এইমাত্র পাওয়া

মহান শিক্ষকের বিদায়-অবসরে চলে গেলেন আমাদের বিরাজ স্যার

কবির খান বিপ্লব:

“জিলা স্কুলে গিয়েছিলাম সাতজন শিক্ষার্থী নিয়ে, লাঞ্চের পূর্বেই ফিরার কথা থাকলেও ফলাফল দিতে দেরি হবে তাই বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে আমাদের। স্যারকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, স্যার, মেয়েদেরকে নিয়ে কোথায় লাঞ্চ করি বলেন তো? ওনি উত্তর দিলেন, কান্দিরপাড় থেকে রাজগঞ্জের ডায়না পর্যন্ত সবচেয়ে ভাল হোটেল যেইটা সেইটাতে। কমদামি হোটেলে খাওয়ালে শিক্ষার্থীদের মন ছোট হয়ে যাবে।

আপনিও খাওয়ান, আমরা আছিত। স্কুলের নারী শিক্ষার্থীদের ক্রিকেট টিম গঠন করলাম, কয়েকদিন প্রশিক্ষণের পর প্রতিযোগিতার জন্য সরঞ্জাম লাগবে, প্রধান শিক্ষক স্যার সভাপতি মহোদয়ের অনুমতি ছাড়া দিতে পারবেন না। ততোক্ষণ আমার রা দেরি হয়ে যাবে, স্যারকে বললাম। স্যার বললেন, কিনে ফেলেন। সবচেয়ে দামিটা কিনেন, টাকা আমি দিব। নয় বছরের চাকুরিতে এই রকম অজস্র সমস্যা উত্থাপন ও সমাধান যার উছিলায় হলো-ওনি আমাদের বিরাজ স্যার।”

বিরাজ কুমার ভট্টাচার্য্য, সহকারি শিক্ষক, বুড়িচং কালী নারায়ণ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, বুড়িচং, কুমিল্লা। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ওনার আরও একটি পরিচয় আছে, অত্র বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা স্বর্গীয় বাবু কালী নারায়ণ ভট্টাচার্য্যের সন্তান ওনি। স্কুলের সূচনালগ্ন বা তার কিছুদিন পর থেকে অদ্য 14 জুন 2020 পর্যন্ত একজন শিক্ষক হিসেবে স্কুলের প্রয়োজনে পাশে ছিলেন সদা জাগ্রত চৌকস সেনাবাহিনীর মতো।

আমার চাকুরি জীবনের এই ৯ বছরে ওনাকে দেখেছি একজন আলাপপ্রিয়, বন্ধুবৎসল ও অভিভাবক হিসেবে। আমি জানতামনা ওনি প্রতিষ্ঠাতার ছেলে। স্কুলে যাই, ওনি ওনার সময়ের কলীগদের সাথে আমাকে নিয়ে বসেন, গল্প করেন, কোন সমস্যায় পড়লে, ওনাকে বললে তাৎক্ষণিক সমাধান করে দিতেন অথবা চেষ্টা করতেন। ধীরে ধীরে জানলাম ওনার আসল পরিচয়। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য খারাপ? চিকিৎসার ব্যাপারে উদ্যোগ নিতেন, শিক্ষার্থীর আর্থিক সমস্যা? পকেট থেকে টাকা দেওয়া অথবা স্কুলের পক্ষ থেকে ছাড় নিয়ে দিতেন। কোন শিক্ষকের সমস্যা? ঢাল হয়ে সামনে এসে দাড়াতেন।

কলিগদের বিভিন্ন সময়ের উত্তেজিত মুহূর্ত, প্রধান শিক্ষক বা সভাপতি মহোদয় কারো প্রতি নাখোশ! ওনি ঐ শিক্ষককে নিয়ে সামনে দাড়িয়ে শিক্ষকের হয়ে ক্ষমা চেয়ে মিমাংসা করে দিতেন। ক্ষেত্র বিশেষ, পর্দার আড়ালে থেকে কৌশল বাতলে দিতেন। স্কুলের কোন খাতের উন্নতির জন্য বরাদ্দ দরকার? ওনি মধ্যস্ততা করে এটার গুরুত্ব তুলে ধরে বরাদ্দের ব্যবস্থা করতেন। শিক্ষক, স্টাফ, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সামাজিক ভাবে স্কুলের প্রধান শিক্ষকসহ আমাদের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাবে নৈতিক সমর্থন ও উৎসাহ যুগিয়ে পুরো স্টাফকে চাঙ্গা রাখার দায়িত্বটা বোধ হয় ওনার একার কাঁধেই ছিল।

ওনার প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা ও উপস্থিত সুচিন্তিত বুদ্ধিগুলো, বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্তগুলো আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করেছে খুব, খুব, খুব বেশি।

আজ, কোভিড-১৯ বা মহামারি করোনার তান্ডবে সারা বিশ্ব যখন স্তদ্ধ ঠিক সেই সময়ে ক্যালেন্ডারের পাতা গুনা শেষ করে আমরা যখন হাতের আঙ্গুলের কড়া গুনছিলাম তখন জুন ১৪, ২০২০ ওনার কর্ম জীবনের এক বর্ণিল অধ্যায়ের সফল সমাপ্তি করলেন। স্কুল বঞ্চিত হলো একজন গুণী শিক্ষক, একজন পরামর্শক ও একজন যোগ্য অভিভাবককের অভিভাবকত্ব থেকে।

ওনাকে একবার, দুইবার নয় বহুজনে বহুবার অনুরোধ করেছিলাম ‘আজকের দিনে স্কুলে আসুন, আপনার শেষ কর্ম দিবসটি আমরা রাঙ্গিয়ে রাখতে চাই।’ ওনার এক কথা, না। প্রশ্ন করলাম, কেন স্যার? ওনি বললেন, এই পরিস্থিতিতে আমার কারনে সকল শিক্ষক স্কুলে গিয়ে কস্ট ভোগ করবে এইটা আমার ভাল লাগবেনা। আপনি আসলে ভাল লাগত, আসেন নাই, আমাদের ভাল লাগে নাই। বিশেষত: আপনি আমাদের ভালবাসার একজন। আপনার ভাল লাগা আর ভাল থাকার মূল্য আমাদের কাছে আছে, ইনশাল্লাহ, দেখা হবে একবার, দুইবার, বার বার, বারবার। মহান স্রষ্টার ইচ্ছায় আপনি ভাল থাকুন, আপনার অবসরোত্তর সুস্থ্য ও কল্যাণময় জীবন কামনা করছি।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.