এইমাত্র পাওয়া

খোকসা: বৈধতা পেল ১২ কর্মচারীর নিয়োগ, নিয়োগ বাণিজ্যের হোতারা অধরা!

আল আমিন হোসেন মৃধা, ঢাকাঃ কুষ্টিয়ার খোকসা সরকারি কলেজে ‘নো ওয়ার্ক, নো পে’ ভিত্তিতে শ্রমিক নিয়োগে লক্ষ লক্ষ টাকার নিয়োগ বাণিজ্য করা  নিয়োগের বৈধতা পেয়েছে কলেজটির  একাডেমিক কাউন্সিলে। তবে পূর্বের নিয়োগের বৈধতা পেলেও এই নিয়োগে লক্ষ লক্ষ টাকার বাণিজ্য করা শিক্ষক-কর্মচারীরা অধরাই থেকে গেলেন।

গত বুধবার (২৭ ডিসেম্বর) খোকসা সরকারি কলেজের একাডেমিক কাউন্সিলের ২৪ জন সদস্যের অধিকাংশের উপস্থিতিতে এবং স্বাক্ষরে প্রায় ৩০ লাখ টাকা উৎকোচের বিনিময়ে নিয়োগ পাওয়া এসব মুজুরি ভিত্তিক কর্মচারী নিয়োগের বৈধতা পায়। শিক্ষকদের নিকট করজোড়ে ক্ষমা চেয়ে এই নিয়োগের বৈধতা করে নেন নিয়োগ বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান হোতা কলেজটির সদ্য সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সহকারী অধ্যাপক মোঃ বেলাল উদ্দিন।

এদিন ১২ জন কর্মচারীর নিয়োগ বৈধতা পায়। যার মধ্যে দুই জন ২০২০ সালের শুরুতে নিয়োগ পান এবং বাকি দশ জন নিয়োগ পান চলতি বছরের জুন এবং জুলাই মাসে। ১২ জন কর্মচারীর মধ্যে দুই জন নিয়োগকালীন সময় থেকে বেতন পেয়ে আসছিলেন এবং দশ জন শ্রমিক চলতি বছরের আগস্ট এবং সেপ্টেম্বরের মাসের বেতন পেয়েছিলেন। খোকসা কলেজের একাধিক আর্থিক অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতা  নিয়ে শিক্ষাবার্তা’য় কয়েকটি সংবাদ প্রকাশিত হলে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ পাওয়া এসব কর্মচারীদের বেতন বন্ধ হয়ে যায়।

দৈনিক মুজুরি ভিত্তিক শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া এসব কর্মচারীরা হলেন, হিসাব শাখার অফিস সহায়ক আব্দুর রউফ,  অফিস সহায়ক (সাধারণ শাখা/বাজার/ব্যাংক) মোঃ টিপু সুলতান, ব্যবস্থাপনা বিভাগে (মালী) মোঃ আব্দুল করিম, বাংলা বিভাগে অফিস সহায়ক পদে মোঃ ফরহাদ হোসেন, সমাজকর্ম বিভাগে অফিস সহায়ক পদে জুয়েল রানা, ইসলানের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে অফিস সহায়ক পদে মো; হাবিবুর রহমান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অফিস সহায়ক পদে জ্যোতি শাহা, গণিত বিভাগে অফিস সহায়ক পদে সায়েম হোসাইন, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগে অফিস সহায়ক পদে মোঃ ফারুক হোসেন, অর্থনীতি বিভাগে অফিস সহায়ক পদে মোঃ আব্দুল মতিন, হিসাববিজ্ঞান বিভাগে অফিস সহায়ক পদে আতাউর হক হিরন এবং নাইট গার্ড মোঃ জনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিয়োগ পাওয়া কয়েকজন কর্মচারী বলেন, ‘আমাদেরকে বলা হয়েছিল মুজুরি ভিত্তিক নিয়োগ হলেও দুই-এক বছরের মধ্যে আমাদের চাকরি স্থায়ী হয়ে যাবে। সারা দেশের বিভিন্ন অফিসে মাস্টাররোলে কর্মচারীদের পরবর্তীতে স্থায়ী করা হয় সেভাবেও আমাদের কর্মচারীদের চাকরি স্থায়ী করা হবে। এজন্য কেউ তিন লাখ কেউ বা পাঁচ লাখ যে যেমন পেরেছে তার থেকে সেই পরিমাণ অর্থ আদায় করে এই নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে।’

কলেজ সূত্র বলছে, নিয়োগ যে প্রক্রিয়ায় হোক না কেন, অতি মানবিক বিষয় হওয়ায় যেহেতু এই দৈনিক মুজুরি ভিত্তিক কর্মচারীরা অধিকাংশই খুবই নিন্ম আয়ের পরিবারের সেই বিষয়টি বিবেচনা করে নিয়োগ প্রক্রিয়াটা সম্পন্ন করা হয়েছে। নিয়োগ বৈধতা নিয়ে তেমন প্রশ্ন না উঠলেও মূলত সবার চাওয়া এই হতদরিদ্র মানুষগুলোর কাছ থেকে যারা নিয়োগ বাণিজ্য করেছে তাদের বিষয়টি সামনে আসুক। নিয়োগ বাণিজ্যে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। 

১২ জনের মধ্যে করোনার আগে অর্থ্যাৎ ২০২০ সালের শুরুতে অফিস সহায়ক (সাধারণ শাখা/বাজার/ব্যাংক পদে নিয়োগ পান মোঃ টিপু সুলতান এবং ব্যবস্থাপনা বিভাগে নিয়োগ মোঃ আব্দুল করিম। আর এই দুই জনের নিয়োগ দেন তৎকালীন অধ্যক্ষ কলেজটির সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ (অবসর প্রাপ্ত) মুহঃ আনিছ-উজ-জামান। নিয়োগে এই দুই কর্মচারীর নিকট থেকে প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক টাকা নেওয়া হয়। আর নিয়োগে নিয়োগ বাণিজ্যের সাথে জড়িত ছিলেন কলেজটির অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান আনিসুর রহমান এবং অফিস সহকারী কাম হিসাব সহকারি নাজমুল হুদা রাসেল।

জুন জুলাই মাসে নিয়োগ পাওয়া ১০ জন কর্মচারীদের নিয়োগ দেন তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত  অধ্যক্ষ সহকারী অধ্যাপক মোঃ বেলাল উদ্দিন। আর বেলাল উদ্দিনের এই কাজের সার্বক্ষণিক সহযোগী হিসেবে ছিলেন  অফিস সহকারী কাম হিসাব সহকারি নাজমুল হুদা রাসেল, অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান আনিসুর রহমান, বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মোঃ ওয়াজেদ আলী এবং ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের প্রভাষক মুহাঃ আরিফ হোসেন।

একাডেমিক কাউন্সিলে উপস্থিত একাধিক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ছুটির মধ্যে কলেজ প্রশাসন একদিন আগে অর্থ্যাৎ মঙ্গলবার কাউন্সিলের সদস্যদের মুঠোফোনে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে জানায় বুধবার কাউন্সিলের সভা। তবে সভার কোন এজেন্ডা আগে থেকে জানানো হয়নি। সভায় দুই তিন জন সদস্য উপস্থিত থাকতে না পেরে অধিকাংশ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। সভার শুরুতেই ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের প্রভাষক মুহাঃ আরিফ হোসেন উপস্থিত সদস্যদের সাথে কেন আমরা নিয়োগের বিষয়ে গড়িমসি করছি বলে গালমন্দ করে খারাপ আচরণ করেন। পরে অধ্যক্ষ মহোদয়ের বলার পর তিনি চেপে যান। এরপর সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বেলাল উদ্দিন পূর্বে তাদের মতামত না নিয়ে নিয়োগ দিয়েছেন যা ঠিক হয়নি এবং ক্ষমা চেয়ে কাউন্সিলের সদস্যদের কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা চান এবং সংশোধনী রেজুলেশনে স্বাক্ষর দিতে বলেন।

উপস্থিত কয়েকজন শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, আমরা এই কর্মচারীদের বৈধতা দিতে কখনও বিরোধী নই। সামান্য মুজুরি ভিত্তিক শ্রমিক নিয়োগে যারা লাখ লাখ টাকা বাণিজ্য করেছে তাদের মুখোশ উন্মোচন হোক সেই দাবি করেছিলাম। কিন্তু সেটা না করে কলেজ প্রশাসন নিয়োগের বৈধতা দিয়ে দিলেন।

শিক্ষাবার্তা’র অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিয়োগ পাওয়া এসব কর্মচারীদের মধ্যে অধিকাংশই খুবই নিন্ম আয়ের পরিবার থেকে উঠে আসা। কেউ গরু বিক্রি করে, কেউ-বা জমি বিক্রি কিংবা বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ করে নিয়োগ নিতে ঘুস দিয়েছেন। শুধু মাত্র কয়েকদিন বাদেই চাকরি সরকারী হয়ে যাবে এই আশায়।

নিয়োগ বাণিজ্যে জড়িত থাকার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কলেজটির সদ্য সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও কর্মচারী নিয়োগকালীন  ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বেলাল উদ্দিনের মুঠোফোন নম্বরটি বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

অফিস সহকারী কাম হিসাব সহকারী নাজমুল হুদা রাসেলের মুঠোফোনে কল করলে তিনি রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে মুঠোফোনটি বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান আনিসুর রহমান, বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মোঃ ওয়াজেদ আলী এবং ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের প্রভাষক মুহাঃ আরিফ হোসেন এই তিনজনের কারও বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষক শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, কলেজটির ব্যাপক অনিয়মের মধ্যে দিয়ে এতদিন চলছিল। পূর্বের নিয়োগের এভাবে বৈধতা কাম্য নয়। তবে বর্তমান শিক্ষা ক্যাডার অধ্যক্ষ আসায় কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ করছি। যেদিন থেকে গণমাধ্যমে অনিয়ম গুলো নিয়ে প্রতিবেদন আসছে তখন থেকে আর্থিক অনিয়মগুলো কমতে শুরু করে। এই নিয়োগ বাণিজ্যের সাথে যারা জড়িত তাদের মুখোশ উন্মোচন করা জরুরী। যেন পরবর্তীতে কেউ এরকম অপকর্ম করতে সাহস না করে।

জানতে চাইলে শিক্ষা ক্যাডার অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোহা. আব্দুল লতিফ  শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, পুরাতন রেজুলেশন কিছু সংশোধনী করে এটা একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্তে নিয়োগটার রেজুলেশন করা হয়েছে। মানবিক বিষয়, দুই মাস এদের বেতন বন্ধ ছিল সেই বিবেচনা করে এটা করা হয়েছে। তবে যদি কেউ এই নিয়ো্গে আর্থিক লেনদেনের সাথে জড়িত থাকে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এজন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দিব।

 

আরও পড়ুনঃ

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/৩০/১২/২০২৩

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.