নিজস্ব প্রতিবেদক।।
পাঁচ দশকের সাহিত্যিক জীবন সালমান রুশদির। তার দ্বিতীয় উপন্যাস মিডনাইটস চিলড্রেন লিখে সর্বকালের অন্যতম সফল ব্রিটিশ লেখকদের একজন হয়ে উঠেছিলেন রুশদি। জিতেছেন বুকার পুরস্কার। তবে ১৯৮৮ সালে চতুর্থ উপন্যাস দ্য স্যাটানিক ভার্সেস প্রকাশের পর প্রচণ্ড বিতর্কের মুখে পড়েন তিনি। একের পর এক হত্যার হুমকিতে লুকিয়ে থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন ৭৫ বছর বয়সী এই লেখক।
পরাবাস্তববাদী উত্তরাধুনিক এই বইটি নিয়ে মুসলিম অনেকের মধ্যে সৃষ্টি হয় তীব্র ক্ষোভের। বইটিতে ধর্ম অবমাননা করা হয়েছে বলে মনে করে অনেকেই। বইটির পর ওপর খড়গ নেমে আসে সালমানের নিজের জন্মভূমি ভারতেই। ভারতই প্রথম এই বইটি নিষিদ্ধ করে। পরে পাকিস্তানসহ অন্য বেশ কিছু মুসলিম দেশ এবং দক্ষিণ আফ্রিকাও একই পদক্ষেপ নেয়।
১৯৮৮ সালের অক্টোবরের মধ্যেই লাগাতার মৃত্যুর হুমকি পেয়ে দেহরক্ষী নিয়োগ দেন রুশদি। সব ভ্রমণ বাতিল করে নিজেকে অবরুদ্ধ করে রাখেন।
ওই বছরের ডিসেম্বরে হাজার হাজার মুসলিম গ্রেটার ম্যানচেস্টারের বোল্টনে বিক্ষোভ করে দ্য স্যাটানিক ভার্সেসের অনেকগুলো কপি পুড়িয়ে দেয়। বইটি নিয়ে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের মার্কিন কালচারাল সেন্টারে উত্তেজিত জনতা হামলা চালালে ছয়জন নিহত হয়। বিক্ষোভ হয় শ্রীনগর ও কাশ্মিরেও। ১৯৮৯ সালে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনি রুশদির মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে ফতোয়া জারি করেন।
ভারতই প্রথম রুশদির এই বই নিষিদ্ধ করে। পাকিস্তানেও বইটি নিষিদ্ধ করা হয়। পরে দক্ষিণ আফ্রিকাসহ মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য দেশই সালমান রুশদির ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’ নিষিদ্ধ করে। উপন্যাসটি অনেক মহলে প্রশংসিত হয় এবং এটির জন্য হুইটব্রেড পুরস্কার পান তিনি। কিন্তু বইটির বিরুদ্ধে মুসলিমদের প্রতিক্রিয়া বৃদ্ধি পায় এবং দুই মাস পরে এই প্রতিক্রিয়া রাস্তায় বিক্ষোভে রূপ নেয়।
মুসলমানদের কেউ কেউ সালমান রুশদির এই উপন্যাসকে ইসলামের জন্য অবমাননাকর বলে মনে করেন। তারা এই বইয়ের দুটি নারী চরিত্র নিয়ে তীব্র আপত্তি তোলেন। ওই দুই চরিত্রে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর দুজন স্ত্রীকেও জড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
জানা গেছে, সালমান রুশদি ভারতের স্বাধীনতার দুই মাস আগে বোম্বেতে (বর্তমান মুম্বাই) জন্মগ্রহণ করেন। ১৪ বছর বয়সে তাকে ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়। তখন ভর্তি হয়েছিলেন রাগবি স্কুলে। পরে ইতিহাসে অনার্স ডিগ্রি নেন ক্যামব্রিজের মর্যাদাপূর্ণ কিংস কলেজ থেকে।
ব্রিটেনের নাগরিকত্ব পান রুশদি। পরে ইসলাম ধর্ম বিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। উপন্যাস লেখার সময় কিছুদিনের জন্য অভিনয়ও করেন। তারপর বিজ্ঞাপনের কপিরাইটার হিসেবে কাজ করেন তিনি। তার প্রথম প্রকাশিত বই ‘গ্রিমাস’ তেমন সফল হয়নি। তবে গ্রিমার্সের সুবাদে সাহিত্যের কিছু সমালোচক তাকে ‘সম্ভাবনাময় লেখক’ হিসাবে দেখতে শুরু করেন।
ব্যক্তিগত জীবনে রুশদি চারবার বিয়ে করেছেন এবং তার দুই সন্তান রয়েছে। ব্রিটিশ নাগরিক হলেও তিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য ২০০৭ সালে ব্রিটিশ রানি তাকে ‘নাইট’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
এই বইয়ের জন্য কেবল লেখক হুমকি পাননি। ১৯৯১ সালের জুলাইয়ে টোকিওর উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’র জাপানি অনুবাদক খুন হন। সেই সময় পুলিশ জানায়, অনুবাদক হিতোশি ইগারাশি আপেক্ষিক সংস্কৃতির সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কাজ করতেন। তাকে বেশ কয়েকবার ছুরিকাঘাত এবং সুকুবা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার অফিসের বাইরে ফেলে রাখা হয়। তার খুনিকে এখন পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি।
একই মাসের শুরুতে বইটির ইতালীয় অনুবাদক ইত্তোরে ক্যাপ্রিওলোকে মিলানে নিজ অ্যাপার্টমেন্টে ছুরিকাঘাত করা হয়। যদিও তিনি সেই হামলায় প্রাণে বেঁচে গেছেন। বইটির নরওয়েজীয় অনুবাদক উইলিয়াম নাইগার্ডকে ১৯৯৩ সালে অসলোতে তার বাড়ির বাইরে গুলি করা হয়; তিনিও বেঁচে যান।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
