নিজস্ব প্রতিবেদক।।
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এবং ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব মোকাবিলায় রাজধানী ঢাকার কিছু নির্বাচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন ও সশরীরে উপস্থিতির সমন্বয়ে (ব্লেন্ডেড) শ্রেণিকার্যক্রম চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ সিদ্ধান্তকে ‘মন্দের ভালো’ হিসেবে দেখছেন শিক্ষক ও শিক্ষাবিদরা, তবে বাস্তবায়নে সুস্পষ্ট নির্দেশনা ও সতর্কতার তাগিদও দিচ্ছেন তারা।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষা ও প্রাথমিক গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি বলেন, পরীক্ষামূলকভাবে কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ পদ্ধতি চালু করা হবে, যেখানে সপ্তাহের তিন দিন অনলাইন এবং তিন দিন সশরীরে ক্লাস অনুষ্ঠিত হবে।
মন্ত্রী জানান, রবি, মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার অনলাইন ক্লাস এবং শনি, সোম ও বুধবার শিক্ষার্থীরা সরাসরি শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থাকবে। তবে এই পদ্ধতি সবার জন্য বাধ্যতামূলক নয়; শুধুমাত্র যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা রয়েছে, সেগুলোতেই এটি চালু করা হবে। শিক্ষকদের স্কুলে উপস্থিত থেকে অনলাইন ক্লাস নেওয়ার নির্দেশনাও দেন তিনি।
শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, সারাদেশে একযোগে অনলাইন শিক্ষা চালুর পরিবর্তে সীমিত পরিসরে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করাই বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, “সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একসঙ্গে অনলাইন ক্লাস চালু করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যেত না। পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করে ফলাফল দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়াই যুক্তিযুক্ত।”
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. আজম খানও একই মত প্রকাশ করে বলেন, দেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্লেন্ডেড শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা সম্ভব নয়। তিনি মনে করেন, শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুযোগের বৈষম্য বিবেচনায় নিয়েই নীতিনির্ধারণ করা উচিত।
তবে শিক্ষকদের একটি অংশ বলছেন, মিশ্র পদ্ধতিতে ক্লাস পরিচালনার জন্য এখনো পরিষ্কার নির্দেশনা না থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান দ্বিধায় রয়েছে। মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক শাহীনা কবির বলেন, “অনলাইনে ক্লাস কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটি স্পষ্ট না হলে অনেক প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখাবে না।”
বিশেষ করে আসন্ন এসএসসি পরীক্ষা সামনে রেখে কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত স্কুলগুলোতে অনলাইন ক্লাস কীভাবে চলবে, সে বিষয়েও নির্দিষ্ট নির্দেশনার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষকরা।
মিশ্র পদ্ধতিতে ক্লাস চালু হলে শিক্ষকদের সপ্তাহে ছয় দিন স্কুলে উপস্থিত থাকতে হবে—এমন আশঙ্কাও উঠেছে। বাংলাদেশ প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সমাজের সভাপতি শাহিনুর আল আমিন বলেন, “অফলাইনে ক্লাস নেওয়া শিক্ষকরা যদি পাঁচ দিন কাজ করেন, আর অনলাইন ক্লাসের জন্য ছয় দিন উপস্থিত থাকতে হয়—তাহলে অনেকেই অনলাইন ক্লাস নিতে অনাগ্রহী হতে পারেন।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এই কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, সেগুলোর শিক্ষক ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা আগে যাচাই করা জরুরি। রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দুলাল চন্দ্র চৌধুরী বলেন, “সব শিক্ষকের অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার দক্ষতা আছে কি না, সেটি নিশ্চিত না হলে কার্যক্রম সফল হবে না।”
অনলাইন ক্লাসের আরেকটি নেতিবাচক দিক হিসেবে সামনে এসেছে শিক্ষার্থীদের ডিভাইস নির্ভরতা বা আসক্তির ঝুঁকি। দুলাল চন্দ্র চৌধুরী বলেন, “অনলাইন ক্লাসের কারণে শিশুদের হাতে বেশি সময় ডিভাইস থাকলে আসক্তি বাড়তে পারে, যা অভিভাবকদের জন্যও উদ্বেগের বিষয়।”
শিক্ষামন্ত্রী নিজেও শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখতে নজরদারির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
রোজা ও ঈদের দীর্ঘ ছুটির পর গত ২৯ মার্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললেও বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে সম্ভাব্য জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজছে। এর অংশ হিসেবেই শিক্ষাখাতে এই ব্লেন্ডেড পদ্ধতির সূচনা।
সব মিলিয়ে, জ্বালানি সাশ্রয় ও শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সরকারের এই উদ্যোগকে আপাতত ‘মন্দের ভালো’ হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, সুস্পষ্ট নির্দেশনা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপর।
শিক্ষাবার্তা /এ/ ১০ /০৪/২০২৬
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
