মাশরাফির অধ্যায়ের শেষ!

নিউজ ডেস্ক।।

সব কিছুরই শেষ আছে। আর এই ‘শেষ’ অনুমিতই ছিল। তবু কিছু সমাপ্তি প্রত্যাশিত হলেও নাড়া দিয়ে যায়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের প্রাথমিক দলে মাশরাফি বিন মর্তুজার না থাকার বিষয়টিই তাই গতকাল দল ঘোষণার একমাত্র আলোচ্য হয়ে গেল। তাঁকে বাদ দেওয়ার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে একরকম ট্রিবিউটই দিয়েছেন প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন ও তাঁর সহকারী হাবিবুল বাশার। শেষোক্ত জন তো আবেগাক্রান্তও হয়ে পড়েছিলেন!

অবশ্য মাশরাফি বিন মর্তুজা তো আর শুধু একজন ক্রিকেটার কিংবা সফল অধিনায়কের নাম নয়, তিনি বাঙালির আবেগও। কত ছুতানাতা কারণে খবরের শিরোনাম হয়েছেন। সাতটি অপারেশনে ক্ষতবিক্ষত মাশরাফি সামান্য ব্যথা পেলেও আশঙ্কায় কুঁকড়ে উঠেছে দর্শক। সতীর্থদের কাছ থেকে সেরাটা আদায় করার নিজস্ব কৌশল, তাঁদের ছায়া হয়ে থাকা কিংবা ড্রেসিংরুমে শান্তি বজায় রাখার গুণ মিলিয়ে মাশরাফি অন্য উচ্চতায় তুলে নিয়ে গেছেন নিজেকে। তাই উত্তরসূরি তামিম ইকবালের অধিনায়কত্ব অবধারিতভাবে তুলনা করা হবে মাশরাফির সঙ্গে। তাঁর জায়গায় বল হাতে ছুটবেন যিনি, তাঁকেও ফেলা হবে আতশকাচের নিচে। সব মিলিয়ে ৩৭ বছর বয়সী মাশরাফিকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তটা মিনহাজুল ও হাবিবুল বাশারের কাছে ছিল ‘কঠিন’।

অবশ্য ক্রিকেট ক্যারিয়ারের ‘শ্রদ্ধাঞ্জলি’ এখনই নিতে রাজি নন ২০০১ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষিক্ত ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’। ওটা ছিল হাবিবুল বাশারের ষষ্ঠ টেস্ট। এরপর টেস্টের ফিফটি পূর্ণ করেন সাবেক এ অধিনায়ক। কিন্তু বাংলাদেশ ক্রিকেটে পেস বোলিংয়ের ‘সূর্যোদয়’ মাশরাফির টেস্ট ক্যারিয়ার থেমে যায় ৩৬ ম্যাচেই। দুর্দান্ত বোলিং আর ঠিক ততটাই নিবেদিতপ্রাণ মাশরাফিকে অতিরিক্ত বোলিং করানোর লোভ সংবরণ করতে পারেননি কোনো অধিনায়কই। সেসব কারণে বারবার বড় বড় চোট কেড়ে নিয়েছে মাশরাফির ক্যারিয়ারের অনেকটা সময়। তবু তিনি যে এখনো খেলছেন, এ এক বিস্ময়—এমনকি অস্ট্রেলীয় সার্জনদের কাছেও।

২০০৯ সালের পর সাদা পোশাক আর গায়ে না চড়ালেও সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটে দাপটের সঙ্গেই খেলে গেছেন মাশরাফি বিন মর্তুজা। বাংলাদেশের পক্ষে ওয়ানডেতে এখনো তিনি সর্বাধিক উইকেটের (২৭০) মালিক। দুই বছর আগে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি থেকে অবসর নিয়েছেন বটে, তবে মাত্র দুই দিনের প্রস্তুতিতে বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপের মাঝপথে তাঁকে নিয়ে লটারিতে নেমেছে তিন দল। এক ম্যাচে ৫ উইকেট নিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন নিজের মূল্য। এ ফরম্যাটের অধিনায়ক মাহমুদ উল্লাহ মুগ্ধ, ‘মাশরাফি ভাইকে আমি যেকোনো পর্যায়ে যেকোনো দলে চাইব।’ কিন্তু টি-টোয়েন্টি থেকে যে আগেই অবসর নিয়ে ফেলেছেন মাশরাফি।

বাকি ছিল ওয়ানডে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে আসন্ন তিন ম্যাচ সিরিজের জন্য ঘোষিত ২৪ জনের দল ঘোষণার মধ্য দিয়ে নির্বাচকরা জানিয়ে দিলেন যে, এক দিনের ক্রিকেটেও তাঁদের ভাবনায় আর মাশরাফি নেই। তাঁদের দৃষ্টি ২০২৩ বিশ্বকাপে। সে আসরের জন্য দল গড়তেই মাশরাফিকে রাখা হয়নি ২০২১ সালে জাতীয় দলের প্রথম স্কোয়াডে। মাঠে দাঁড়িয়েই মাশরাফির ‘আইকন’ হয়ে ওঠা দেখা হাবিবুল বাশার তাই বলেছেন, “‘হি ইজ স্টিল গুড।’ কিন্তু সামনে ওর জন্য কঠিন হয়ে যাবে। এটিই বাস্তবতা। প্রধান নির্বাচক যেটি বলেছেন, আমাদের সামনে তাকাতে হবে।”

যাঁকে নিয়ে এত আলোচনা, সেই মাশরাফি বিন মর্তুজা কী ভাবছেন? না, তিনি ক্ষুব্ধ নন। এমন একটি খবর যে একদিন শুনতেই হবে, সেটি অবধারিতভাবে জানতেন তিনিও। পুরো বিষয়টিকে পেশাদারি দৃষ্টিভঙ্গিতেই নিয়েছেন মাশরাফি। তাই বলে ক্রিকেট ক্যারিয়ারের সূর্যাস্ত এখনই দেখতে রাজি নন তিনি, ‘ক্রিকেট খেলেই আমি এত দূর এসেছি। আমি খেলে যাব। ঘরোয়া ক্রিকেটে যেখানে সুযোগ পাব, সেখানেই খেলব। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আর খেলব কি না, সেটি নির্বাচকদের ব্যাপার।’

গত বিশ্বকাপের পর থেকেই নিজের অবসরকে ঘিরে পূর্ব ভাবনা থেকে সরে এসেছেন মাশরাফি বিন মর্তুজা। নানা কারণে ঘটা করে অবসর নেওয়ার ইচ্ছা আর নেই তাঁর, ‘শরীর-মন যত দিন চাইবে খেলে যাব।’ এই খেলে যাওয়াটা নিজের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার লড়াইয়ের বারুদে ঠাসতে চান না মাশরাফি, ‘খেলব মনের আনন্দে।’ এই আনন্দভ্রমণকে জাতীয় দলে ফেরার লড়াই মনে করছেন না বারবার ‘মৃত্যুকূপ’ থেকে উঠে আসা মাশরাফি, ‘ওসব ভাবনা নেই। তবে কাল কী হবে, কেউ তা জানে না!’

এ যেন ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’ গল্প!


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.