করোনাভাইরাসের কারণে পৌনে ৫ মাসের ছুটিতে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত এক বছরের সেশনজট তৈরি হতে পারে। এই জট নিরসনে দুটি কৌশল নেয়ার কথা ভাবছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। একটি চলতি সেমিস্টারের পরীক্ষা ব্যাচ ধরে নিয়ে পরের সেমিস্টারে তুলে রাখা। আরেকটি অনলাইনে পরের সেমিস্টারের শ্রেণি-কার্যক্রম অব্যাহত রাখা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিষয়টি চিন্তার পর্যায়ে আছে। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের নিয়ে বৈঠকে উত্থাপন করা হবে। তারা সম্মতি জানালে বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে। আগামী ২৫ জুন ভিসিদের নিয়ে ওই বৈঠক ডাকা হয়েছে।
অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের সেশন রক্ষায় ৮৫ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চলতি সেমিস্টারের পরীক্ষা নেয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে পরবর্তী সেমিস্টারের ক্লাস শুরু হবে ১ জুলাই।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ বলেন, সেশনজটের অভিজ্ঞতা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আছে। কী করে মোকাবেলা করতে হবে তা সংশ্লিষ্টরা ভালো জানেন। আমাদের সঙ্গে শুধু অবহিত আর সম্মতির সম্পর্ক। সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করবেন সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল, ডিনস কমিটি ও সিন্ডিকেট। আমাদের চিন্তা ভিসিদের বলব। আগামী ২৫ জুন তাদের সঙ্গে কথা হবে।
গত ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ আছে বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সর্বশেষ সোমবার এক ঘোষণায় আগামী ৬ আগস্ট পর্যন্ত ছুটি বাড়ানো হয়েছে।
উচ্চশিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পৌনে ৫ মাসের ছুটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯ মাস থেকে এক বছরের সেশনজট তৈরি হতে পারে। এই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্লাস নিতে পারেনি। ছয় মাসের সেমিস্টার হওয়ায় পাঠ্যক্রম শেষ করা তো দূরের কথা, অর্ধেকও এগোয়নি। ফলে পরীক্ষা গ্রহণ কোন প্রক্রিয়ায় হবে সেটা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতীতে বিশ্ববিদ্যালয় এক-দুই মাস বন্ধ রাখা এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতে সেশনজট মোকাবেলার অভিজ্ঞতা আছে। এমন ক্ষেত্রে সাপ্তাহিক ছুটি কমিয়ে ও অতিরিক্ত ক্লাস নিয়ে ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার চর্চা আছে। এমন ঘটনায় সেশনজট নিরসন হয়ে যায়। কিন্তু বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সেশনজট অনিবার্য হয়ে গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৬ আগস্টের পর যদি আর ছুটি নাও বাড়ে তবু ৯ মাস থেকে ১ বছরের সেশনজট হবে। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রলম্বিত হবে বিদ্যমান সেমিস্টার। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অক্টোবর-নভেম্বরে নতুন সেমিস্টার শুরু করা যাবে।
তবে বিকল্প প্রস্তাব আছে। সেমিস্টার বা সেশনে নির্ধারিত সিলেবাস শেষ না হলে যতটা পড়ানো হয় তার ওপর পরীক্ষা নেয়ার দৃষ্টান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের আছে। সেই হিসাবে মার্চ পর্যন্ত কোর্সের যা পড়ানো হয়েছে তার ওপর পরীক্ষা নেয়া যায়।
ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. দিল আফরোজা বেগম বলেন, চলতি সেমিস্টারের শিক্ষার্থীদের ব্যাচভিত্তিক পরীক্ষা নেয়া যায়। যেমন: প্রথম বর্ষের সব শিক্ষার্থীকে এনে পরীক্ষা নেয়া হবে। এক কক্ষে সর্বোচ্চ দু’জন থাকবে। তাদের বিদায় দিয়ে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রছাত্রীদের ডাকা হবে। একই প্রক্রিয়ায় তারা পরীক্ষা দেবে। এভাবে আলাদাভাবে মাস্টার্স পর্যন্ত পরীক্ষা নেয়া যায়। শিক্ষার্থীদের বাড়ি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসেই আনানেয়া করা হবে।
তিনি বলেন, ক্লাসের ব্যাপারে আমরা অনলাইন সমীক্ষা চালিয়েছি। যদি ছুটি আরও দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে এ ব্যাপারে চিন্তা করা যেতে পারে। তবে সব শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের যেহেতু সামর্থ্য নেই তাই এটা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
জানা গেছে, ছুটি দীর্ঘায়িত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাস নিয়ে আলোচনা চলছে। এর অংশ হিসেবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইনে ক্লাসের অনুমতি দেয়া হয়েছে। নতুন সেমিস্টারে ভর্তি চলছে। ১ জুলাই থেকে ক্লাস শুরু হওয়ার কথা। আর ৮৫ বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষার অনুমতি নিয়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়কে তিন গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে। বাকি ১১ বিশ্ববিদ্যালয় কোনো অনুমতি নেয়নি।
অপরদিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পুরোপুরি বন্ধ আছে। সাধারণ ছুটি শুরুর পর কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইনে ক্লাস নিলেও স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস অনলাইনে কার্যক্রম চালাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি কার্যক্রম শুরু করেও বেশিদূর এগোতে পারেনি। এর পেছনে নানা কারণের অন্যতম শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের তথ্য-প্রযুক্তি সামগ্রীর ঘাটতি। বিষয়টি এক সমীক্ষায়ও উঠে এসেছে।
ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক দিল আফরোজা বেগম বলেন, সমীক্ষায় অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের প্রায় ৮৬ দশমিক ৬ শতাংশের স্মার্টফোন আছে। ৫৫ শতাংশের ল্যাপটপ আছে। অপরদিকে সব শিক্ষকের ল্যাপটপ আছে। কিন্তু ক্লাস নেয়ার ক্ষেত্রে ইন্টারনেট খরচ, দুর্বল নেটওয়ার্কসহ বেশ কয়েকটি সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে।
তিনি বলেন, সমীক্ষা অনুযায়ী, ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর ক্লাস করার উপযোগী ইন্টারনেট সংযোগ নেই। আর ৮২ শতাংশ শিক্ষার্থী মনে করেন, অনলাইনে ক্লাসরুম সত্যিকার ক্লাসরুমের মতো নয়।
এই নীতিনির্ধারক আরও বলেন, আমরা ৭২টি প্রশ্ন দিয়েছি। ১৫ দিনে ৪ হাজার শিক্ষার্থী ও ৭০০ শিক্ষক অংশ নেন। তার মতে, অনলাইন ক্লাস শুরু করা যায়। এখানে সদিচ্ছাই প্রধান। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পারলে সরকারি কেন পারবে না?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান বলেন, অনলাইন ক্লাস কীভাবে নেয়া যায়, সেই নীতি তৈরির জন্য একটি কমিটি কাজ করছে। এ বিষয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নেব। তবে অনলাইনে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ও আগ্রহ কম। এটা মহামারী কাল। কে কোন অবস্থায় আছে আমরা জানি না। মহামারী প্রতিরোধ এখন অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ধনী-গরিব শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করেন। তাদের অনেকেরই ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহারের সুযোগ ও সামর্থ্য নেই। যেটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সমস্যা কম। এ বিষয়টাও বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নাম প্রকাশ না করে জানিয়েছেন, মানবিক ও বাণিজ্যের বেশকিছু বিষয়ে অনলাইনে পড়ানো তুলনামূলক সহজ। কিন্তু বিজ্ঞানের বিষয়গুলো অনলাইনে পড়ানো প্রায় অসম্ভব। কেননা, শ্রেণি-কার্যক্রমের সঙ্গে ল্যাবরেটরির কাজ থাকে। এরপরও ইন্টারনেটসহ প্রযুক্তিগত অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত হওয়া গেলে আলোচনা করে অনলাইনে ক্লাসের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া যায়।
ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক দিল আফরোজা বেগম বলেন, বিডিরেন প্রকল্পের সঙ্গে সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সংযুক্ত। এতে আগে একসঙ্গে ৫ হাজার ক্লাস নেয়া যেত। করোনাকালে সার্ভিস দেয়ার জন্য সেটার সক্ষমতা দ্বিগুণ করা হয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন বলেন, করোনাকালের এ পরিস্থিতিতে উচ্চশিক্ষার ক্ষতি পোষাতে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে যার মতো অনলাইন ক্লাস শুরুর চেষ্টা করেছে। এটা চলতে থাকবে। এ ছাড়া বিকল্প ভাবনা আছে। তবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। সূত্রঃ যুগান্তর
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
