চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে, পুলিশের উপস্থিতিতে সেই শিক্ষকের বাড়িতে হামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক, কুষ্টিয়াঃ জেলার কুমারখালীতে স্কুল ছাত্রীদের বোরকা পড়তে নিষেধ করা,  ইসলাম ধর্ম ও রাসুলুল্লাহ(সা:)কে কথিত কটুক্তির অভিযোগে দুইদিন আগেই গ্রেফতার হওয়া স্কুল শিক্ষক আবু সালেহের বাড়িতে জুমার নামাজের পর পুলিশের উপস্থিতিতে এবং স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে মাদ্রাসা মাঠে সমাবেশ করে হামলা ও ভাংচুরের অভিযোগ উঠেছে।

শুক্রবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) জুমার নামাজের পর উপজেলার কয়া ইউনিয়নের ‘ঘোড়াই দারুল উলুম হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার মাঠে বিক্ষোভ সমাবেশ শেষে ইসলামী আন্দোলনের ব্যানারে মূলত: জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা এ হামলায় চালিয়েছে বলে ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ।

উল্লেখ্য কুমারখালী উপজেলার কয়া চাইল্ড হ্যাভেন নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু সালেহের বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে গত ২২ জানুয়ারি কুমারখালী থানায় মামলা করেন ইসলামী আন্দোলন কুষ্টিয়া জেলা শাখার সহ সভাপতি এনামুল হক। ওই মামলার এজাহার নামীয় অভিযুক্ত স্কুল শিক্ষক আবু সালেহকে দুইদিন আগেই গ্রেফতার করে আদালতে সৌপর্দ করেছে পুলিশ। আদালত তার জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে প্রেরণ করেন।

আরও পড়ুনঃ ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত: গ্রেপ্তার প্রধান শিক্ষক, বাস্তবে যা ঘটেছিল

যদিও ওই স্কুলের সকল শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও পরিবারের দাবি, ‘জামায়াতে ইসলামীর মহিলা শাখার সদস্য হতে না চাওয়া এবং স্কুলে মাহফিল করতে না দেয়ায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কুষ্টিয়া জেলার সহ সভাপতি এনামুল হক ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলা করেছে।’

তারা জানিয়েছেন, ‘প্রধান শিক্ষক আবু সালেহ মেয়েদের বোরখা পড়তে নিষেধ করেননি, উনি বলেছেন রংবেরংয়ের বোরখা না পরে যারা বোরখা পরে স্কুলে আসতে চাও তারা স্কুলড্রেসের সঙ্গে ম্যাচিং করে বোরখা পরবা। যেসব মেয়েরা সরকার থেকে সাইকেল পেয়েছে তারা সাইকেলে চড়ে স্কুলে আসতে হবে। একটি চক্র সেই কথা বিকৃতভাবে প্রচার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করে ক্ষেপিয়ে তুলছে ‘

বিদ্যালয়ের মানেজিং কমিটির সদস্য আবুল কাশেম জানান, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি এমপিওভুক্ত হয়েছে। ওই বিদ্যালয়ে বেশ কিছু পদে লোক নিয়োগ দেওয়া হবে। কয়েকদিন আগে স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে বিদ্যালয়ে এসেছিলেন। ওই জনপ্রতিনিধি কর্তৃপক্ষকে তার পছন্দের লোক নিতে চাপাচাপি করে। কিন্তু প্রধান শিক্ষকসহ অন্যরা সে প্রস্তাবে রাজি হননি। এর জের ধরে প্রধান শিক্ষককে ইসলাম অবমাননার কথিত অভিযোগ তুলে তাকে ফাঁসানো হচ্ছে।’

আরও পড়ুনঃ ছাত্রীদের হিজাব পরতে বারণ করায় প্রধান শিক্ষক গ্রেফতার

শিক্ষক আবু সালেহর স্ত্রী নিলুফার ইয়াসমিন লিলির অভিযোগ, ‘আমার স্বামীর স্কুলটা দীর্ঘদিন পর গত জানুয়ারিতে এমপিওভুক্ত হওয়ায় জামায়াতে ইসলামীর লোকজন দখলে নেয়ার জন্যই এভাবে ফাঁসিয়েছে। আমার বাড়িতে হামলা ও ভাংচুরের সাথে জামায়াতের নেতাকর্মীরা ছাড়াও প্রভাবশালী লোকজনের যোগসাজস আছে।’

শিক্ষকের ছেলে নিখিল(২৫) বলেন, ‘স্থানীয় কিছু কুচক্রী প্রভাবশালীর মদদে জামায়াতের লোকজন পূর্ব পরিকল্পিতভাবে সমাবেশ করে বাড়িতে হামলা করেছে। আমি এর বিচার চাই’।

এদিকে ওই শিক্ষকের শাস্তি দাবি করে শুক্রবার জুমার নামাজের পর কয়া ইউনিয়ন ইসলামী আন্দোলন ও ওলামা মাসায়েখ আইম্মা পরিষদের আয়েজনে ঘোড়াই দারুল উলূম হাফেজিয়া ও এতিমখানা চত্বরে সমাবেশ করে। এতে কয়া ওলামা মাসায়েক আইম্মা পরিষদের সভাপতি মুফতি আব্দুস সালাম সভাপতিত্ব করেন। তারা ওই শিক্ষকের ফাঁসির দাবি জানান। দাবি না মানলে দেশব্যাপী আরও কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা দেয়ার হুমকি দেয়। পরে সমাবেশ শেষে ওই শিক্ষককের বাড়িতে হামলা চালায় উচৃঙ্খল কর্মীরা। এই সমাবেশস্থলে স্থানীয় ইউপি চেয়াম্যান মো: আলী এবং কুমারখালী থানার অফিসার ইনচার্জ উপস্থিত ছিলেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি।

কুমারখালী থানার ওসি মো. মোহসীন হোসাইন হামলার ঘটনাটির সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘আমি নিজে ওই সমাবেশে উপস্থিত ছিলাম। ওরা পুলিশকে না জানিয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে, আমার কাছে গোপন সংবাদ ছিলো বলেই আমি জুম্মার নামাজ পড়েই সমাবেশে গিয়েছিলাম। তবে সমাবেশের লোকজন ওই শিক্ষকের বাড়িতে হামলা করেনি, অবশ্য তিনজন হুজুরের নেতৃত্বে কিছু উচ্ছৃঙ্খল ছেলেরা এই হামলা করেছে। ঢিল ছুড়ে জানালার কাঁচ ভাংছে, আমি তাদের অভিযোগ দিতে বলেছি’। অভিযোগ পেলে পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা নেবে বলে জানায় ওই পুলিশ কর্মকর্তা।

তবে এবিষয়ে কথা বলার জন্য স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মো: আলির সাথে মুঠোফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। কল রিসিভের অনুরোধ জানিয়ে খুদে বার্তা দিয়েও তার সাথে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২৫/০২/২৩ 

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.