এইমাত্র পাওয়া

খেলাপি ঋণের ফাঁদে ব্যাংকিং খাত

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

দেশের ব্যাংকিং খাত এখন এক গভীর আর্থিক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ দেশের আর্থিক খাতের ভিতকে দুর্বল করে তুলেছে। ব্যাংকগুলোর মূলধন সক্ষমতা, তারল্য ব্যবস্থাপনা, নতুন ঋণ বিতরণ এবং আমানতকারীদের আস্থায় এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি শুধু কিছু ঋণ অনাদায়ের ঘটনা নয় বরং দীর্ঘদিনের দুর্বল সুশাসন, রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ন্ত্রিত ঋণ বিতরণ এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের দৌরাত্ম্যের ফল।

খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যেসব খাতে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও লুটপাট হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম খাত হলো দেশের ব্যাংকিং খাত। হলমার্ক, বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি থেকে দেশের ইসলামী ব্যাংকগুলো থেকে কিছু লুটেরা শ্রেণীর মাধ্যমে লুটপাট সবই ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। সবই ছিল দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করার মিশন। আর এ কারণেই লুটেরা এস আলম, সালমান এফ রহমান, নজরুল ইসলাম মজুমদারসহ এক ধরনের বর্গী শ্রেণী তৈরি করা হয়েছিল রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তির প্ররোচনায়।

তিলে তিলে গড়ে ওঠা দেশের অন্যতম বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংককে মাত্র ছয়-সাত বছরে পঙ্গু করে দেয়ার উপক্রম করা হয়। এ সময়ে এস আলম নামক বিতর্কিত ব্যবসায়ী প্রায় সোয়া লাখ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। সবমিলে ১৩টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সোয়া দুই লাখ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ একাধিক তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদন অনুসারে বেশির ভাগ অর্থই দেশের বাইরে পাচার করা হয়েছে। এসব বিতর্কিত ব্যবসায়ীরা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আর ফেরত দিচ্ছে না। যার প্রভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৩৫ শতাংশ, যদিও বড় অঙ্কের অর্থ নবায়ন হওয়ায় ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার কিছুটা কমে এসেছে।বাংলাদেশ সংবাদ বিশ্লেষণ

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় দায় ইচ্ছাকৃত বড় ঋণগ্রহীতা গোষ্ঠীর। প্রভাবশালী কিছু ব্যবসায়ী ও করপোরেট প্রতিষ্ঠান বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করেনি। অনেক ক্ষেত্রে ঋণের অর্থ নির্ধারিত প্রকল্পে বিনিয়োগ না করে অন্য খাতে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে অর্থ বিদেশে পাচার কিংবা ব্যক্তিগত সম্পদ গঠনে ব্যবহার করা হয়েছে। তবু বছরের পর বছর পুনঃতফসিল, সুদ মওকুফ ও নতুন ঋণের মাধ্যমে পুরনো দায় আড়াল করার সুযোগ পেয়েছে তারা।

ব্যাংকিং খাতের আরেক বড় দুর্বলতা হলো পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা। ঝুঁকি বিশ্লেষণ ছাড়াই বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদন, স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ঋণ বিতরণ এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, করপোরেট গভর্ন্যান্স দুর্বল হওয়ায় অনেক ব্যাংকে বোর্ড পর্যায়ের সিদ্ধান্তই খেলাপি ঋণের প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে।

রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টিও সামনে এসেছে বারবার। বিশ্লেষকদের মতে, প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সুপারিশে অযোগ্য প্রতিষ্ঠানও বড় অঙ্কের ঋণ পেয়েছে। খেলাপি হওয়ার পরও তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বরং বিশেষ সুবিধা ও পুনঃতফসিলের মাধ্যমে দায় দীর্ঘায়িত করা হয়েছে। এতে এক ধরনের দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে বড় খেলাপিরা ধরে নিয়েছে-ঋণ না পরিশোধ করলেও শেষ পর্যন্ত রক্ষা পাওয়া সম্ভব।Politics

বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতাও সমালোচনার মুখে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব ব্যাংকগুলোর ঋণঝুঁকি, সম্পদ মান ও আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে দুর্বল নজরদারি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেয়ায় প্রকৃত চিত্র আড়ালেই ছিল। এখন কঠোর শ্রেণিকরণ নীতির ফলে বাস্তব খেলাপি ঋণের পরিমাণ সামনে আসছে।

অর্থঋণ আদালত ও পুনরুদ্ধার কাঠামোর ধীরগতিও পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করেছে। অনেক মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকায় ব্যাংকগুলো জামানত বিক্রি করে অর্থ ফেরত আনতে পারছে না। ফলে খেলাপি ঋণ জমে থেকে ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

অন্য দিকে অর্থনৈতিক বাস্তবতাও একটি কারণ। উচ্চ সুদহার, ডলার সঙ্কট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি ও বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে প্রকৃত ব্যবসায়ীরাও চাপে পড়েছেন। ফলে কিছু খেলাপি ঋণ অনিচ্ছাকৃতভাবেও তৈরি হয়েছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় নানা ধরনের প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতিতে। খেলাপি ঋণ আদায় না হওয়ায় ব্যাংকগুলো কাক্সিক্ষত হারে নতুন ঋণ বিতরণ করতে পারছে না। এতে শিল্প বিনিয়োগে ধীরগতি হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে সরাসরি কর্মক্ষেত্রে। কারণ প্রতি বছর দেশের শ্রম বাজারে ২০ থেকে ২৫ লাখ নতুন মুখ কর্মক্ষেত্রে আসছে। কিন্তু এ হারে নতুন কলকারখানা হচ্ছে না। এতে বেড়ে যাচ্ছে প্রকৃত বেকারত্বের হার। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ আদায় না হওয়ায় ব্যাংকগুলোর মুনাফা কমে যাচ্ছে। এতে ব্যাংকগুলো সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বছর শেষে লভ্যাংশ দিতে পারছে না। অনেক ব্যাংক আমানতকারীদেরও টাকা ফেরত দিতে পারছে না। এতে আস্থার সঙ্কট দেখা দিয়েছে আমানতকারীদের। সবমিলেই সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সঙ্কট মোকাবেলায় এখনই কঠোর সংস্কার জরুরি। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা, ব্যাংক পরিচালনায় সুশাসন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ঋণ অনুমোদন ব্যবস্থা ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা-খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে সামনে আরো বড় আর্থিক অস্থিরতার ঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে।

শিক্ষাবার্তা /এ/০২/০৪/২০২৬

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.