নিজস্ব প্রতিবেদক:
বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) থেকে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে দেশের বিভিন্ন কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগ দেন প্রায় ১১শ শিক্ষক। দায়িত্ব পালন শুরু করলেও তাদের বেতন কার্যকর হয় তিন মাস পর—ডিসেম্বর থেকে। ফলে যোগদানের পর প্রথম তিন মাসের বেতন থেকে এখনো বঞ্চিত রয়েছেন তারা।
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীন এসব শিক্ষক ষষ্ঠ গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োগ পান। দীর্ঘদিন অপেক্ষা, দফায় দফায় দপ্তরে যোগাযোগ, এমনকি আন্দোলন করেও তারা এখনো বকেয়া বেতনের কোনো সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা পাননি। এতে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
শিক্ষকদের অভিযোগ, একই সময়ে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা শাখায় নিয়োগপ্রাপ্তরা নিয়মিত বেতন পেলেও কারিগরি শাখায় অযৌক্তিক বিলম্ব করা হয়েছে। তাদের দাবি—এটি স্পষ্ট বৈষম্য।
🔹 এমপিও জটিলতায় বেতন বন্ধ
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অধিকাংশ শিক্ষক ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন এবং দ্রুতই এমপিওভুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেন। কিন্তু নানা প্রশাসনিক জটিলতা ও ম্যানুয়াল প্রক্রিয়ার কারণে তাদের এমপিও কার্যকর করা হয় ডিসেম্বর থেকে। এতে সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর—এই তিন মাস তারা বিনা বেতনে কাজ করতে বাধ্য হন।
শিক্ষকদের দাবি, অধিদপ্তরের ধীরগতি ও ফাইল জটের কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তারা প্রশ্ন তুলেছেন—যেখানে একই মন্ত্রণালয়ের অন্য অধিদপ্তরগুলো দ্রুত বেতন কার্যকর করতে সক্ষম, সেখানে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর কেন ব্যর্থ?
🔹 পুরোনো সমস্যার পুনরাবৃত্তি
এটি নতুন কোনো ঘটনা নয় বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। পূর্ববর্তী গণবিজ্ঞপ্তিগুলোতেও একই ধরনের অভিযোগ ছিল। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকরা ৫ থেকে ৭ মাস পর্যন্ত বেতন ছাড়াই কাজ করেছেন।
একজন শিক্ষক জানান, “আমরা আন্দোলন করে কিছুটা সুবিধা পেলেও প্রথম দুই মাসের বেতন থেকে বঞ্চিত হয়েছি। এটি এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অন্যায়।”
🔹 মানববন্ধনেও মিলেনি সমাধান
গত ১২ এপ্রিল বকেয়া বেতনের দাবিতে সারা দেশ থেকে এসে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের সামনে মানববন্ধন করেন শিক্ষকরা। সেখানে তারা জানান, যোগদানের পর ধার-দেনা করে জীবনযাপন করতে হয়েছে। এখনো সেই ঋণের বোঝা টানছেন অনেকেই।
এক নারী শিক্ষক বলেন, “শিক্ষকতা পেশাকে সম্মানজনক ভেবেছিলাম, কিন্তু এখানে এসে দেখলাম অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নেই।”
🔹 তথ্যেই স্পষ্ট বঞ্চনার চিত্র
অধিদপ্তরের অফিস আদেশ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বহু শিক্ষকের ক্ষেত্রে যোগদান ও এমপিও কার্যকরের মধ্যে ৩ থেকে ১১ মাস পর্যন্ত ব্যবধান রয়েছে। নীতিমালার শর্ত অনুযায়ী এমপিও কার্যকর হওয়ার আগের সময়ের বেতন তোলার সুযোগও রাখা হয়নি, ফলে বকেয়া পাওয়ার পথ কার্যত বন্ধ।
🔹 কর্তৃপক্ষের নীরবতা
এ বিষয়ে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে বক্তব্য দেননি। একাধিকবার ফোন ও বার্তা পাঠিয়েও সাড়া মেলেনি।
🔹 সরকারের আশ্বাস
কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. দাউদ মিয়া জানান, এমপিও প্রক্রিয়ার জটিলতার কারণেই এই বিলম্ব হচ্ছে। তিনি বলেন, “ধীরে ধীরে পুরো প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল ব্যবস্থায় আনা হচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে এই ধরনের সমস্যা কমে আসবে।”
তিনি আরও আশ্বস্ত করেন, নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষকরা যোগদানের তারিখ থেকেই বেতন পাওয়ার অধিকার রাখেন এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
🔹 প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা
শিক্ষামন্ত্রীর “ঘাম শুকানোর আগে পারিশ্রমিক” দেওয়ার নীতিগত বক্তব্যের পরও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না—এমন অভিযোগ শিক্ষকদের। প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবায়নের অভাবে তারা এখনো বকেয়া বেতনের অপেক্ষায়।
কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নে যাদের ওপর দায়িত্ব, সেই শিক্ষকরাই যদি মাসের পর মাস বেতনহীন থাকেন—তবে এই খাতের টেকসই উন্নয়ন কতটা সম্ভব, সেই প্রশ্নই এখন সামনে আসছে।
শিক্ষাবার্তা /এ/ ১৯/০৪/২০২৬
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
