এবার জনপ্রতি ফিতরার সর্বনিম্ন পরিমাণ ১১৫ টাকা, সর্বোচ্চ ২ হাজার ৬৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সাধারণত দেখা যায়- সমাজের উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত- সবাই গতানুগতিক নির্ধারিত পরিমাণেই বিশেষ করে সর্বনিম্ন পমিাণে ফিতরা আদায় করে দায়সারার চেষ্টা করেন। অথচ বিষয়টি এমন নয়। হজরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নবী (সা.)-এর জমানায় আমরা সদকাতুল ফিতর দিতাম এক সা (সাড়ে তিন কেজি প্রায়) খাদ্যবস্তু। তিনি বলেন, তখন আমাদের খাদ্য ছিল- যব, কিশমিশ, পনির ও খেজুর’ (বুখারি : ১/২০৪)। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সদকাতুল ফিতর আদায় করতাম এক সা খাদ্যবস্তু, যেমন- এক সা যব, এক সা খেজুর, এক সা পনির, এক সা কিশমিশ।’ (বোখারি : ১/২০৫)
হাদিস দুটি থেকে বোঝা যায়, খাদ্যবস্তু তথা আটা, খেজুর, কিশমিশ, পনির ও যব ইত্যাদি পণ্যগুলোর যেকোনো একটির মাধ্যমে ফিতরা প্রদান করা যায়। খেজুর, কিশমিশ, পনির ইত্যাদির ক্ষেত্রে পরিমাণ হবে এক সা তথা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম। আটার ক্ষেত্রে পরিমাণ হবে অর্ধ সা বা ১ কেজি ছয়শ ৫০ গ্রাম। এই পণ্যগুলোর আবার বাজারমূল্য এক নয়। গম বা আটা দ্বারা ফিতরা আদায় করলে অর্ধ সা অথবা ১ কেজি ৬শ ৫০ গ্রাম বা এর বাজারমূল্য ১১৫ (একশ পনেরো) টাকা প্রদান করতে হবে। যব দ্বারা আদায় করলে এক সা অথবা ৩ কেজি ৩শ গ্রাম বা এর বাজারমূল্য ৩৯৬ (তিনশ ছিয়ানব্বই) টাকা, কিশমিশ দ্বারা আদায় করলে এক সা অথবা ৩ কেজি ৩শ গ্রাম বা এর বাজারমূল্য ১ হাজার ৬৫০ (১ হাজার ৬শ পঞ্চাশ) টাকা, খেজুর দ্বারা আদায় করলে এক সা অথবা ৩ কেজি ৩শ গ্রাম বা এর বাজারমূল্য ১ হাজার ৯৮০ (১ হাজার ৯শ আশি) টাকা ও পনির দ্বারা আদায় করলে এক সা অথবা ৩ কেজি ৩শ গ্রাম বা এর বাজারমূল্য ২ হাজার ৬৪০ (২ হাজার ৬শ চল্লিশ) টাকা ফিতরা প্রদান করতে হবে। এর অর্থ দাঁড়ায় পণ্য হিসাবে টাকার পরিমাণ দ্বিগুণ, তিনগুণ বা তার চেয়েও বেশি হবে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো- আমাদের সমাজের উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত সবাই নিজের ফিতরা প্রদানে সর্বনিম্ন মূল্যের আটাকে বেছে নেন। এতে ফিতরা হয়তো আদায় হয়ে যাবে কিন্তু যে অর্থে ফিতরা দেওয়া হয়- তথা গরিবদের ঈদকে আনন্দময় করা- সেটি কি অর্জন হবে? ১১৫ টাকার মাধ্যমে একজন গরিব কি স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে পারবেন এই দুর্মূল্যের বাজারে? তা হলে ধনীরাও কেন ফিতরা আদায়ে চাল-আটাকে বেছে নিচ্ছি। আমরা যারা অঢেল সম্পদের মালিক, নিজেদের ঈদ উদযাপনে যারা হাজার হাজার (কখনো লাখ) টাকা ভাঙতে কার্পণ্য করি না- আমরা কেন খেজুর, পনির, কিশমিশ ইত্যাদির হিসাবে একটু বেশি ফিতরা দিচ্ছি না? কেন আমরা দায়সারা ফিতরা আদায়েই ক্ষ্যান্ত থাকছি? অথচ আলেমগণ বলেছেন অধিক মূল্যের দ্রব্য দ্বারা ফিতরা আদায়ের কথা।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে অধিক মূল্যের দ্রব্য দ্বারা ফিতরা আদায় করা উত্তম; অর্থাৎ যা দ্বারা আদায় করলে গরিবদের বেশি উপকার হয় সেটাই উত্তম ফিতরা। ইমাম মালিক (রহ.)-এর মতে খেজুর দ্বারা ফিতরা আদায় করা উত্তম এবং খেজুরের মধ্যে সবচেয়ে উন্নত ‘আজওয়া’ খেজুর দ্বারাই আদায় করা উত্তম। ইমাম শাফি (রহ.)-এর মতে হাদিসে উল্লিখিত বস্তুগুলোর মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট ও সর্বোচ্চ মূল্যের দ্রব্য দ্বারা সদকা আদায় করা শ্রেয়। অন্যসব ইমামের মতও অনুরূপ। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর মতে সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর অনুসরণ হিসেবে খেজুর দ্বারা ফিতরা আদায় করা উত্তম। এ ছাড়াও সদকার ক্ষেত্রে সব ফকিহের ঐকমত্য হলো- ‘যা গরিবদের জন্য বেশি উপকারী’ (আওজাযুল মাসালিক শরহে মুআত্তা মালিক : ৬/১২৮)। আল্লাহ সবাইকে সঠিক বোঝার ও উত্তমরূপে আমল করার তওফিক দিন।
(লেখক : আলেম ও প্রাবন্ধিক)
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১৯/০৪/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
