মো. হাসান উল বারীঃ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে শিক্ষার্থীদের যোগ্য ও দক্ষ করে গড়ে তোলা প্রয়োজন। আমাদের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনকে নান্দনিক ও আনন্দময় করার পাশাপাশি চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে নিজেদের খাপখাইয়ে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে সর্বোপরি ২০৪১ সালের মধ্যে স্মার্ট তথা উন্নত সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যে নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করা হয়েছে। নতুন শিক্ষাক্রম ব্যস্তবায়নের মূল কারিগর শিক্ষক সমাজ। শিক্ষকদের প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।
যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম: যোগ্যতা বলতে সুনির্দিষ্ট আচরণকে বোঝানো হয়। পঠনপাঠনের মধ্য দিয়ে কোনো জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিপূর্ণভাবে আয়ত্ব করার পর শিক্ষার্থী তার বাস্তব জীবনে প্রয়োজনের সময় কাজে লাগাতে পারলে সেই জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গির সমষ্টিকে যোগ্যতা বলে। যে শিক্ষাক্রমে শিক্ষা শেষে প্রত্যেক বিষয় ও শ্রেণির নির্ধারিত অর্জন উপযোগী যোগ্যতাগুলো ক্রমানুসারে অর্জন করার লক্ষ্যে বিন্যস্ত করা হয়েছে তাকে যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম বলে। আমাদের নতুন শিক্ষাক্রম যোগ্যতাভিত্তিক।
৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত থাকছে অভিন্ন ১০টি বিষয়: নতুন শিক্ষাক্রমে ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীকেই অভিন্ন ১০টি বিষয় পড়তে হবে। বিষয়গুলো হলো: বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান, ডিজিটাল প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, জীবন ও জীবিকা, শিল্প ও সংস্কৃতি এবং ধর্ম ।
বাড়ির কাজ থাকছে: উন্নত বিশ্বের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে শিখন ঘণ্টা গড়ে ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা। অথচ, আমাদের দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে শিখন ঘণ্টা সর্বোচ্চ ৬ ঘণ্টা (দুই শিফ্ট চালু আছে এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে শিখন ঘণ্টা মাত্র ৪ থেকে সাড়ে ৪ ঘণ্টা)। ফলে উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষার্থীদের বাড়ির কাজের প্রয়োজন নেই। কিন্তু আমাদের দেশে অবশ্যই বাড়ির কাজ থাকা উচিত। নতুন কারিকুলামে বাড়ির কাজ হিসেবে অনুসন্ধানমূলক বা সরাসরি কাজ দেওয়ার বিষয়ে শিক্ষক সহায়িকাতে উল্লেখ করা আছে।
মূল্যায়নে থাকছে পরীক্ষা: মূল্যায়ন শিক্ষাক্রমের একটি অপরিহার্য ও অবিচ্ছিন্ন অংশ। মূল্যায়নের অনেকগুলো পদ্ধতি রয়েছে। পরীক্ষা তার মধ্যে একটি। নতুন শিক্ষাক্রমে মূল্যায়ন হবে দুই ভাগে। এক ভাগের মূল্যায়ন হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই, শিখনকালীন নানা কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে। আরেক অংশের মূল্যায়ন সামষ্টিকভাবে। পরীক্ষা, অনুসন্ধানমূলক কাজ, অ্যাসাইনমেন্ট, উপস্থাপন, যোগাযোগ, হাতে-কলমের কাজ, কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন, মেলা ইত্যাদি বহুমুখী পদ্ধতি ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হবে। শিক্ষার্থী মূল্যায়নে শিখনকালীন ও সামষ্টিক মূল্যায়নের সংমিশ্রণ করা হয়েছে। প্রারম্ভিক শ্রেণিগুলোতে শিখনকালীন মূল্যায়নের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে এবং ধারাবাহিকভাবে উঁচু শ্রেণিতে শিখনকালীন মূল্যায়ন কমিয়ে সামষ্টিক মূল্যায়নের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে।
শিখনকালীন মূল্যায়ন অনানুষ্ঠানিক ও ধারাবাহিকভাবে সম্পন্ন করা হবে। শিক্ষার্থীর জ্ঞান, আগ্রহ, আচরণ, অংশগ্রহণ, দৃষ্টিভঙ্গি, দক্ষতা, নৈতিকতা, দূরদর্শিতা ইত্যাদি বিভিন্ন পদ্ধতি ও কৌশলের মাধ্যমে যথাযথ প্রয়োগ করে যোগ্যতাভিত্তিক যে মূল্যায়ন তা শিখনকালীন মূল্যায়ন। বছরজুড়েই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিখনকালীন মূল্যায়ন চলতে থাকবে। নির্দিষ্ট সময় বা পর্যায় সমাপ্তিতে শিক্ষার্থীর অগ্রগতি যাচাই করা হলো চূড়ান্ত বা সামষ্টিক মূল্যায়ন। এ মূল্যায়ন শিক্ষা বছরের মধ্য সময়ে এবং শেষে, দুই বার করা হবে। নির্দিষ্ট সময়ে সামষ্টিক মূল্যায়ন শেষে তার রেকর্ড, তথ্য, উপাত্ত বা প্রমাণকের ভিত্তিতে শিক্ষক পারদর্শিতার নির্দেশকে তার ইনপুট দেবেন। এখানে উল্লেখ্য যে, শিক্ষার্থীর এই মূল্যায়ন শুধুমাত্র শিক্ষকই করবেন না। শিক্ষকের পাশাপাশি কিছু কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর অভিভাবক, সহপাঠী এবং এলাকার লোকজন/কমিউনিটি/স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এই মূল্যায়নে অংশগ্রহণ করবে।
গণিত বই প্রসঙ্গ: অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন শেখানো কৌশল প্রয়োগ করে বিভিন্ন গাণিতিক সমস্যার সমাধান নতুন পাঠ্যপুস্তকে অনেক সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একজন শিক্ষকের শ্রেণি পাঠদানে অনেক উপকারে আসবে। তবে নতুন বইয়ের বড় অসুবিধা হচ্ছে, প্রতিটি অধ্যায় শেষে অনুশিলনমূলক সমস্যা না থাকা, যেটি গণিত বই হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে। কারণ, কথায় আছে, চৎধপঃরপব সধশবং ধ সধহ ঢ়বৎভবপঃ. অর্থাৎ, অনুশীলন একটি মানুষকে নিখুঁত করে তোলে। আগের কারিকুলামে প্রতিটি অধ্যায়ে পর্যাপ্ত উদাহরণ ছিল। নতুন কারিকুলামের বইয়ে উদাহরণেরও স্বল্পতা পরিলক্ষিত হচ্ছে।
পাবলিক পরীক্ষা: নতুন শিক্ষাক্রমে নবম শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পাবলিক পরীক্ষা রাখা হয়নি। দশম শ্রেণিতে একটি পাবলিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে, যেখানে শিখনকালীন ও সামষ্টিক মূল্যায়ন ধরা হয়েছে ৫০ শতাংশ করে। অন্যদিকে একাদশ শ্রেণি শেষে একাদশ শ্রেণির পাঠ্যক্রমের উপর একটি পাবলিক পরীক্ষা এবং দ্বাদশ শ্রেণি শেষে দ্বাদশ শ্রেণির পাঠ্যক্রমের উপর আরেকটি পাবলিক পরীক্ষার বিধান রাখা হয়েছে। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির পাবলিক পরীক্ষায় ৩০ শতাংশ শিখনকালীন আর ৭০ শতাংশ সামষ্টিক মূল্যায়নের কথা বলা হয়েছে। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির গড় ফলাফলের ভিত্তিতে উচ্চ মাধ্যমিকের ফলাফল প্রকাশ করা হবে।
নিন্মের সুপারিশসমূহ আমলে নেওয়া যেতে পারে: ১. কারিকুলাম বাস্তবায়ন অন্তে পর্যায়ক্রমিকভাবে মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনলে ভালো হতো। ২. কারিকুলাম বাস্তবায়নে অতিরিক্ত খরচ মেটাতে প্রতিষ্ঠান প্রতি সরকারি বাজেট বরাদ্দ দেওয়া উচিত। ৩. কারিকুলাম সংশ্লিষ্ট সকল শিক্ষা উপকরণ সরকারিভাবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা দরকার। ৪. জাতীয় বাজেটে শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন। ৫. বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকদের দেশে ও বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ৬. রেডিও, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও প্রিন্ট মিডিয়ায় নতুন কারিকুলাম সংশ্লিষ্ট প্রচার প্রচারণা চালানো উচিত। ৭. শিক্ষক স্বল্পতা কমানো অর্থাৎ শিক্ষক ছাত্রের অনুপাত কমানো দরকার। ৮. প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞান ও আইসিটি ল্যাব স্থাপন করা উচিত।
লেখক: শিক্ষক, মিলেনিয়াম স্কলাস্টিক স্কুল এন্ড কলেজ, জাহাংগীরাবাদ ক্যান্টনমেন্ট, বগুড়া।
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১৫/১২/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
“মুক্তমত ও সাক্ষাৎকার কলামে প্রকাশিত নিবন্ধ লেখকের নিজস্ব। শিক্ষাবার্তা’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, শিক্ষাবার্তা কর্তৃপক্ষের নয়।”
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
