এইমাত্র পাওয়া

গোদাগাড়ী প্রেসক্লাবে তালা: আইনের শাসন নাকি মবতন্ত্রের দাপট?

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান ।।

ভোরের কুয়াশা তখনো পুরোপুরি কাটেনি। ছোট্ট শহরের এক প্রান্তে পুরোনো একটি ভবনের সামনে কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়ে। ভবনের দরজায় ঝুলছে একটি মোটা তালা। একজন প্রবীণ সাংবাদিক, হাতে পুরোনো ডায়েরি আর কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তালাটার দিকে তাকালেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “এই দরজাটা শুধু ইট-সিমেন্টের না, এটা ছিল আমাদের কণ্ঠস্বরের দরজা।” পাশে দাঁড়ানো তরুণ এক সংবাদকর্মী জিজ্ঞেস করল, “স্যার, তাহলে আজ আমরা কোথায় লিখব?”

প্রবীণ সাংবাদিক উত্তর দিলেন না। তিনি শুধু তালাটার দিকে তাকিয়ে রইলেন—যেন বুঝতে চেষ্টা করছেন, এটা কি কেবল একটি তালা, নাকি এর ভেতরে বন্দী হয়ে গেছে পুরো এক সমাজের বিবেক।

গোদাগাড়ী প্রেসক্লাবের সাম্প্রতিক ঘটনাটি নিছক একটি স্থানীয় বিরোধ নয়; এটি আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির গভীরে লুকিয়ে থাকা এক বিপজ্জনক প্রবণতার প্রতিচ্ছবি।

একটি সংগঠন বা গোষ্ঠী, নিজেদের রাজনৈতিক বা নৈতিক অবস্থানকে ‘ন্যায়’ বলে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যখন আইনকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তখন সেটি আর ন্যায়বিচার থাকে না—সেটি হয়ে ওঠে মবতন্ত্র।

প্রেসক্লাব কোনো সাধারণ প্রতিষ্ঠান নয়। এটি শুধু সাংবাদিকদের আড্ডাস্থল নয়, বরং এটি একটি অঞ্চলের মতপ্রকাশের কেন্দ্র, তথ্য বিনিময়ের জায়গা এবং অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করার অন্যতম মাধ্যম। সেখানে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া মানে কেবল একটি দরজা বন্ধ করা নয়; এটি এক ধরনের প্রতীকী বার্তা—“এখানে এখন আর স্বাধীনভাবে কথা বলা যাবে না।”

ঘটনার পেছনে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে—কেউ ‘আওয়ামী লীগের দোসর’—এটি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক পুরোনো এবং বিপজ্জনক অস্ত্র। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে এভাবে তকমা দিয়ে সামাজিকভাবে হেনস্তা করা বা প্রতিষ্ঠান থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী। অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত হবে, প্রমাণ উপস্থাপন হবে, এবং আইনের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এটাই স্বাভাবিক পথ। কিন্তু সেই পথ এড়িয়ে সরাসরি তালা ঝুলিয়ে দেওয়া মানে হলো আইনের শাসনকে অস্বীকার করা।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোথায় ছিল? একটি প্রতিষ্ঠানে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া, সেটি দখলের চেষ্টা—এসব কি তাদের চোখ এড়িয়ে গেছে, নাকি তারা ইচ্ছাকৃতভাবে নীরব থেকেছে?

রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্বই হলো নাগরিকদের অধিকার রক্ষা করা এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা। যদি সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা দেখা যায়, তবে সেটি কেবল একটি ঘটনার ব্যর্থতা নয়, বরং একটি কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত।

এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রশাসনের ভূমিকা, বিশেষ করে ইউএনওর অবস্থান। সাংবাদিকরা যখন তালা ভেঙে প্রেসক্লাবে প্রবেশ করেন, তখন ইউএনওর পক্ষ থেকে বলা হয়—অভিযোগের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত প্রেসক্লাব যেন না খোলা হয়। এই নির্দেশনা একদিকে ‘নিরপেক্ষতা’ বজায় রাখার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে, কিন্তু অন্যদিকে এটি প্রশ্নও তোলে—আইনগতভাবে বৈধ একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়ার এখতিয়ার কি প্রশাসনের আছে?

ইউএনওর এই অবস্থান অনেকটা ‘সমস্যা এড়িয়ে যাওয়ার’ কৌশল বলেই মনে হয়। কারণ, এখানে মূল সমস্যা হলো অবৈধভাবে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া। সেই অবৈধ কাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে বরং প্রতিষ্ঠানটিকেই বন্ধ রাখতে বলা—এটি এক ধরনের ‘victim blaming’-এর মতো। এতে করে যারা আইন ভেঙেছে, তারা পরোক্ষভাবে উৎসাহ পায়, আর যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তারা আরও কোণঠাসা হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় ‘জুলাই যোদ্ধা’ বা ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন স্থানে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ নতুন নয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এই পরিচয় ব্যবহার করে কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছে। ফলে একটি ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনের নামও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে। এটি শুধু সেই আন্দোলনের জন্যই নয়, বরং পুরো সমাজের জন্যই ক্ষতিকর।

গোদাগাড়ীর ঘটনাটি আমাদের সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে—আমরা কি ধীরে ধীরে আইনের শাসন থেকে সরে গিয়ে ‘মব জাস্টিস’-এর দিকে এগোচ্ছি? যদি কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে মানুষ নিজেরাই বিচারক, জুরি এবং কার্যকরকারী হয়ে ওঠে, তাহলে রাষ্ট্রের প্রয়োজনটাই বা কী? তখন আইন, আদালত, প্রশাসন—সবকিছুই হয়ে পড়ে অপ্রাসঙ্গিক।

সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও এই প্রবণতা অত্যন্ত বিপজ্জনক। সাংবাদিকরা যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারেন, যদি তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো এভাবে দখল বা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়, তাহলে তথ্যপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে। আর তথ্যপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। কারণ তারা তখন সত্য জানার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।

এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা জরুরি—সাংবাদিকতার নীতিনির্ধারণ। কে সাংবাদিক হবেন, কীভাবে একটি প্রেসক্লাব পরিচালিত হবে, সেটি নির্ধারণ করার অধিকার সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদেরই। কোনো বাইরের গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক শক্তি সেই প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করলে সেটি শুধু অনৈতিকই নয়, বরং এটি গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত।

বিশ্বের অনেক দেশেই গণমাধ্যম কোনো না কোনো রাজনৈতিক অবস্থান নেয়, কিন্তু সেই অবস্থান গ্রহণের পদ্ধতি এবং সীমা থাকে। সেটি হয় নীতিগত ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণের মাধ্যমে, শক্তি প্রয়োগ বা দখলদারিত্বের মাধ্যমে নয়। আমাদের দেশে সেই সীমারেখাটি ক্রমশ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে, যা উদ্বেগজনক।

গোদাগাড়ী প্রেসক্লাবের ঘটনাটি তাই একটি সতর্কবার্তা। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই পরিস্থিতিতে সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সরকার যদি সত্যিই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাস করে, তবে তাকে এই ধরনের মবতন্ত্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। ‘দোসর’ তকমা দিয়ে কাউকে হেনস্তা করা বা প্রতিষ্ঠান দখলের চেষ্টা—এসবের বিরুদ্ধে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে যে, আইনই শেষ কথা।

সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনকেও তার ভূমিকা নতুন করে মূল্যায়ন করতে হবে। নিরপেক্ষতা মানে কখনোই অন্যায়ের সামনে নীরব থাকা নয়। বরং নিরপেক্ষতা মানে হলো ন্যায়বিচারের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সহজ—আমরা কেমন সমাজ চাই? এমন একটি সমাজ, যেখানে শক্তিশালী গোষ্ঠী নিজেদের মতো করে বিচার করবে, নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে?

সন্ধ্যা নেমেছে। সেই একই প্রেসক্লাবের সামনে আবার দাঁড়িয়ে আছেন সেই প্রবীণ সাংবাদিক। তালাটি হয়তো খুলে গেছে, হয়তো এখনো ঝুলছে—কিন্তু তাঁর চোখে সেই একই প্রশ্ন। পাশে দাঁড়ানো তরুণ সাংবাদিক এবার বলল, “স্যার, আমরা কি আবার লিখতে পারব?”

প্রবীণ সাংবাদিক একটু হাসলেন। বললেন, “লিখতে তো হবেই। কারণ, আমরা না লিখলে এই তালাগুলো একদিন পুরো দেশটাকেই বন্ধ করে দেবে।”

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক। 

শিক্ষাবার্তা /এ/৩১/০৩/২০২৬

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.