বাংলাদেশের বর্তমান পেক্ষাপটে শিক্ষক ধারাবাহিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হতে হবে

মুহাম্মদ শাহজামান শুভ।।

সমাজের প্রতিবিম্ব হলেন শিক্ষক। শিক্ষকগণ যদি ক্লাশে শিক্ষার্থীদেরকে ভালভাবে নৈতিক জ্ঞান দিতে পারে তাহল সমাজ হয়ে উঠবে আলোকিত। শিক্ষার্থীর নৈতিক বিচ্যুত যদি সমাজ বা পরিবেশের জন্য হয়ে থাকে তদুপরিও শিক্ষকগণ কিঞ্চিত দ্বায়ী কারণ তাদের শিক্ষার্থীই বর্তমান সমাজ। সাম্প্রতি দুদক শিক্ষককের দূর্ণীতি নিয়ে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করে সমালোচিত হয়েছে। এর কারণ  অবশ্য শিক্ষক নয় দুদকই দায়ী। শিক্ষক সমাজ দুদকের ভাল কাজকে স্বাগত জানায়।

শিক্ষকতা একটি মহান ব্রত। শিক্ষক সমাজের শ্রেষ্ঠ মডেল। শিক্ষকের সমস্ত আচরণ সমাজকে প্রভাবিত করে। এই জন্য শিক্ষকের আচরণ হতে হবে শ্রেষ্ঠ আচরণ। যাদের এই ধরনের আচরণের অধিকারী হওয়া সম্ভব, তারাই হবে শিক্ষক, অন্যদের এ পেশা থেকে দূরে থাকা শ্রেয়। ইদানীং কিছু অযোগ্য লোক এই পেশায় ঢুকে পেশার মর্যাদাহানি করছে, এদের কারণে দেবতার মত শিক্ষকেরা আজ পথে ঘাটে অপমানিত হচ্ছে। সমাজ শিক্ষকদের প্রাপ্য মর্যাদা দিচ্ছে না, ফলে অনেকে শিক্ষকতা পেশার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে। অযোগ্য লোকদের আধিক্যে সমাজের লোকেরা শিক্ষকদেরকে ক্রিমিনাল ভাবতে শুরু করেছে। শিক্ষকের পেছনে গোয়েন্দা লাগানোর ইংগিত দিয়েছেন বাংলাদেশের একজন মন্ত্রি।   সমাজে শিক্ষকদের মর্যাদা না থাকলে, তাদের পক্ষে সুশিক্ষিত জাতি গঠন করা সম্ভব নয়।

 

শিক্ষকের মর্যাদা বিষয়ক ইউনেস্কো ও আইএলও সনদ একটি আন্তর্জাতিক সনদ, যা শিক্ষকের মর্যাদা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে জাতিসংঘের শিক্ষা বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা (ইউনেস্কো) এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) যৌথভাবে তৈরি করে। ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবরে ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত বিশেষ আন্তরাষ্ট্রীয় সম্মেলনে সনদটি গৃহীত হয়।

শিক্ষকদের মর্যাদা প্রসঙ্গে বিশেষ আন্তসরকার পর্যায়ের সম্মেলন দ্ব্যর্থহীনভাবে:

  • শিক্ষাকে একটি মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে ঘোষণা করছে।
  • সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার অনুচ্ছেদ ২৬ অনুসারে সবার জন্য যথোপযুক্ত শিক্ষালাভের ব্যবস্থা করার জন্য রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ববোধ ঘোষণা করছে এবং শিশুদের অধিকার ঘোষণার ৫, ৭ ও ১০ নং নীতি ও যুবকদের মধ্যে শান্তির অন্বেষা এবং মানুষে মানুষে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমঝোতাবৃদ্ধি সংক্রান্ত সম্মিলিত জাতিসংঘের ঘোষণাকে পুনর্ব্যক্ত করছে।
  • মানুষের আর্থসামাজিক প্রগতি এবং নৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশ অব্যাহত রাখার অপরিহার্য উপাদান হিসেবে যে মেধা ও প্রতিভা পাওয়া যায়, তার সুব্যবহারের প্রত্যয় এবং এ লক্ষ্যে সাধারণ, বৃত্তিমূলক এবং কারিগরি শিক্ষাকে আরও ব্যাপক ও বিস্তৃত করার অত্যাবশ্যকতা সম্পর্কে সজাগ থাকার ঘোষণা করছে।
  • শিক্ষার অগ্রগতি, মানবজাতির ক্রমোন্নতি এবং আধুনিক সমাজের বিকাশ সাধনে শিক্ষক সম্প্রদায়ের অপরিহার্য ভূমিকা ও অবদানের কথা জোরের সঙ্গে ঘোষণা করে শিক্ষকরা যাতে এসব ভূমিকা পালনের জন্য উপযুক্ত সম্মান ও মর্যাদা ভোগ করতে পারেন তা সুনিশ্চিত করার অঙ্গীকার ঘোষণা করছে।
  • বিভিন্ন দেশের অবস্থান এবং সামাজিক বিধিবিধান, রীতিনীতি প্রথাগত বৈচিত্রের কারণ সংশ্লিষ্ট দেশের শিক্ষার ধরন এবং গঠন প্রক্রিয়া সম্পর্কে চিন্তা করছে।
  • বিভিন্ন দেশে শিক্ষকতার জন্য বিপরীতধর্মী যে সব শিক্ষা উপকরণাদি দেওয়া হয়, বিশেষ করে সে সব দেশ যেখানে শিক্ষকরা সরকারি চাকুরির বিধিমালায় চাকুরিরত, তাদের বিষয় বিবেচনার কথা ঘোষণা করছে।
  • বিভিন্ন দেশের শিক্ষাপদ্ধতি এবং প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্নতা সত্ত্বেও সব দেশের শিক্ষকদের সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদার প্রশ্নে যে একটি অভিন্নতার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, তা বলিষ্ঠভাবে ঘোষণা করছে।
  • বর্ণিত আন্তর্জাতিক সনদের যা কিছু শিক্ষকদের জন্য প্রযোজ্য – উদাহরণস্বরূপ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সাধারণ সম্মেলনে গৃহীত সংঘবদ্ধ হওয়ার স্বাধীনতা, সভা-সম্মেলন সংগঠিত করার অধিকারের নিরাপত্তা, ১৯৪৯ সালের সংগঠিত হওয়া এবং দরকষাকষির অধিকার সনদ, ১৯৫১ সালের পারিশ্রমিক সনদ এবং ১৯৫৮ সালের বৈষম্য দূরীকরণ সনদ এবং ইউনেস্কোর সাধারণ সম্মেলনে গৃহীত ১৯৬০ সালের শিক্ষার বৈষম্য দূরীকরণ সনদ এসব মৌলিক মানবাধিকার সংক্রান্ত বিষয়াবলীয় গুরুত্ব স্বীকার এবং ঘোষণা করছে।

এ ছাড়া ইউনেস্কো এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার উদ্যোগে আয়োজিত জনশিক্ষা বষয় সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গৃহীত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকতার শর্ত এবং মর্যাদা সংক্রান্ত সুপারিশাদি এবং ইউনেস্কোর সাধারণ সম্মেলনে গৃহীত ১৯৬২ সালের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সংক্রান্ত সুপারিশমালা এবং গুণগত ও উৎকর্ষ শিক্ষা বিস্তারের প্রয়োজনে দক্ষ শিক্ষকের সংখ্যাবৃদ্ধি এবং তাদের পেশাগত সমস্যাদি দূরীকরণের লক্ষ্যে শিক্ষকতার বর্তমান মানদণ্ডকে আরও উন্নত করার অভিপ্রায়ে বর্ণিত আন্তর্জাতিক সনদটি প্রণীত, গৃহীত এবং ঘোষিত হল।

ইসলাম ধর্মে শিক্ষা ও শিক্ষকের মর্যাদা দিয়েছে অসীম।  সমাজে শিক্ষকদের সম্মানের দৃষ্টিতে দেখার ঐতিহ্য ও রীতি বেশ প্রাচীন। শিক্ষা অনুযায়ী মানবচরিত্র ও কর্মের সমন্বয় সাধনই হচ্ছে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর তাগিদ। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘আল্লাহর পরে, রাসূলের পরে ওই ব্যক্তি সর্বাপেক্ষা মহানুভব যে জ্ঞানার্জন করে ও পরে তা প্রচার করে।’ (মিশকাত শরিফ)

উমর (রা.) ও উসমান (রা.) তাদের শাসনামলে শিক্ষা ব্যবস্থাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তারা শিক্ষক ও ধর্মপ্রচারকদের জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করেছিলেন। আবদুর রহমান ইবনুল জাওজি (রহ.) তার বিখ্যাত ‘সিরাতুল উমরাইন’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) হজরত ওসমান ইবনে আফ্ফান (রা.)-এর যুগে মুয়াজ্জিন, ইমাম ও শিক্ষকদের সরকারি ভাতা দেওয়া হতো। (কিতাবুল আমওয়াল, পৃষ্ঠা: ১৬৫)

প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমরা জ্ঞান অর্জন করো এবং জ্ঞান অর্জনের জন্য আদব-শিষ্টাচার শেখো। এবং যার কাছ থেকে তোমরা জ্ঞান অর্জন করো, তাকে সম্মান করো।’ (আল-মুজামুল আওসাত, হাদিস নং: ৬১৮৪)

বাংলাদেশের বর্তমান পেক্ষাপটে শিক্ষক হিসেবে সফলতা লাভ করতে নিম্নলিখিত বিষয়াবলীর প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবেঃ

(১)শিক্ষক স্বাস্থ্য সচেতন হতে হবেঃ শিক্ষককে স্বাস্থ্য সচেতন হতে হবে। নিয়মিত স্বাস্থ্য চর্চা,হাটা, পরিমিত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তোলতে হবে। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠা এবং ধর্মানুযায়ী কাজ করে নিয়মিত ব্যায়াম করে স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে হবে। নিজে স্বাস্থ্যবান হলে অপরকে সাস্থ্য সচেতন করতে সহজতর হয়।

(২)পরিমিত পুষ্টি গ্রহণ করতে হবেঃ শিক্ষককে নিজেই পুষ্টিমান খাবার খেতে হবে। পরিমাণ পুষ্টি গ্রহণ করা একটা মানসিক বিকাশেরই অংশ। রোগ প্রতিরোধে পরিমাণ মত পুষ্টি গ্রহণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে পরিমিত ও সুষম খাদ্য খেলে শরীর ও মন উভয়ই ভাল থাকে, যা শিক্ষকতার জন্য খুবই জরুরি।

(৩) আই সি টি দক্ষ হতে হবেঃ একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষার্থীদের সক্ষম করে তোলার জন্য শিক্ষককে আইসিটিতে দক্ষ হতে হবে। বর্তমান শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রশ্নের বা চাহিদার উত্তর দিতে গেলে শিক্ষককে অবশ্যই আই সি টি দক্ষ হতে হবে।

(৪) শিক্ষক প্রাচুর্যশীল হবেনঃ শিক্ষক অবশ্যই তাঁর নিজের এবং পরিবারের চাহিদা চালাতে সক্ষম হতে হবে। তিনি নিজে ধনী না হলেও চাহিদানুযায়ী ধন তার থাকতে হবে। সমাজের ধনের ছেলে পড়াবেন আর অর্থের অভাবে নিজের ছেলে মেয়ে পড়াতে পারবেন না- তা হবে না। অর্থের জন্য শিক্ষককে কারো কাছে হাত পাতলে শিক্ষকের আত্মমর্যাদা নষ্ট হবার সম্ভাবনা থাকে। এতে শিক্ষকের আত্মমর্যাদা না ।

(৫) পরিচ্ছন্নতার আদর্শ মডেল হবেঃ একজন শিক্ষককে সর্ব অবস্থায় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। এর জন্য সব সময় নতুন কাপড় পরতে হবে তা নয়, তবে পরিচ্ছন্ন কাপড় পরতে হবে। শিক্ষকের কক্ষ হবে পরিচ্ছন্ন ছিমছাম, পোশাক হবে মার্জিত, হাঁটা-চলা হবে মধ্যমানের, তবে আকর্ষণীয়। এতে করে শিক্ষকের ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠবে। নিজের সমাজ ও ধর্মের বহির্ভূত পোশাক পরিহার করবেন।

(৬) প্রমিত ভাষায় কথা বলবেন এবং হাসিখুশি থাকবেনঃ শিক্ষক যে ভাষায় কথা বলুক, উচ্চারণ হতে হবে বিশুদ্ধ, স্পষ্ট। কর্কশ শব্দ শিক্ষকের জন্য নিষিদ্ধ। কথা বলার সময় মুখে রাখতে হবে হালকা হাসি। অট্টহাসি পরিহার করতে হবে। এতে ব্যক্তিত্ব নষ্ট হয়। গলার স্বর হবে নিয়ন্ত্রিত ও অবস্থানুযায়ী। আঞ্চলিকতা পরিহার করতে হবে।

(৭) ধারাবাহিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হতে হবেঃ জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো বিভিন্ন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে প্রতি বছর ’ গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং ( জিইএম) প্রতিবেদন প্রকাশ করে, সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে  যে, প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে সবচেয়ে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় প্রশিক্ষিত শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ৫০ শতাংশ। অথচ প্রতিবেশি দেশ নেপাল, মালদ্বীপ, মিয়ানমার ও সিঙ্গাপুরে এই হার ৯০শতাংশেরও বেশি। এছাড়া শ্রীলংকায় প্রাথমিক শিক্ষায় পাঠদানরত শিক্ষকদের ৮৫শতাংশ, পাকিস্তানের ৮২ ও ভারতের ৭০শতাংশেরই প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ রয়েছে এর বাইরে ভুটান, জর্ডান, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ডে প্রাথমিক শিক্ষকদের শতভাগই প্রশিক্ষিত। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী  এ বিষয়ে বলেন, ” বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিক্ষকতা পেশায় যোগদানের আগে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণের সনদ নিতে হয়। শুধু প্রাথমিক নয়, শিক্ষার প্রতিটি ধাপেই শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ গ্রহণ অত্যাবশ্যক। নিয়োগের শর্ত হিসেবে ছয় মাসের প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। কেননা আমাদের দেশে বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষায় বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয় না। নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকরা ভিন্ন বিষয় নিয়ে পড়েছেন। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের জন্য এসব শিক্ষককে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা জরুরি।  এছাড়া প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের জন্য ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন

(৮) নিরপেক্ষা ও ন্যায় বিচারক হবেনঃ স্কুলে ও সমাজে সর্বক্ষেত্রে শিক্ষক হবে একজন মহান ন্যায় বিচারক। যে কোন ঘটনা নিজে ন্যায় বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকে মীমাংসা করবেন। যেখানে শিক্ষকের কিছু করার থাকে না, সেখানে অন্ততঃ কিছু ভাল পরামর্শ দেবেন, একেবারে কিছু করা সম্ভব না হলে নীরব থাকা শ্রেয়। নিম্নলিখিত বিষয়াবলীর দিকে লক্ষ্য রাখবেনঃ

ক) প্রত্যেক শিক্ষক কোন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিষয়ে শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধকরণ বা প্রচারণা চালাতে পারবেন না। তিনি নিজেও কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে পারবেন না। নিজস্ব ধর্মপালনে বা উপাসনালয়ে যাওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা তিনি ভোগ করবেন। কিন্তু অন্যের ধর্মের বিরূদ্ধে কোন নেতিবাচক মতামত বা প্রভাব বিস্তার বিশেষভাবে বর্জনীয়। তাঁর পদ অথবা প্রাতিষ্ঠানিক বা রাজনৈতিক শক্তির অপব্যবহার করতে পারবেন না।

খ) শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধী, আদিবাসীসহ সকল ক্ষুদ্রজাতিসত্তার অনগ্রসর শিক্ষার্থীদের অবজ্ঞাা এবং তাদের সংস্কৃতি ও ভাষাকে অবহেলা না করা।
গ)  মানবাধিকার লঙ্ঘন, নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি, পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের বঞ্চনা ও নির্যাতন থেকে বিরত থাকা সহ সকল শিক্ষার্থীর সুযোগের সমতা নিশ্চিত করা।
ঘ) শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে কোন শিক্ষার্থী বা অভিভাবককে কোনরূপ বাধ্যবাধকতা, বাধা বা শর্তের অধীন করা যাবে না।
ঙ) ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ, অর্থনৈতিক অবস্থান বা জন্মস্থানের কারণে কোন সহকর্মী অথবা শিক্ষার্থীর প্রতি বৈষম্য, কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের সুবিধা প্রদান করবেন না।
চ) কোন ক্রমেই কারো বিরুদ্ধে কোন মিথ্যা অভিযোগ আনবেন না।
ছ) শিক্ষার্থীর শিক্ষা সমাপ্তির পরে অথবা অন্য প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের স্থানান্তর ব্যতীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত কোন শিক্ষার্থীর সাথে কোন শিক্ষক বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবেন না।
জ) একজন শিক্ষককে সামাজিক রীতিনীতির বাইরে অর্থাৎ সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া যাবে না।
ঝ) শিক্ষার্থী অথবা অন্য কারো সাথে কোন অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন অথবা অবৈধ সম্পর্ক স্থাপনে উদ্বুদ্ধ করা বা প্ররোচিত করা বা জোড় করা, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
ঞ) মাদক বা নেশা জাতীয় দ্রব্য, জুয়া, অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন তথা একজন শিক্ষকের আত্মমর্যাদা বিঘ্নিত হয় অথবা সর্বোপরি সামাজিকভাবে হেয় বলে প্রতীয়মান হয় এ ধরণের  অনৈতিক কার্যক্রম থেকে বিরত থাকা।
ট) উপঢৌকন হিসেবে কোন ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে অর্থ, মূল্যবান বস্তু অথবা যেকোন প্রকার সাহায্য প্রাপ্তির আবেদন করতে পারবেন না।

(৯) নিজে ছাত্র হওয়াঃ একজন নিজে সবসময়ের ছাত্র। তাঁকে সব সময় পড়তে হয়। সৃজনশীলতার জন্যও অনেক বই পড়তে হয়। পড়ার জন্য দরকার প্রচুর বই। বইয়ের জন্য দরকার লাইব্রেরি। শিক্ষক নিজেই একটা ছোট ব্যক্তিগত লাইব্রেরি গড়ে তোলতে পারেন  যাতে করে অবসরে জ্ঞানের জগতে বিচরণ করা যায়, যে জ্ঞান পরে শিক্ষার্থী ও সমাজের মধ্যে বিলিয়ে দেয়া যায়।

(১০) রাজনৈতিক বিতর্ক এড়িয়ে যেতে হবেঃ শিক্ষক রাজনৈতিকভাবে সচেতন হবেন, কিন্তু কোন পক্ষের হবেন না। তিনি আর্দশের বাহিরে যাবেন না। তিনি সমাজের আর্দশের আমাদের শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষকরা রাজনীতি করতে গিয়ে সন্তানসম ছাত্রদের হাতে নিগৃহিতও অপমানিত হচ্ছেন। কেউ নেতা হতে চাইলে শিক্ষকতা ছেড়ে দেয়া ভাল। অনেক শিক্ষক নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য নেতাদের পিছনে ঘুর ঘুর করছে, এটা খুবই লজ্জাজনক। সমাজ সংস্কার ও জাতি গঠন, শিক্ষা-সংস্কৃতির উন্নয়ন ও বিকাশের ক্ষেত্রে একজন আদর্শ শিক্ষকের অবদান কোনো রাষ্ট্রনায়ক, অর্থনীতিবিদ বা জনপ্রতিনিধির চেয়ে কম নয়। শিক্ষকরা একজোট থাকলে সরকার যৌক্তিক সব দাবি অবশ্যই মেনে নেবে।

(11) সৃজনশীল, সৎ ও আদর্শ মানুষের সাথে বন্ধুত্ব : একজন শিক্ষক যে কারো সাথে বন্ধুত্ব বা সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবে না। বিতর্কিত ও অপরাধ জগতের মানুষের সাথে শিক্ষকের উঠা-বসা সমাজ কখনো গ্রহণ করবে না।

(১২) শিক্ষক সম-সাময়িক বিষয়ে অভিজ্ঞ হবেন: শিক্ষককে সমসাময়িক ঘটে যাওয়া যে কোন ঘটনা সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা রাখতে হবে। নচেৎ তিনি শিক্ষার্থী ও সমাজের মানুষের চাহিদা তথা জিজ্ঞাসার জবাব দিতে ব্যর্থ হবেন। এসব বিষয় ছাড়াও প্রাথমিক চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক অনেক বিষয়ে শিক্ষকের জ্ঞান থাকতে হবে।

(13) নিজ বিষয়ের বাইরেও জ্ঞান থাকতে হবে: প্রতিটি শিক্ষককে নিজ বিষয়ের বাইরেও জ্ঞান রাখতে হয়। এতে করে কারো অনুপস্থিতিতে যেমন- ক্লাস নেওয়া যায়, তেমনি শিক্ষার্থীদের জ্ঞান পিপাসাও মিটানো যায়। এতে শিক্ষার্থী মহলে উক্ত শিক্ষকের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে এবং অভিভাবক ও সমাজের কাছেও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে।

(14) সৎ, নিষ্ঠাবান ও অধ্যবসায়ী হতে হবে: প্রতিটি শিক্ষককে হতে হবে সৎ, নিষ্ঠাবান ও অধ্যবসায়ী মানুষ। নিয়মানুবর্তিতার প্রতি হবে খুবই যত্নবান। সব সময় সত্য কথা বলতে হবে। মিথ্যার সাথে আপোষ করা চলবে না। সত্য যতই অপ্রিয় হোক তা বলতেই হবে। কথায়, চাল চলনে হতে হবে বিনয়ী। শিক্ষক এমন সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পাঠদান করবেন, যাতে শিক্ষার্থীর আর গৃহশিক্ষকের (প্রাইভেট টিউটর) প্রয়োজন না হয়। কারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো দেশের প্রধান প্রোডাকটিভ খাত। দেশের শ্রেষ্ঠ মেধার লালন কেন্দ্র। শ্রেষ্ঠ মেধাবী লালন-পালনের মাধ্যমে সর্বক্ষেত্রে যোগ্য নেতৃত্ব ও মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন সুনাগরিক তৈরি করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম দায়িত্ব।

(১৫) শিক্ষক হবেন দয়ার সাগরঃ শিক্ষককে হতে হবে দয়ার সাগর। সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের সুখে দুঃখে তাকে পাশে দাঁড়াতে হবে। আর্থিকভাবে না হোক, মৌখিক সহানূভূতি হলেও জানাতে হবে। সমাজের কারো বিপদ হলেও শিক্ষককে সেখানে হাজির হতে হবে। এছাড়া যে কোন সামাজিক অনুষ্ঠানে শিক্ষকের উপস্থিতি খুবই দরকার।

(১৬) নেতৃত্বের গুণ থাকতে হবেঃ শিক্ষককে স্কুলে ও সমাজে নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হয়। এসব দায়িত্ব পালনের জন্য দরকার নেতৃত্বের গুণাবলী। নেতৃত্বের গুণাবলী অর্জন ব্যতীত স্কুল ও সমাজের জন্য কোন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন সম্ভব নয়।

(১৭) ধূমপান ও নেশাদ্রব্য থেকে দূরে থাকতে হবঃ শিক্ষক হল সমাজের মডেল। সমাজের জন্য ক্ষতির এমন কোন অভ্যাস শিক্ষকের থাকলে তা পরিত্যাগ করতে হবে। বিশেষ করে ধূমপান ও নেশাদ্রব্য থেকে শিক্ষককে দূরে থাকতে হবে। কারণ শিক্ষকের এ কাজ দ্বারা সমাজও শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

(১৮) শিক্ষার্থীর সাথে অনৈতিক আচরণ করা যাবে নাঃ প্রায়ই শিক্ষক ছাত্রীর প্রেম-বিয়ে নিয়ে শিক্ষকের বিরুদ্ধে নানা কথা শোনা যায়। ছাত্রীর সাথে বিয়ে ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ না হলেও এটি একটি অনৈতিক কাজ বটে। শিক্ষককে এ ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে। এসব কাজ শিক্ষকের মর্যাদাহানি করে।

(১৯) শিক্ষককে দক্ষ সংগঠক হতে হবেঃ প্রত্যেক শিক্ষকই এক একটি সংগঠন। যাদের সাংগঠনিক দক্ষতা নেই, তারা কখনো সফল শিক্ষক হতে পারে না। সাংগঠনিকভাবে সফল শিক্ষকরা সর্বক্ষেত্রে সাফল্য লাভ করে। এরা নিজেদের অভিজ্ঞতাকে পূর্ণ ব্যবহার করতে পারে। এদের হাত দিয়ে গড়ে উঠে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান। এরাই সত্যিকার আলোকিত মানুষ।

(২০) শিক্ষক হবে ক্রীড়ামোদী, প্রগতিশীল ও সংস্কৃতির ধারক-বাহকঃ শিক্ষক হবে খেলাধূলার প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহী। শিক্ষার্থীদের খেলাধূলার সাথে সম্পৃক্ত করে তাদের মন ও মননের বিকাশ ও শারীরিকভাবে দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য খেলাধূলার বিকল্প নেই। এছাড়া শিক্ষককে হতে হবে প্রগতিশীল। সময়ের পরিবর্তনের সাথে নিজেকে ও শিক্ষার্থীদের খাপ-খাওয়ানোর ব্যবস্থা করার দায়িত্ব হবে শিক্ষকের। তবে প্রগতির নামে ধর্ম ও মূল্যবোধকে ধ্বংস করা যাবে না। শিক্ষকরা সুস্থ সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হবেন। সর্বত্র এ সংস্কৃতিকে ছড়িয়ে দেবার দায়িত্ব শিক্ষকের।

(২১) মূল্যবোধে ও স্ব-ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবেঃ প্রত্যেক শিক্ষককে মূল্যবোধের ধারক, বাহক ও প্রচারক হতে হয়, শ্রদ্ধাশীল হতে হয় নিজ ধর্মের প্রতি। একই সাথে অন্য ধর্মের প্রতিও শ্রদ্ধা পোষণ করতে হবে। ধর্ম ও মূল্যবোধে আঘাত হানে এমন কোন কাজ শিক্ষক করতে পারে না। কারণ সমাজ টিকে আছে ধর্ম ও মূল্যবোধ নিয়ে। শিক্ষক কখনো এই সমাজকে ধ্বংস করতে পারে না। শিক্ষকের কাজ সৃষ্টি করা, ধ্বংস সাধন নয়।

(২২)শিক্ষা বিস্তার ও সমাজ সংস্কারকঃ শিক্ষককে শিক্ষাবিস্তার ও সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে হবে। শিক্ষকই সুশিক্ষিত ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতিটি শিক্ষককে শিক্ষা বিস্তারে অবশ্যই ভূমিকা রাখতে হবে। শিক্ষক সভ্যতার দূত। সু-শিক্ষা ও সু-সংস্কৃতির মিশ্রণে শিক্ষক সমাজ সংস্কারে ভূমিকা রাখবেন।

(২৩) দারিদ্র্য বিমোচনে শিক্ষকের ভূমিকাঃ শিক্ষককে সমাজ ও দেশ নিয়ে ভাবতে হয়। শিক্ষকতার বাইরে বাড়তি আয়ের জন্য লাইব্রেরি ব্যবসা, নার্সারী, বৃক্ষরোপণ, পশু-পাখির ফার্ম এ জাতীয় কিছু কাজ করে নিজেকে যেমন আর্থিকভাবে স্বচ্ছল করা যায়, তেমনি অসংখ্য দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায়। এভাবে শিক্ষকদের মাধ্যমেই দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে।

(২৪) আত্ম সমালোচনা ও পাঠপরিকল্পনা প্রণয়নঃ প্রত্যেক শিক্ষককে রাত্রে ঘুমানোর আগে আত্মসমালোচনা করতে হয়। এ ধরনের আত্মসমালোচনার মাধ্যমে সারাদিনের কাজগুলি বিশ্লেষণ করে ভুলত্রুটি সংশোধন করে পরবর্তী দিন শুরু করা যায়। এছাড়া সুষ্ঠু সুন্দর ও কার্যকরভাবে ক্লাস নেয়ার জন্য অবশ্যই পাঠ পরিকল্পনা করতে হবে, যাতে পরের দিনের ক্লাসসমূহ সুন্দরভাবে নেয়া যায়।

শিক্ষক আলোকিত মানুষ হবেন, সুন্দর মনের মানুষ হবেন। শিক্ষক মানবতার মহান বন্ধু হবেন। একজন শিক্ষকের পা থেকে মাথা পর্যন্ত সবটাই শিক্ষার্থীর জন্য অনুকরণীয় হতে হবে। শিক্ষকের পরিবার হবে সমাজের কাছে পূজনীয়। শিক্ষক পরিবারে সফল না হলে বিদ্যালয় ও সমাজেও সফল হবে না। দুদক ও গোয়েন্দা নয়, শিক্ষক নিজেই নিজের শিক্ষক হতে হবে।

সূত্র : ইন্টারনেট।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.