শিক্ষক লাঞ্ছনা অপ্রত্যাশিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত

সমাজে শিক্ষকরা হইলেন সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। তাহারা হইলেন মানুষ গড়িবার কারিগর। কবি কাজী কাদের নেওয়াজ ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ নামক কবিতাটিতে শিক্ষকের মর্যাদার উপর আলোকপাত করিতে গিয়া দিল্লির বাদশাহ আলমগীর এবং তাহার পুত্রের উদাহরণ টানিয়াছিলেন। শিক্ষকের পা ধুইয়া না দিয়া শুধু পানি ঢালিয়া শাহজাদা যে বেয়াদবি করিয়াছিলেন, তাহার জন্য বাদশাহ নিজের ছেলের পক্ষ হইতে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এইভাবে বাদশাহ আলমগীর শিক্ষকের এক অনন্য মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করিয়া গিয়াছেন। কিন্তু হাল আমলে আমরা যাহা লক্ষ করিতেছি তাহাতে বিস্মিত না হইয়া পারি না। শিক্ষকের সহিত হররোজ বেয়াদবি করা তো আছেই, এমনকি আজকাল তাহাদের গায়ে হাত তুলিবারও ঘটনা ঘটিতেছে অহরহ। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, এই ধরনের ঘটনা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। যাহারা এই ধরনের অপরাধ করেন, তাহারাও নিশ্চয়ই কোনো না কোনো শিক্ষকের নিকট হইতে লেখাপড়া করিয়াছেন, কিন্তু তাহারা প্রকৃত মানুষ হওয়ার শিক্ষাটা পাইয়াছেন কি না তাহাতে ঘোরতর সন্দেহ রহিয়াছে।

গতকাল ইত্তেফাকের খবরে বলা হইয়াছে, কুষ্টিয়া শহরের লাহিনী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলামকে এক ওয়ার্ড কাউন্সিলর বেধড়ক মারধর করিয়াছেন। তাহাকে লাঞ্ছিত করিয়াছেন নানাভাবে। তাহার অনুমতি না নিয়া একদল দুর্বৃত্তসহ তাহার অফিসরুমে ঢুকিয়া তাহাকে এলোপাতাড়ি মারধর করিলে উক্ত শিক্ষক মারাত্মকভাবে আহত হন এবং তাহাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সন্ত্রাসীরা তাহার অফিসের ফাইলপত্র তছনছ করে। ভাঙচুর করে আসবাবপত্রও। এই নির্মম ঘটনার প্রেক্ষাপটে ঐ বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ ও ছাত্রছাত্রীরা কুষ্টিয়া-রাজবাড়ী আঞ্চলিক মহাসড়ক অবরোধ করিয়া বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। একটি সড়কের মেরামতকাজের জন্য স্কুলের পানি-বিদ্যুৎ ব্যবহারসহ খেলার মাঠে ইট-বালু ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী রাখিবার জন্য প্রধান শিক্ষক অনুমতি না দেওয়ায় আকস্মিকভাবে তাহার উপর এই হামলা চালানো হয়। একজন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এইভাবে একজন স্কুলের প্রধান শিক্ষকের উপর চড়াও হইতে বা হামলা চালাইতে পারেন না।

স্কুল কর্তৃপক্ষ অনুমতি না দিলে তাহার বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত ছিল। তাহা ছাড়া স্কুলের খেলার মাঠ শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা করিবার জন্য। সেখানে নির্মাণসামগ্রী কেন রাখা হইবে? যেখানে স্কুলে শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো খেলাধুলা করিতে পারিতেছে কি না তাহা একজন জনপ্রতিনিধির নিশ্চিত করিবার কথা, সেখানে তিনি বা তাহার সাঙ্গোপাঙ্গরা কোনোরূপ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করিতে পারেন না। স্থানীয় প্রশাসনের উচিত, বিষয়টি তদন্ত করিয়া যথাবিহিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

শিক্ষকের গায়ে হাত তোলা এবং তাহাদের লাঞ্ছিত ও অপমানিত করা একটি গর্হিত ও ক্ষমার অযোগ্য কাজ। শিক্ষার্থীদের উপর ইহার নেতিবাচক প্রভাব পড়িয়া থাকে। কেননা একজন শিক্ষক হইলেন শিক্ষার্থীদের নিকট আদর্শস্বরূপ। শিক্ষকদের নিকট হইতে শিক্ষার্থীরা যেমন ভালো কিছু শিখিয়া থাকে, তেমনি তাহারা তাহাদের দেখিয়া ভালো কাজের অনুপ্রেরণাও পাইয়া থাকে। এই জন্য যে সমাজে শিক্ষকদের অবহেলা ও অপমান করা হয়, সেই সমাজ অন্ধকারাচ্ছন্ন হইতে খুব বেশি সময় লাগিবে না। বিষয়টির তাৎপর্য উপলব্ধি করিয়া শিক্ষক লাঞ্ছনাকারীদের এমন শাস্তি প্রদান করা উচিত যাহাতে পরবর্তীকালে কেহ শিক্ষকদের গায়ে হাত তুলিবার দুঃসাহস না পায়। মনে রাখিতে হইবে, শিক্ষকদের জীবনাদর্শ অনুসরণে একজন শিক্ষার্থী তাহার ব্যক্তিগত ও কর্মময় জীবনকে মুখরিত করিয়া তোলেন। একজন প্রাজ্ঞ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন শিক্ষক সমাজবদলেও পালন করেন বিশেষ ভূমিকা। এই জন্য ইসলাম ধর্মে শিক্ষকদের সকল সময় সম্মান করিবার কথা বলা হইয়াছে। অতএব, কুষ্টিয়া শহরের এই ঘটনাটি একেবারেই অপ্রত্যাশিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত। ইহার ন্যায়বিচার হওয়া একান্ত কাম্য। এই সংক্রান্ত মামলাটিও দ্রুত নিষ্পত্তি হইবে বলিয়া আমরা আশা করি।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.