আব্দুর রহমান লাবু।।
বৈশ্বিক মহামারি করোনার ক্রান্তিকালের মধ্যেই এশিয়ার পরাশক্তি ও বড় অর্র্থনীতির দেশ চিরবৈরী চীন-ভারত লাদাখ সীমান্ত নিয়ে নতুনকরে জড়িয়ে পরেছে চুড়ান্ত বিরোধে।কয়েক সপ্তাহ ধরেই লাদাখ সীমান্তে ভারত-চীন উত্তেজনা বিরাজ করছিল।সেই উত্তেজনা প্রশমনের প্রচেষ্টার মধ্যেই গত ১৫ জুন রাতে দুই দেশের সেনাদের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে।
ভারতের বার্তা সংস্থা এএনআইয়ের বরাতে এনডিটিভি জানিয়েছে,উভয়দেশের সেনাসংঘর্ষে ভারতের ২০ ও চীনের ৪৩ সেনা নিহত এবং আহত হয়েছে উভয় দেশের কয়েকশত সদস্য ।তবে চীনা রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা গ্লোবাল টাইমসের বরাতে এনডিটিভি জানিয়েছে,চীন সরকার তাদের সেনাসদস্যের নিহত হবার কথা অস্বীকার করলেও সংঘর্ষে তাদেরও অনেক সেনা সদস্য গুরুতর আহত হয়েছে বলে স্বীকার করে।
উল্লেখ্য ১৯৭৫ সালের পর এই প্রথম সীমান্ত উত্তেজনার প্রেক্ষিতে উভয় দেশের সেনাবাহিনীর সংঘর্ষে নিহত এবং ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের পর এটাই বড় সংঘর্ষের ঘটনা ।চীনের দাবি ভারতের সেনারা সীমানা অতিক্রম করে চীনা ভূ-খন্ডে অবৈধ অনুপ্রবেশ করায় এমন অনভিপ্রেত ও অনাকাঙ্খিত ঘটনার সূত্রপাত।অপরদিকে বেইজিংয়ের উদ্দেশে নয়াদিল্লি বলেছে,ভারত তার সার্বভৌমত্ব আঞ্চলিক অখন্ডতা সুনিশ্চিত করতে সব সময় প্রস্তুত থাকবে।
বর্তমানে সীমান্তে বিরাজ করছে টানটান উত্তেজনা ও চলছে যুদ্ধাবস্থার প্রস্তুতি। উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সেনাসদস্যরা রয়েছে সর্বোচ্চ সতর্কতাবস্থায়।এমতাবস্থায় ধৈর্য হারিয়ে শান্তিপূর্ণ কূটনৈতিক সমাধানের পথে না হেটে যদি কোন দেশ ভুল পদক্ষেপ নেয় তবে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ।আশার কথা উভয় দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ফোনালাপে একে অন্যকে দোষারোপ করলেও তারা শান্তিপূর্ণ সমাধানের কথা ভাবছেন।
ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত কারনে উভয় দেশের মধ্যে সীমান্ত বিরোধ অনেক পুরনো ইস্যু।আমাদের মনে আছে,সর্বশেষ ২০১৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে দোকালাম সীমান্ত ইস্যুতে চরম বিরোধে জড়িয়েছিল উক্ত দুই দেশ।উত্তেজনাকর পরিস্থিতির পারদ এতটাই উপরে উঠেছিল যেন যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী।
অবশ্য জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলের মধ্যস্ততায় সেই যাত্রায় যুদ্ধ দেখতে হয়নি বিশ্ববাসীকে।পারস্পরিক অবিশ্বাস আর আজন্ম প্রতিদ্ব›দ্বী পরমানু শক্তিধর দেশদুটির মধ্যে অমীমাংশিত সীমান্ত ইস্যুতে যুদ্ধংদেহী মনোভাব মজ্জাগত।ভারত মহাসাগরে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা,সামরিক-অর্থনৈতিক উচ্চাশা চরিতার্থে ও এশিয়ায় একক আধিপত্য কায়েমে উভয়দেশ সবসময় মরিয়া।সাপে-নেউলের কূটনৈতিক সম্পর্কহেতু চীন-ভারত সীমান্তে প্রায় সময়েই উত্তেজনার কারনে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।তবে বেশিরভাগ সময়ে গুলির জবাবে প্রতিকী প্রতিবাদ স্বরুপ পাল্টা গুলির ঘটনায় প্রাণহানীর ঘটনা না ঘটলেও এবার সহিংস সংঘর্ষে নিহত হওয়ার ঘটনাটি ব্যতিক্রম।এমন মর্মান্তিক-বিয়োগান্তক ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্ক কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা অনুমান করা মুশকিল।তবে একথা বলা যায় ,প্রাণঘাতি ও রক্তক্ষয়ী উক্ত সংঘর্ষ দুই দেশের শীতল কূটনৈতিক সম্পর্ককে যে আরো তীব্রতরো শীতল করবে তা বলাইবাহুল্য।
যাইহোক করোনা যুদ্ধকালীন সময়ে অনাকাঙ্খিত এই যুদ্ধ বাধলে হুমকিতে পড়বে এশিয়ার নিরাপত্তা ও ব্যাহত হবে অর্থনৈতিক অগ্রযাতা।যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বিশ্ব-অর্থনীতিতে ও বিশ্বের অর্ধেক জনসংখ্যা অধ্যুষিত এশিয়ায় বাসকরা মানুষের সামাজিক-অর্থনৈতিক জীবন প্রবাহে।
কেননা বিশ্বায়নের যুগে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে একদেশ আরেক দেশের উপর কোননা কোন ভাবে নির্ভরশীল।চীন-ভারত দ্ব›দ্ব চরমে পৌঁছার নেপথ্যে কতিপয় কারন জড়িত।২০১৪ জানুয়ারী মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ভারত সফরে বেশ কিছু ঐতিহাসিক চূক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ায় চীন যারপরনাই অসন্তুষ্ট।বিশেষ করে ভারতের সাথে ওবামা সরকারের ১০ বছর মেয়াদি যে সামরিক চুক্তিটি করেছিলেন,সেটি চীন এর আগে ওবামা প্রশাসনকে প্রস্তাব দিলেও সাড়া পায়নি।আবার গেল বছরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প ভারত সফরে এসে ৫ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে।উক্ত অর্থের সমপরিমান অস্ত্র ও সামরিক রসদ ভারতকে সরবরাহ করবে যুক্তরাষ্ট্র।ভারতের লক্ষ্য আগামী দু’দশকের মধ্যে সামরিক শক্তিতে চীনের সমকক্ষ হতে যা চীন কখনই চায় না।
পরিবর্তিত বিশ্ব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের এশীয় নীতিতে ভারত একটি বড় অংশ দখল করে আছে।কেননা এশীয়ার চীন,উওর কোরিয়া এমনকি চিরপ্রতিদ্ব›দ্বী রাশিয়াকে নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি করতে হলে গণতান্ত্রিক ভারতের বন্ধুত্ব আমেরিকার চাইই চাই।আবার নিজ দেশকে চীন ও পাকিস্তানের হাত থেকে নিরাপদ রাখতে ভারতও চায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ঘনিষ্ট মিত্র হতে।এলক্ষ্যে ত্রি-দেশীয় অনেকগুলো সামরিক ও অর্থনৈতিক চুক্তি ইতোমধ্যেই সম্পাদিত হয়ে বাস্তবায়ন চলমান রয়েছে।যা মোটেই ভাল ভাবে নিতে পারেনি চীন।
অপরদিকে বঙ্গোপসাগরে চীনের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি,১ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে চীন কর্তৃক নির্মিত গাওদার সমূদ্রবন্দর নির্মাণ এবং সেখানে নৌঘাটি স্থাপন ভারতের জন্য বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে।২০১২ সালের ৩১ মে “টাইমস্ অব ইন্ডিয়ার অনলাইনে”প্রকাশিত সংবাদ,যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গোপসাগরে একটি নৌ-ঘাঁটি স্থাপন করতে চায়।কেননা ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের নৌ-বাহিনীর প্রভাব বৃদ্ধি আমেরিকার স্বার্থকে আঘাত করতে পারে। যাইহোক,চীনের রাশিয়ানীতি আর ভারতের মার্কিননীতি শেষ পর্যন্ত এশিয়ার অব্যাহত শান্তি ও নিরাপওা টিকিয়ে রাখতে পারবে কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়।তবে আমরা চাই চীন-ভারতের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কূটনৈতিক সমাধানের মাধ্যমেই সংহত হোক আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা।
লেখকঃ
সভাপতি,জেলা প্রেসক্লাব,ঠাকুরগাঁও।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
