত্র সাইবার ইউনিট গঠনের দাবি করেন।

শিক্ষাবার্তা /এ/১২ /০৫/২০২৬

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.