নতুন কারিকুলাম কি আদৌ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রাণবন্ত হচ্ছে?

সামিউল ইসলামঃ অনেক ঢাক-ঢোল পিটিয়ে বছরের শুরু থেকেই শুরু হলো নতুন কারিকুলাম। জানুয়ারিতেই অধিকাংশ শিক্ষকদের প্রশিক্ষণও দেওয়া হলো। আবার অনেক শিক্ষক এখনো প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছে। তাদের তালিকা অনেক আগেই সংগ্রহ করা হলেও এখনো প্রশিক্ষণের খবর নাই। তারা তাদের মতো করে প্রচলিত নিয়মেই ক্লাস নিচ্ছেন।  বছরের ৪ মাস অতিবাহিত হয়েছে অথচ এখনো প্রশিক্ষণ পায়নি। কবে প্রশিক্ষণ পাবে সেটা এখনো নিশ্চিত হয়নি। এছাড়াও দেশে হাজার হাজার কিন্ডার গার্টেন স্কুল রয়েছে যারা ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা  পরিচালনা করছেন। এসব স্কুলের শিক্ষার্থীদের অন্য স্কুলের নামে ভর্তি দেখানো হয়। এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরাও নতুন কারিকুলামের কোনো প্রশিক্ষণ পায়নি। যারফলে তারা অনেকটাই প্রচলিত নিয়মে ক্লাস নিচ্ছে।

বিষয় ভিত্তিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা শিক্ষকদের অনেকেই ৬ষ্ঠ ও ৭ম শ্রেণির বিষয়ভিত্তিক ক্লাস নিচ্ছেন না। অর্থাৎ এক বিষয়ের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে অন্য বিষয়ের ক্লাস নিচ্ছেন। যেমন- বাংলার শিক্ষক ইংরেজি ক্লাস, সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষক বাংলা ক্লাস, বিজ্ঞানের শিক্ষক গনিত ক্লাস, ধর্মীয় শিক্ষক শিল্প সংস্কৃতির ক্লাস, ল্যব অপারেটর ডিজিটাল টেকনোলজির ক্লাস। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাস্তব চিত্র এটি। মানা হচ্ছে না নতুন কারিকুলামের জন্য নির্ধারিত রুটিন। সবকিছুতেই যেন হ-য-ব-র-ল অবস্থা।

নতুন কারিকুলামে বলা হয়েছে আনন্দঘন পরিবেশে শিক্ষার্থীরা শিখবে। কিন্তু ক্লাসের চিত্র এর উল্টোটা। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই ৬ষ্ঠ-৭ম শ্রেণির একেক শাখায় শিক্ষার্থী সংখ্যা শতাধিক। এতো অধিক শিক্ষার্থীদের নিয়ে একেকটা ক্লাসে (৪০ মিনিট) দল গঠন করে সঠিকভাবে দলগত/জোড়ায় কাজ উপস্থাপন করা সম্ভব হয়না।

 সবচেয়ে বড় জটিলতা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত স্কুলে আনা যাচ্ছে না। তারা আগের মতোই বিভিন্ন প্রাইভেট-কোচিংয়ে জড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের আগের দিন দল গঠন করে দিলে দেখা যায় পরের দিন ওই দলের অনেকেই স্কুলে আসেনি। প্রতিদিনই দল গঠন করতে হচ্ছে। সবল-দূর্বল শিক্ষার্থী চিহৃিত করে তাদের সংমিশ্রনে প্রতিদিন দল গঠন করতে গিয়ে অনেক সময় ব্যয় হয়। সবল-দূর্বল শিক্ষার্থীদের সংমিশ্রন না করলে ক্লাস ফলপ্রসু হয়না।  যেসকল শিক্ষার্থী নিয়মিত স্কুলে আসেনা তারা নিয়মিত আসা শিক্ষার্থীদের মতো প্রতিটি অধ্যায় সমানভাবে শেষ করতে পারছে না। তাদের মধ্যে অনেক গ্যাপ থাকছেই। বিশেষ করে যারা দূর্বল তারা নিয়মিত স্কুলে না আসলে তাদের জন্য বেশি সমস্যার সৃষ্টি হবে।  নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত স্কুলে উপস্থিতির জন্য রেডিও, টেলিভিশন, পত্র-পত্রিকায় প্রচারনার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রত্যেক স্কুলে অভিভাবক সমাবেশ করে নতুন কারিকুলাম সম্পর্কে অভিভাবকদের সুস্পষ্ট ধারণা দিতে হবে। নতুবা উপস্থিতি বাড়বে না।

 বলা হয়েছে নতুন কারিকুলামে প্রাইভেট-কোচিং, নোট-গাইড কিছুই চলবে না। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। প্রাইভেট-কোচিং, নোট-গাইড আগের মতোই চলছে। প্রায় প্রত্যেক কোচিংয়েই শিক্ষার্থীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ৬ষ্ঠ-৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের প্রচলিত কোন পরীক্ষা নেওয়া যাবে না বলে মাউশি থেকে কিছুদিন পূর্বে একটি পরিপত্র জারি করা হয়েছে। তা কি কোনো কোচিং সেন্টার আমলে নিচ্ছে? মোটেও না। তারা প্রতি সপ্তাহেই প্রচলিত পরীক্ষা নিচ্ছে। এমনকি কোন কোন স্কুলে পরীক্ষার ফি নিয়ে সাপ্তাহিক পরীক্ষাও নিচ্ছে!

মূল্যায়নের বিষয়ে সুস্পষ্ট কোন ধারণা দেওয়া হয়নি। ৪ মাস অতিবাহিত হয়েছে অথচ শিক্ষকরা এখনো শিখনকালীন মূল্যায়ন নিতে পাচ্ছে না। আর ক’দিন পরই জুন মাস আসবে। তখন ১ম সামষ্টিক মূল্যায়ন নেওয়ার কথা। অথচ শিখনকালীন ও সামষ্টিক মূল্যায়নের বিষয়টি কর্তৃপক্ষ এখনো পরিষ্কার করছে না।যারফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন।

নতুন কারিকুলামের বই নিয়ে বছরের শুরু থেকেই বিতর্ক শুরু হয়েছে। প্রায় প্রতিটি বইয়েই তথ্যগত ভুল, ছাপার ভুলসহ অনেক ভুল পরিলক্ষিত হচ্ছে। যারফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা হতাশ। ভুলে ভরা এসব বই পড়াতে যেয়ে শিক্ষকরা যেমন বিভ্রান্তিতে পরছেন, তেমনি শিক্ষার্থী-অভিভাবকরাও বিভ্রান্তিতে পরছেন। বলা হচ্ছে খুব শীঘ্রই বইয়ের সংশোধনী শিক্ষার্থীদের হাতে দেওয়া হবে। খুব শীঘ্রই যে কবে হবে সেটা এখনো বলা যাচ্ছে না।

এই কারিকুলাম বাস্তবায়নে যারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন তারা হচ্ছেন শিক্ষক। স্কুল শিক্ষকদের অধিকাংশেরই নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা। তারা সরকার থেকে যে পরিমান মাসিক অনুদান পান, তা দিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। একজন শিক্ষক শুরুতেই ১২৫০০ টাকা বেতন পান। তার মধ্য থেকে আবার ১০% অবসর ও কল্যান তহবিলের জন্য কর্তন করা হয়। বাড়ি ভাড়া বাবদ পান ১০০০ ( এক হাজার) টাকা যা পাবলিকলি বলতেও লজ্জা হচ্ছে। এক হাজার টাকায় ফ্ল্যাট বাসা তো দূরের কথা  ঢাকা শহরে বস্তিতেও থাকা যায় না। চিকিৎসা ভাতার নামে ৫০০ (পাঁচশত) টাকা দেওয়া হয়। যা দিয়ে একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার তো দূরের কথা একজন ভালো পল্লী চিকৎসকও দেখানো কষ্টকর। অন্য দিকে একই বই পড়িয়ে সরকারি স্কুলের শিক্ষকরা প্রায় দ্বিগুণ সুবিধা ভোগ করছেন। এই অবস্থায় বেসরকারি শিক্ষকদের মাঝে এক প্রকার চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। প্রায় দু’মাস ধরে বেসরকারি শিক্ষকরা জাতীয়করণের দাবিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান করছেন। তাদের শান্তনা দেওয়ার জন্য শিক্ষা প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের কেউ তাদের কাছে আসেনি। যা দুঃখজনক। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও শিক্ষকদের বেতন বাংলাদেশের শিক্ষকদের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। আর কোনো দেশে শিক্ষকদের এতো দৈন্যদশা আছে কিনা আমার জানা নেই।

পরিশেষে বলতে চাই, নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নে সরকারের পাশাপাশি শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের এগিয়ে আসতে হবে। নতুবা সম্ভব নয়। এজন্য জনসচেতনতা প্রয়োজন।

লেখকঃ সহকারী শিক্ষকহা, লিমুন্নেছা চৌধুরাণী মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ভালুকা, ময়মনসিংহ।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.