চট্টগ্রামঃ তথ্য গোপন করে শিক্ষক হওয়া এবং পদোন্নতি বোর্ডের সদস্যদের অসন্তুোষ সত্ত্বেও সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক সুলতানা সুকন্যা বাশার। শিক্ষক আবেদনে রেজাল্টের সন এবং মেরিট পজিশনে তথ্য গোপন করেন তিনি। এ নিয়ে শিক্ষক মহলে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা।
ছাত্রজীবনের অনার্স চতুর্থ বর্ষে ৪০৬ নং কোর্সের পরীক্ষায় নকলে ধরা পড়ায় খাতা বাতিল হয় সুুকন্যা বাশারের। ফলে তার অনার্স ও মাস্টার্সের ফলাফল একই বছর অর্থাৎ ২০০৮ সালের।
তার অনার্স ও মাস্টার্স পরীক্ষার ফলাফল ২০০৮ সালের হলেও শিক্ষক নিয়োগের আবেদনে অনার্স ২০০৭ ও মাস্টার্স ২০০৮ দেখানো হয়। এছাড়াও তিনি আবেদনপত্রে অনার্সে ৬ষ্ঠ স্থান উল্লেখ করলেও তার পজিশন ছিল আরো পেছনে। ২০০৭ সালের অনার্স পরীক্ষায় বিভাগটিতে ৩.৫২ সিজিপিএ পেয়ে ৬ষ্ঠ হয়েছিলেন লায়লা মুশতারী ও শাহীনা পারভীন নামের দুজন শিক্ষার্থী। আর সুকন্যা বাশারের সিজিপিএ ছিল ৩.৪৩। পরের বছর ২০০৮ সালে বাতিলকৃত কোর্সের পরীক্ষা দিয়ে সিজিপিএ হয় ৩.৫১। আবেদনপত্রে এসব তথ্যে জালিয়াতি থাকলেও অজানা কারণে পার পেয়ে যান তিনি। বিভাগীয় প্ল্যানিং কমিটি এবং নিয়োগ বোর্ড কোথাও এই ভুলগুলো ধরেনি। বিভাগ সূত্রে জানা যায়, তিনি ২০১৩ সালে চবির ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রভাষক পদে নিয়োগ পান।
শিক্ষক নিয়োগের আবেদনপত্রে তথ্য গোপন করলেও ২০১৬ সালে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির আবেদনে অনার্স পরীক্ষার সন ২০০৮ (মানোন্নয়ন) এবং মাস্টার্স পরীক্ষার সন ২০০৮ উল্লেখ করেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, শিক্ষক নিয়োগে বাঁধা দূর করতে এমন গোপনীয়তার আশ্রয় নিয়েছেন তিনি।
সম্প্রতি তার পদোন্নতি নিয়েও চলছে সমালোচনা। বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ভাইভা বোর্ডে প্রশ্নের উত্তর না পারায় পদোন্নতি বোর্ডের ৮ জন সদস্যের বেশিরভাগই সন্তুষ্ট ছিলেন না। বোর্ডে তার পদোন্নতির জন্য ১ বছর সময় দিয়ে শর্তসাপেক্ষে সুপারিশ করে বলা হয়েছে, “তাকে প্রথম বাংলাদেশ সরকারের মুখপাত্র ‘জয় বাংলা’ পত্রিকার সম্পাদকীয় এর উপর এক বছরের মধ্যে ইতিহাস সংশ্লিষ্ট একটি গবেষণা প্রকাশ করতে হবে। না করলে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি কনফার্ম হবে না”। কিন্তু সেই শর্ত গ্রাহ্য না করেই গত ৩১ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৪৫ তম সিন্ডিকেট সভায় তাকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়।
পদোন্নতি বোর্ডে কোনো প্রশ্নের সঠিক উত্তর না দিতে পেরেও পদোন্নতি পাওয়া গেলে এ বোর্ডের ভূমিকা কী- এমন প্রশ্নের জবাবে বোর্ডের জ্যেষ্ঠ সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সেকান্দর চৌধুরী বলেন, পদন্নোতি বোর্ড তো শুধু সুপারিশ করে। বাকিটা সিন্ডিকেটের ইচ্ছা। সিন্ডিকেট মনে করলে সিলেকশন কমিটির অনেক কিছু পরিবর্তন পরিমার্জন করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
শর্ত গ্রাহ্য না করেই কেন পদোন্নতি দেওয়া হলো এ প্রশ্নের জবাবে সিন্ডিকেট সদস্য ড. নঈম উদ্দিন হাছান আওরঙ্গজেব চৌধুরী বলেন, তাকে পদোন্নতি শর্ত সাপেক্ষে দেওয়া হয়েছে। তাকে যে শর্ত দেওয়া হয়েছে তা যদি ১ বছর পর পূরণ করতে না পারেন তাহলে পদোন্নতি নিশ্চিত হবে না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিক্ষাজীবনের চতুর্থ বর্ষের ৪০৬ নম্বর কোর্সের পরীক্ষায় তিনি নকলসহ ধরা পড়ায় তার খাতা বাতিল করা হয়েছিল। শ্রেণি কক্ষে দায়িত্বরত শিক্ষক ড. হাসিনা আখতার ও সাবিনা নার্গিস লিপি তাকে বহিষ্কার করতে চাইলেও তিনি ভবিষ্যতে এমন কাজ করবেন না বলে ক্ষমা চান। অনার্স শেষ বর্ষের পরীক্ষা চিন্তা করে তৎকালীন পরীক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. তৌহিদ হোসেন চৌধুরী তাকে বহিষ্কার না করলেও ওই কোর্সের সব প্রশ্নের উত্তর কেটে দিয়ে খাতা বাতিল করেন। নকলের কারণে তাকে ওই পরীক্ষা পরের বছর আবার দিতে হয়। তাই তার অনার্স এবং মাস্টার্সের সার্টিফিকেট একই সেশনের।
তথ্য জালিয়াতির অভিযোগ থাকলেও প্ল্যানিং কমিটি কেন বিষয়গুলো ধরেনি এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. গোলাম কিবরিয়া ভূঁইয়া বলেন, এটা অনেক আগের বিষয়, তাই সম্পূর্ণ মনে নেই। তবে প্ল্যানিং কমিটিতে তথ্য ভুল দেওয়ার বিষয়গুলো আলোচনা হয়েছিলো। তখন কমিটির একজন সদস্য উনার পক্ষ নিয়ে বলেছিলেন প্রার্থী এগুলো সংশোধন করে দিবেন। এরপর সংশোধন করেছে কি-না তা বলতে পারবো না।
তৎকালীন বিভাগীয় চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ বশির আহাম্মদের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিক পরিচয় জেনে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। একাধিক চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
শিক্ষক নিয়োগের আবেদনপত্রে তথ্য জালিয়াতির ব্যাপারে জানতে চাইলে সুলতানা সুকন্যা বাশার বলেন, আবেদনপত্রে দেওয়া তথ্যে যদি কোনও ভুল থাকে তা প্রিন্টিং মিস্টেক বা আমারও ভুল হতে পারে।
পরীক্ষায় নকলের বিষয়ে তিনি বলেন, আমার ওই পরীক্ষায় একটি প্রশ্নও কমন পড়ে নাই। তাই সাপ্লি রেখেছি। নকলের বিষয়টা সত্য নয়।
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০৩/১২/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
