রাজবাড়ীঃ জেলার গোয়ালন্দ আইডিয়াল হাই স্কুল নামের একটি এমপিওভূক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারীর ৪ মাস ধরে বেতন বন্ধ থাকায় তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতির পদত্যাগ জটিলতায় চলতি বছরের জুলাই মাস থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত বেতন-ভাতা উত্তোলন করতে পারছেন না তারা। স্কুলটির প্রধান শিক্ষক ফকির আ. কাদেরের খামখেয়ালীপানায় এ জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। এ মর্মে ভূক্তভোগী শিক্ষক-কর্মচারীরা জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর একটি অভিযোগ দেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, এমপিওভূক্ত গোয়ালন্দ আইডিয়াল হাই স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ফকির আব্দুল জব্বার শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে গত জুলাই মাসের ৬ তারিখে পদত্যাগ করেন। এর ফলে ওই স্কুলের ১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারীর চলতি বছরের জুলাই মাস থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত ৪ মাসের সরকারী অংশের বেতন-ভাতা উত্তোলন বন্ধ রয়েছে এবং চলতি মাসের বেতন-ভাতা উত্তোলনের ক্ষেত্রেও শঙ্কা রয়েছে।
ইতোমধ্যে এ বিষয়ে গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, সভাপতির পদত্যাগ পত্রটি শিক্ষাবোর্ডে গৃহীত হয়নি কাজেই পূর্বের কমিটিই বহাল রয়েছে। এরপর এ বিষয়ে শিক্ষক-কর্মচারীরা প্রধান শিক্ষককে বেতন-ভাতার বিলে স্বাক্ষর করার অনুরোধ করলে সে সকল শিক্ষক-কর্মচারীর ১ মাসের বেতনের সমপরিমান টাকা তাকে দিতে হবে তাহলেই কেবল বেতন বিলে স্বাক্ষর করবেন বলে প্রস্তাব করেন। কিন্তু এ প্রস্তাবে তারা অস্বীকৃতি জানালে স্কুলের প্রধান শিক্ষক ফকীর আ. কাদের বেতন-ভাতার বিলে স্বাক্ষর না করে বিভিন্ন ধরনের তালবাহানা করছেন।
এদিকে নভেম্বর মাসের ১৬ তারিখে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভায় সভাপতি ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা প্রধান শিক্ষককে বার বার অনুরোধ করেন এবং সর্বশেষ নির্দেশ দেওয়া সত্বেও সে বেতন-ভাতার বিলে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানায়। এমতাবস্থায় স্কুলটির ১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারী পরিবার-পরিজন নিয়ে আর্থিক কষ্টে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন।
ভূক্তভোগী শিক্ষক দীপালী রায় বলেন, তারা স্বামী-স্ত্রী দুইজনই এই স্কুলে কর্মরত। তাদের বড় ছেলেটা রাজশাহী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রুয়েট) পড়ালেখা করছে। কিন্তু আমাদের বেতন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমাদের পাশাপাশি আমাদের মেধাবী ছেলেটাও নানা দূর্ভোগের শিকার হচ্ছে। যে করনে নিরুপায় হয়ে আমরা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। আমরা দ্রুত সময়ের মধ্যে আমাদের ন্যায্য সমুদয় বেতনসহ আমাদের সাথে ঘটা অপরাধের ন্যায় বিচার দাবি করছি।
শিক্ষক দীপক কুমার বলেন, তার তিনটি ছেলেমেয়ে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে। গত ৪ মাস ধরে আমি তাদের ভরণ-পোষনসহ লেখাপড়ার ব্যায় মেটাতে পারছি না। এ নিয়ে প্রধান শিক্ষকের সাথে কথা বলতে গেলে তিনি আমাদের মালাউনের বাচ্চা, নাপিতের বাচ্চা, চামারের বাচ্চা, মুচির বাচ্চা প্রভূতি বলে গালিগালাজ করেন। একজন শিক্ষক হিসেবে নিজেকে তখন বড্ড অসহায় মনে হয়।
আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ নামের এক শিক্ষক আবেগী কন্ঠে বলেন, শিক্ষকতা ছাড়া তার আর কোন আয়ের পথ নেই। পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতরভাবে বেঁচে আছেন। ধার-দেনায় জর্জরিত হয়ে গেছেন। গত ৪ টা মাস স্ত্রী-সন্তানদের সামনে একটু মাছ মাংস খেতে দিতে পারেননি। এই কষ্ট মেনে নিতে পারছি না।
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক সাধন কুমার সাহা বলেন, তিনি বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত। কিন্তু অর্থাভাবে চিকিৎসকের দেয়া নির্দেশনা অনুযায়ী ওষুধ খেতে পারছেন না। সংসারের অন্যান্য মৌলিক চাহিদাও মেটাতে পারছেন না। বাজারের দোকানদাররা আর বাকি দিতে চাচ্ছেন না। মনোকষ্টে যে কোন সময় হয়তো স্ট্রোক করে মারা যেতে পারেন। তাছাড়া যেনতেন কারনে প্রধান শিক্ষক তাদের সাথে দুর্ব্যবহার ও জাত-পাত তুলে অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করেন। গায়ে হাত তোলেন। তার দূর্ব্যবহারের কারনে আমি কিছুদিন আগে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমি নিঃসন্তান বলে অসহায় স্ত্রীর কথা ভেবে আত্মহত্যাও করতে পারিনি।
এ বিষয়ে গোয়ালন্দ আইডিয়াল হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ফকীর আব্দুল কাদের বলেন, স্কুল পরিচালনা কমিটি সভাপতি পদত্যাগ করেছেন সেই পত্রটি শিক্ষাবোর্ডে গৃহীত হয়েছে কিনা সে বিষয়ে আমি এখনো স্পষ্ট নই। এই মর্মে শিক্ষাবোর্ড থেকে আমি লিখিত কোন পত্র পাইনি। যে কারণে আমি শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার বিলে সই করতে পারছিনা। তবে এ বিষয়ে শিক্ষাবোর্ডের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলেছি দ্রুত এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
এ প্রসঙ্গে গোয়ালন্দ আইডিয়াল হাই স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ফকীর আব্দুল জব্বার বলেন, স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন-ভাতার বিষয় নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষকের সাথে আমার কথা হয়েছে ও ঢাকায় আছে, সেখান থেকে আসলেই এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে এবং শিক্ষক-কর্মচারীরা তাদের বেতন ভাতা পাবে।
এ প্রসঙ্গে গোয়ালন্দ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান বলেন, শিক্ষক-কর্মচারীরা ৫ মাস ধরে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না বিষয়টা খুবই দুঃখ জনক। এ অভিযোগের ভিত্তিতে গোয়ালন্দ উজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমাকেসহ দুই সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি করে দিয়েছেন। স্কুলের প্রধান শিক্ষক ঢাকায় আছেন উনি আসলে তদন্ত করে রিপোর্ট জমা দেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন বলেন, শিক্ষকরা অভিযোগ করার পরেই আমি দুই সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছি। তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহন করা হবে।
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২২/১১/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
