অলোক আচার্য।
করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে শিক্ষার্থী ঝরে পরার সংখ্যা বাড়ছে এবং দিন এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে এই সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে। করোনা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে পিছিয়ে দিয়েছে। মেয়ে শিক্ষার্থীদের বাল্যবিয়ের শিকার হতে হচ্ছে এবং অনেক পরিবারের শিশু যারা দরিদ্র বা চাকরি বা কাজ হারিয়ে দারিদ্রতার শিকার হয়েছে তারা কাজের পথ বেছে নিচ্ছে। অথচ ঝরে পরা রোধ করা আমাদের টেকসই শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য ছিল।
সেই সাথে শিক্ষার বৈষম্য প্রবল হচ্ছে। কারণ আধুনিক ডিভাইস যার আছে সে ক্লাসে অংশগ্রহণ করছে আর যার সেটা নেই সে অংশগ্রহণ করতে পারছে না। যে অংশ নিতে পারছে না তার মধ্যে সাময়িকভাবে হলেও এক ধরনের হতাশা অনুভূত হচ্ছে এবং এর জন্য দারিদ্রতাকেই দায়ী করছে। এর ফলে একটি সীমিত সংখ্যক শিক্ষার্থীকে কোনোভাবে পড়ালেখায় ধরে রাখায় সফল হলেও বড় অংশই এর বাইরে থেকে যাচ্ছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেটরি রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড গভর্ন্যন্সের (বিআইজিডি) যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক পর্যায়ে ১৯ ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনার বাইরে চলে গেছে। ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত করা জরিপে এমন তথ্য উঠে আসে।
গবেষণার আরেকটি ধাপ ’কোভিড ইমপ্যাক্ট অন এডুকেশন লাইফ অব চিলড্রেন’ – এ শহর ও গ্রামের ৬ হাজার ৯৯টি পরিবারের মধ্যে জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে স্কুল বন্ধ থাকার ফলে শিক্ষায় ঘাটতি, শিক্ষার্থীদের ঝরে পরা, মানসিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাসহ দীর্ঘমেয়াদী নানা ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে।
শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে পরিবর্তন ও পরিমার্জন করার উদ্দেশ্য হলো কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনে শিক্ষাকে আরো যুযোগপযুগী করে তোলা। শিক্ষার এই লক্ষ্য অর্জনে সরকার বহুবিধ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। এসব বহুবিধ উদ্দেশ্যের মধ্য অন্যতম হলো শিক্ষায় টেকসই উন্নয়ন সাধন বা মানসম্মত শিক্ষা প্রণয়ন করা। যেখানে শিক্ষার্থীর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পরা হ্রাস করা একটি গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘদিনের পদক্ষেপ।
ঝরে পরা আমাদের দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। এই সমস্যা ক্রমহ্রাস করার চেষ্টাও দীর্ঘদিনের। করোনাকালীন সময় ছাড়াও শিক্ষার্থী ঝরে পরে কেন এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা দরকার। কেন শিক্ষার্থী ঝরে পরে বা কেন হঠাৎ বিদ্যালয়ে আসা ছেড়ে দেয় তার বেশকিছু কারণ রয়েছে। যার মধ্যে প্রথমেই রয়েছে দারিদ্রতা।
করোনার কারণে যা আরও তীব্র হয়েছে। অবশ্যই এটি কেবল আমাদের দেশের সমস্যা নয় বরং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অনেকে দেশেই এই সমস্যা রয়েছে। দারিদ্রতা উন্নয়নের সাথে সাথে এই সমস্যার দূর হওয়ার কথা। করোনার কারণে দারিদ্রতা থেকে উত্তরণে সময়ের প্রয়োজন হবে। মেয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে দারিদ্রতার সাথে আরও একটি সমস্যা হলো বাল্যবিবাহ।
বহু অভিভাবক নিজের এই পরিস্থিতিতিতে মেয়েকে বিয়ে দেওয়াই উপযুক্ত কাজ বলে মনে করছেন। আমাদের পাবলিক পরীক্ষা এসএসসি,জেএসসি এমনকি পিইসি পর্যন্ত যেসব মেয়ে শিক্ষার্থী অনুপস্থিত থাকে তাদের একটি বড় অংশের অনুপস্থিতির কারণ অনুসন্ধান করলে বাল্যবিয়ে কারণ হিসেবে দেখা যাবে।
এই সমস্যার সাথে বহু আগে থেকেই সচেতনতা তৈরি করা হচ্ছে। তবুও এটি ঘটেই চলেছে। একই সময় ছেলে শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতির কারণ হিসেবে অনেককেই বিভিন্ন শ্রমমূলক কাজে দেখা যাবে।
সরকারের প্রাণান্ত প্রচেষ্টা হলো সবাইকে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করানো। দেশকে স্বনির্ভর করতে হলে এর কোনো বিকল্পও নেই। এই দুঃসময়ে পড়ালেখার প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করে অনেক পরিবারই তাদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে। শিক্ষার্থীরা কাজে যেতে বাধ্য হচ্ছে। মেয়েদের শিশু অবস্থায় বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষার্থী ধরে রাখার জন্য সরকার যেসব প্রচেষ্টা করেছে তার মধ্যে অন্যতম হলো বিনামূল্যে বই বিতরণ।
বছরের শুরুতেই নতুন বই লাইব্রেরি থেকে কিনতে হচ্ছে না। যা অভিভাবকের মধ্যে একসময় মানসিক চাপ হিসেবে বিরাজ করতো। যেহেতু বছরের শুরুতেই বিনামূল্যে নতুন বই নিয়ে সন্তান বাড়ি ফিরছে। ফলে সেই মানসিক চাপটা এখন আর নেই।
তবে সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠাতে কোনো একক বিষয় প্রভাব বিস্তার করার চেয়ে বহু উদ্যোগ ভালো কাজে দেয়। বিনামূল্যে বইয়ের সাথে শিক্ষার্থীর উপবৃত্তির কথা বলা যায়। প্রাথমিকের প্রতিটি ছাত্রছাত্রী প্রতি মাসে এই উপবৃত্তি পাচ্ছে যা তার লেখাপড়াকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করছে।
এটা শিক্ষার্থীর এবং তার অভিভাবকের বিদ্যালয়ের প্রতি আগ্রহও বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। এই করোনার সময়েও শিক্ষার্থীরা এই সুবিধা পাচ্ছে। এর ফলে তাদের শিক্ষা সংক্রান্ত মৌলিক চাহিদা পূরণ হচ্ছে তবুও ঝরে পরা ঠেকানো যাচ্ছে না।
আমাদের লক্ষ্য এসডিজি অর্জন করা। আর এসডিজি অর্জনের জন্য মানসম্মত শিক্ষা অপরিহার্য। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত না করতে পারলে ঝরে পরার হারও কমিয়ে আনা সম্ভবপর হবে না। ঝরে পড়া রোধে শিক্ষার পরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রাথমিকে ভর্তির হার প্রায় শতভাগে উন্নীত হয়েছে। এটি একটি বড় সাফল্য।
শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর থেকে শিক্ষার্থীর লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে সে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। করোনাকালীন সময়ে অভিভাবকের প্রধান কাজ হবে শিক্ষার্থীকে বইয়ে ধরে রাখা। পরিস্থিতির সাথে লড়াই করা এবং সন্তানকে কোনোভাবেই কাজে না দেওয়া।
যদিও অনেক অভিভাবক স্কুল বন্ধের এই সুযোগে সন্তানকে কোনো না কোনো কাজে লাগিয়েছেন। এটা ঘটেছে বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারগুলোতে। যাদের আয় করোনার কারণে বন্ধ থেকেছে অথবা কাজ কম হয়েছে। উপরন্তু সংসারের ব্যয় ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ফলে বাধ্য হয়েই সন্তানকে আপাতত সংসারে আর্থিক সাহায্য করার জন্য কাজে পাঠিয়েছেন। স্কুল খুলে দিলে তাদের অনেকেই আবার ফেরত আসবে। আবার কেউ কেউ ফিরবে না। যা মানসম্মত শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে কাজ করবে।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
