ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের বিবর্তন

রিফাত মুনীর ইতি।।

দিল্লির বাদশাহ আলমগীর একদিন লক্ষ্য করলেন, তার প্রিয় পুত্র গৃহশিক্ষকের পায়ে অজুর পানি ঢেলে দিচ্ছে। বাদশাহ তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালেন না। শিক্ষক সে ব্যাপারটি খেয়াল করে ভাবলেন, বাদশাহর ছেলেকে দিয়ে এমন কাজ করানো ঠিক হয়নি। যথাসময়ে দরবারে শিক্ষকের ডাক পড়ল। কিছুটা ভীত, কম্পিত হৃদয়ে শিক্ষক উপস্থিত হলেন। কিন্তু তিনি যা শুনলেন, তাতে শুধু বিস্মিতই হলেন না, বরং বাদশাহর প্রতি তার শ্রদ্ধা দাঁড়াল বহুগুণ। কারণ বাদশাহ তার ক্ষোভ প্রকাশ করলেন এই বলে, শিক্ষক তার সন্তানকে যথাযথ শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। কারণ পিতৃতুল্য শিক্ষককে শুধু পানি ঢেলে দেওয়া নয়, যুবরাজের উচিত ছিল নিজ হাত দিয়ে শিক্ষকের পা যথাযথভাবে ধুয়ে দেওয়া! নিঃসন্দেহে এ ঘটনা শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর এক অকৃত্রিম শিক্ষার উদাহরণ।

শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা মিশ্রিত ভক্তির বিষয়টি আজও লক্ষ্য করি সমাজের প্রতিষ্ঠিত কিছু ব্যক্তির আচরণে। গাঁয়ের এক সময়কার পাঠশালায় শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত প্রবীণ কিংবা অশীতিপর বৃদ্ধকে পা ছুঁয়ে সালাম করার রীতি লক্ষ্য করি আমরা। শিক্ষকদের অনেকেই আবেগে জড়িয়ে ধরেন তাদের প্রিয় ছাত্রদের। গর্ব ও ভালোবাসায় তাদের দু’চোখ ভরে ওঠে আনন্দ অশ্রুতে।

শারীরিক ও মানসিক শাস্তি তুলে দেওয়ার পর বর্তমানে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে যে ‘তথাকথিত’ বন্ধুত্বসুলভ আচরণ লক্ষণীয়, তাতে মানসিক দূরত্ব হ্রাসের বিষয়টি যথেষ্ট পরিমাণে প্রশ্নবিদ্ধ, বরং শিক্ষকদের প্রতি ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থের অভিযোগ এসেছে এবং তা চলমান। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের একটা বড় অংশজুড়ে আছে শিক্ষকদের প্রতি সততা ও নৈতিকতার প্রশ্নে ভঙ্গুর অবস্থানের দায়। অন্যদিকে, তথাকথিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরির নামে শিক্ষক-ছাত্রের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ ভিডিও ও অন্যান্য ডকুমেন্ট আদান-প্রদানের এই যুগেও কিন্তু ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক ততটা হার্দিক হয়নি, যতটা ভাবা হচ্ছিল। বরং নানা কারণে এটি আরও জটিল হয়েছে।

একজন শিক্ষক শুধু অভিভাবক নন, সঠিক পথের নির্দেশ দানকারীও। শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব নেবেন, এটাই কাম্য। শুধু লেখাপড়া বা জ্ঞান অর্জন একজন শিক্ষার্থীর যেমন মূল লক্ষ্য নয়, তেমনি একজন শিক্ষকও তথাকথিত তাত্ত্বিক ভাষণ প্রদান করে নিজের দায়িত্ব শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে পারেন না। অন্যদিকে, শিক্ষক হওয়ার আগে আমরা মানুষ। অতএব, মানবিক গুণাবলির বিকাশ সাধন করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সমাজে এটি ছড়িয়ে দেওয়া আমাদের কর্তব্য। একজন ছাত্রের বাহ্যিক আচরণ পরিবর্তনের পাশাপাশি তার মনোজাগতিক পরিবর্তনে শিক্ষক বড় ভূমিকা রাখেন। পরিবারে বাবা-মাকে যেমন চরম ধৈর্য, সহনশীলতা ও উপস্থিত বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে হয়; শিক্ষক হিসেবেও ঠিক তাই।

অতি সম্প্রতি রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের অবনতি এটিই আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। একজন শিক্ষার্থীর বয়স ও মানসিকতার প্রতি নজর রাখা ও সম্মান প্রদর্শন যেমন প্রয়োজন, তেমনি কোনোভাবেই শিক্ষকের ভাবমূর্তি যাতে ক্ষুণ্ণ না হয়, সেদিকেও দৃষ্টি রাখা দরকার। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে এ ধরনের নাজুক বিষয় তদারকিতে আরও যত্নবান হওয়া উচিত।

পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের অভাব বিগত কয়েক দশকে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে শুধু ফাটল ধরায়নি; চরম অবনতির দিকেও নিয়ে গেছে। এ জন্য প্রশাসনের উদ্যোগের পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রসারতা দরকার। যৌক্তিক আন্দোলন ও দাবি আদায়ের চেষ্টাকে স্বাগত জানানো যেমন আমাদের দায়িত্ম; তেমনি এই অসন্তোষ যেন শিক্ষার পরিবেশকে দূষিত না করে, সেদিকেও খেয়াল রাখা দরকার। আমাদের উচিত সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে সঙ্গে আত্মিক পরিবর্তনে প্রস্তুত থাকা, একই সঙ্গে সহজভাবে সত্যকে মেনে নেওয়ার সাহস রাখা। এটিই বর্তমান সময়ে সম্ভবত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

শিক্ষক ও কলাম লেখক


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.