।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান ।।
সকাল আটটা। শহরের এক কোণে পুরনো একটা স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে রাশেদ। সদ্য নিয়োগ পাওয়া এক তরুণ শিক্ষক। হাতে ছোট একটা ব্যাগ, ভেতরে কিছু বই আর অল্প কিছু স্বপ্ন। মাসিক বেতন ১২,৫০০ টাকা।
প্রথম দিন স্কুলে ঢোকার সময় তার চোখে ছিল উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশা—শিক্ষক হবে, মানুষ গড়বে, সমাজ বদলাবে। কিন্তু স্কুলের গেট পেরোনোর আগেই পাশের ফুটপাতে চোখ পড়তেই সে থমকে যায়। সেখানে একজন ভ্যানচালক নাস্তা করছে—পরোটা আর ডাল। রাশেদের মনে হঠাৎ হিসাব চলে আসে—এই টাকায় কি সে মাসের শেষে নিজের জন্য ঠিকমতো খাবার জোগাড় করতে পারবে?
কয়েক মাস পরের দৃশ্যটা একেবারেই আলাদা। সেই রাশেদ এখন ক্লান্ত, চোখের নিচে কালি, মাথায় চিন্তার ভাঁজ। স্কুল শেষে সে ছুটে যায় কোচিংয়ে। রাত ১০টা পর্যন্ত পড়ায়। তারপর বাসায় ফিরে হিসাব মেলায়—বাড়ি ভাড়া, খাবার, যাতায়াত, পরিবারের খরচ।
তবুও হিসাব মেলে না। অথচ কোথাও থেকে ভেসে আসে নির্দেশ—“শিক্ষকদের কোচিং বন্ধ করতে হবে।” রাশেদ হেসে ওঠে—এটা কি কৌতুক, নাকি বাস্তব?
এই গল্পটা শুধু রাশেদের নয়; দেশের হাজার হাজার বেসরকারি শিক্ষকের বাস্তবতা।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় অংশ দাঁড়িয়ে আছে বেসরকারি স্কুল-কলেজের ওপর। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষকরা শিক্ষার মূল চালিকাশক্তি হলেও তাদের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থান অত্যন্ত দুর্বল।
একজন নতুন শিক্ষক যখন মাত্র ১২,৫০০ টাকায় চাকরি শুরু করেন, তখন সেটি শুধু একটি সংখ্যা নয়—এটি একটি কঠিন বাস্তবতার প্রতীক।
বর্তমান দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রেক্ষাপটে এই বেতন দিয়ে জীবনযাপন প্রায় অসম্ভব। শহরের একটি সাধারণ বাসার ভাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, চিকিৎসা, যাতায়াত—সব মিলিয়ে মাসের পাঁচ দিনের মধ্যেই সেই টাকা শেষ হয়ে যায়। এমনকি ফুটপাতে বসবাস করাও এই আয়ে সম্ভব নয়—এটি কোনো অতিরঞ্জন নয়, বরং বাস্তবতার নির্মম চিত্র।
এমন অবস্থায় একজন শিক্ষক কীভাবে নিজেকে টিকিয়ে রাখবেন? কীভাবে তিনি শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা দেবেন? কীভাবে তিনি নিজের মর্যাদা বজায় রাখবেন?
অনেকেই মনে করেন, কোচিং শিক্ষাব্যবস্থার একটি নেতিবাচক দিক। এতে শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ হয়। এই যুক্তিগুলো পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—শিক্ষকরা কেন কোচিংয়ের দিকে ঝুঁকছেন?
উত্তরটি খুবই সরল—বেঁচে থাকার জন্য।
যখন একজন শিক্ষক তার মূল বেতনে পরিবার চালাতে পারেন না, তখন তিনি বাধ্য হন অতিরিক্ত আয়ের পথ খুঁজতে। কোচিং তখন আর বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়। এটি তার জন্য একটি বিকল্প নয়, বরং টিকে থাকার একমাত্র উপায়।
এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে যদি বলা হয়—“কোচিং বন্ধ করুন”—তাহলে সেটি বাস্তবতা বিবর্জিত একটি সিদ্ধান্ত ছাড়া আর কিছুই নয়।
সরকারের পক্ষ থেকে কোচিং বন্ধের উদ্যোগকে অনেক সময় শিক্ষার মান উন্নয়নের প্রচেষ্টা হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই উদ্যোগ কি সমস্যার মূল কারণকে স্পর্শ করছে?
শিক্ষার মান নির্ভর করে শিক্ষকের মান, তার মানসিক স্বস্তি, তার আর্থিক নিরাপত্তা এবং সামাজিক মর্যাদার ওপর। একজন শিক্ষক যদি প্রতিদিন অর্থকষ্টে ভোগেন, যদি তিনি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকেন, তাহলে তিনি কীভাবে শিক্ষার্থীদের জন্য সেরাটা দিতে পারবেন?
অন্যদিকে, শিক্ষকতা একটি সম্মানজনক পেশা হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকরা অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার। তাদের বেতন কম, সুযোগ-সুবিধা সীমিত, এবং অনেক সময় সামাজিক মর্যাদাও প্রশ্নবিদ্ধ।
এমন পরিস্থিতিতে কোচিং বন্ধের নির্দেশ অনেকের কাছেই “ফাইজলামি” মনে হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।
একটি রাষ্ট্র যদি সত্যিই শিক্ষার উন্নয়ন চায়, তাহলে তাকে প্রথমেই শিক্ষকদের অবস্থান শক্তিশালী করতে হবে। এর অর্থ শুধু বেতন বৃদ্ধি নয়; বরং একটি সামগ্রিক কাঠামোগত পরিবর্তন।
প্রথমত, শিক্ষকদের জন্য একটি ন্যায্য ও সম্মানজনক বেতন কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। যা দিয়ে তারা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, তাদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, সমাজে শিক্ষকদের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে—যাতে তারা নিজেদের কাজ নিয়ে গর্ববোধ করতে পারেন।
এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত না করে যদি শুধু কোচিং বন্ধের কথা বলা হয়, তাহলে সেটি সমস্যার সমাধান নয়; বরং নতুন সমস্যার সৃষ্টি করবে।
অনেক সময় নীতিনির্ধারকরা এমন সিদ্ধান্ত নেন, যা কাগজে-কলমে ভালো শোনালেও বাস্তবে কার্যকর হয় না। কোচিং বন্ধের সিদ্ধান্তও অনেক ক্ষেত্রে তেমনই একটি উদাহরণ।
যদি সত্যিই কোচিং নির্ভরতা কমাতে হয়, তাহলে প্রথমে স্কুলের পাঠদানকে এতটাই কার্যকর করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সহায়তার প্রয়োজন না পড়ে। আর সেটি করতে হলে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, সময় এবং আর্থিক নিশ্চয়তা দিতে হবে।
দিনের শেষে, প্রশ্নটি খুবই সহজ—
একজন শিক্ষক যদি নিজের জীবন চালাতে না পারেন, তাহলে তিনি কীভাবে অন্যের জীবন গড়বেন?
আবার ফিরে যাই রাশেদের গল্পে। একদিন রাতে কোচিং শেষে বাড়ি ফিরছিল রাশেদ। ক্লান্ত শরীর, মাথায় হাজারো চিন্তা। পথে সেই একই ফুটপাত। সেখানে আজও সেই ভ্যানচালক বসে খাচ্ছে। রাশেদ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর নিজের পকেট থেকে টাকা বের করে দেখে—আজকের আয়, আজকের খরচ, আর আগামীকালের অনিশ্চয়তা।
হঠাৎ তার মনে পড়ে যায়—সেদিন ক্লাসে এক ছাত্র তাকে বলেছিল, “স্যার, আমি বড় হয়ে আপনার মতো শিক্ষক হতে চাই।”
রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করে। তার মুখে এক অদ্ভুত হাসি—কষ্টের, বেদনার, আর এক চিলতে আশার।
সে ভাবে—“যদি কোনোদিন এমন দিন আসে, যখন একজন শিক্ষককে টিকে থাকার জন্য কোচিং করতে না হয়, তখনই হয়তো সত্যিকার অর্থে শিক্ষা মুক্তি পাবে।”
সেই দিনের অপেক্ষায় রাশেদ হাঁটতে থাকে—অন্ধকার রাস্তা ধরে, আলো খোঁজার।
লেখক: যুগ্ম-মহাসচিব
বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটি।
শিক্ষাবার্তা /এ/০৫/০৪/২০২৬
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
