।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান ।।
স্কুলের স্টাফরুমে সেদিন অদ্ভুত এক নীরবতা। সদ্য নিয়োগ পাওয়া তরুণ শিক্ষক আরিফ চুপচাপ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে মাঠের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার চোখে স্বপ্ন—একদিন সে এই বিদ্যালয়ের নেতৃত্ব দেবে, নতুন চিন্তা, প্রযুক্তি আর শৃঙ্খলার সমন্বয়ে বদলে দেবে পুরো পরিবেশ।
হঠাৎই সহকর্মী এক সিনিয়র শিক্ষক মৃদু হেসে বললেন, “স্বপ্ন দেখতে দোষ নেই আরিফ, কিন্তু প্রধান শিক্ষক হতে হলে আগে ১৮ বছর পার করো।”
আরিফ অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, “স্যার, নেতৃত্ব কি শুধু বছরের ওপর নির্ভর করে? যদি কেউ ০৮ থেকে ১০ বছরেই দক্ষতা, প্রশিক্ষণ আর ফলাফল দিয়ে প্রমাণ করতে পারে—তবে কি সে অযোগ্য?”
কথোপকথন থেমে গেল। কিন্তু প্রশ্নটি রয়ে গেল বাতাসে ভাসমান—যোগ্যতা, না জ্যেষ্ঠতা—কোনটি হবে প্রধান শিক্ষক হওয়ার মানদণ্ড?
সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রধান শিক্ষক পদে ন্যূনতম ১৮ বছরের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক করার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে শিক্ষক সমাজে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ছাড়া একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দক্ষভাবে পরিচালনা করা কঠিন। তবে প্রশ্ন উঠছে—শুধু অভিজ্ঞতার বছর বাড়ালেই কি নেতৃত্বের গুণ নিশ্চিত হয়?
এই প্রশ্নকে ঘিরে তরুণ শিক্ষক, শিক্ষক নেতা ও শিক্ষাবিদদের ভিন্নমত সামনে এসেছে।
অনেক তরুণ শিক্ষক মনে করছেন, ১৮ বছরের শর্ত তাদের নেতৃত্বের সম্ভাবনাকে অযথা দীর্ঘ সময়ের জন্য আটকে দিচ্ছে।
তাদের যুক্তি হলো—বর্তমানে শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রযুক্তি, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়ন ও প্রশাসনিক দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এসব ক্ষেত্রে অনেক সময় তরুণ শিক্ষকরাই বেশি দক্ষ ও উদ্ভাবনী। বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ, উচ্চশিক্ষা ও নেতৃত্বের কোর্স সম্পন্ন করেও শুধু অভিজ্ঞতার ঘাটতির কারণে তারা প্রধান শিক্ষক হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন।
একজন তরুণ শিক্ষক বলেন, “আমরা যদি ফলাফল দিয়ে প্রমাণ করতে পারি যে আমরা একটি বিভাগ বা প্রকল্প সফলভাবে পরিচালনা করেছি, তাহলে শুধুমাত্র বছর কম হওয়ার কারণে আমাদের অযোগ্য বলা কতটা যৌক্তিক?”
তাদের মতে, অভিজ্ঞতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা যেন একমাত্র মানদণ্ড না হয়। দক্ষতা, নেতৃত্বগুণ, প্রশাসনিক জ্ঞান, প্রশিক্ষণ—এসবকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
শিক্ষক নেতাদের মতামত: “অভিজ্ঞতা ছাড়া নেতৃত্ব ঝুঁকিপূর্ণ” অন্যদিকে শিক্ষক নেতাদের বড় একটি অংশ ১৮ বছরের শর্তকে স্বাগত জানিয়েছেন।
তাদের মতে— প্রধান শিক্ষক শুধু প্রশাসক নন, তিনি একজন নীতিনির্ধারক ও সংকট ব্যবস্থাপক।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক, পরিচালনা কমিটি ও সরকারি দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়।
দীর্ঘ অভিজ্ঞতা না থাকলে এসব জটিলতা সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে।
তাদের যুক্তি—“নেতৃত্ব মানে শুধু প্রযুক্তি জানা নয়, মানুষের মন বোঝা। আর মানুষের মন বোঝা আসে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে।”
তবে কিছু শিক্ষক নেতা আবার মধ্যপন্থার প্রস্তাব দিয়েছেন। তারা মনে করেন, ১৮ বছর হয়তো বেশি হয়ে যাচ্ছে। ১২-১৫ বছরের মধ্যে একটি যুক্তিসঙ্গত সীমা নির্ধারণ করা যেতে পারে, পাশাপাশি বাধ্যতামূলক নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ চালু করা যেতে পারে।
শিক্ষাবিদদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলনামূলকভাবে বিশ্লেষণধর্মী। তাদের মতে, নেতৃত্বের ক্ষেত্রে শুধু বয়স বা বছর নয়, বরং দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মদক্ষতার সমন্বয় প্রয়োজন।
একজন শিক্ষাবিদ মন্তব্য করেন, “অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সব অভিজ্ঞতা সমান নয়। কেউ ১৮ বছর একইভাবে কাটাতে পারেন, আবার কেউ ১০ বছরেই অসাধারণ নেতৃত্বের উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারেন।”
তারা প্রস্তাব করছেন—অভিজ্ঞতার ন্যূনতম সীমা থাকতে পারে, তবে তা যেন অতিরিক্ত দীর্ঘ না হয়।
প্রধান শিক্ষক হওয়ার আগে বাধ্যতামূলক নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক প্রশিক্ষণ থাকতে হবে।পারফরম্যান্স মূল্যায়ন, স্কুল উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা ও শিক্ষার্থীদের ফলাফল বিবেচনায় নিতে হবে।
অর্থাৎ, একটি হাইব্রিড বা সমন্বিত মানদণ্ড প্রয়োজন—যেখানে অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা উভয়ই মূল্যায়িত হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রধান শিক্ষক নিয়োগে অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণের সমন্বয় দেখা যায়।
ফিনল্যান্ডে প্রধান শিক্ষক হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক বছরের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন হলেও সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ও নেতৃত্ব প্রশিক্ষণে। স্কুল লিডারশিপ কোর্স সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। সেখানে মানসম্মত প্রশিক্ষণ অভিজ্ঞতার ঘাটতি অনেকাংশে পূরণ করে।
সিঙ্গাপুরে সম্ভাব্য প্রধান শিক্ষকদের জন্য বিশেষ নেতৃত্ব উন্নয়ন কর্মসূচি রয়েছে। মেধা, কর্মদক্ষতা ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে ধাপে ধাপে নেতৃত্বে উন্নীত করা হয়। শুধু বছর নয়, পারফরম্যান্সই মূল বিবেচ্য।
যুক্তরাজ্যে প্রধান শিক্ষক হওয়ার জন্য অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ ও নির্দিষ্ট সার্টিফিকেশন অত্যন্ত গুরুত্ব পায়। অনেক ক্ষেত্রেই সহকারী প্রধান হিসেবে সাফল্য প্রমাণ করাই বড় শর্ত।
এই তুলনা থেকে দেখা যায়—বিশ্বে কোথাও শুধু বছরের ওপর নির্ভরশীল কড়াকড়ি নেই; বরং দক্ষতা, প্রশিক্ষণ ও পারফরম্যান্সের সমন্বয় দেখা যায়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা একটি জটিল কাজ। এখানে রয়েছে
© রাজনৈতিক প্রভাব
© পরিচালনা কমিটির চাপ
© প্রশাসনিক জটিলতা
© অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা
এই বাস্তবতায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সহায়ক হতে পারে। তবে একই সঙ্গে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ঘটছে। ডিজিটাল রেজাল্ট ম্যানেজমেন্ট, অনলাইন রিপোর্টিং, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম—এসব পরিচালনায় তরুণ নেতৃত্ব কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
সুতরাং, কেবল জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচন করলে উদ্ভাবনী শক্তি হারানোর ঝুঁকি থাকে। আবার কেবল যোগ্যতার ভিত্তিতে অভিজ্ঞতাকে অগ্রাহ্য করলে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এই বিতর্কের যৌক্তিক সমাধান হতে পারে—
© অভিজ্ঞতার ন্যূনতম সীমা ৮–১০ বছরের মধ্যে রাখা।
© বাধ্যতামূলক নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক প্রশিক্ষণ চালু করা।
© লিখিত পরীক্ষা ও উপস্থাপনার মাধ্যমে নেতৃত্ব দক্ষতা মূল্যায়ন।
© স্কুল উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা যাচাই।
© পারফরম্যান্স-ভিত্তিক প্রমোশন ব্যবস্থা প্রবর্তন।
এভাবে যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতার সমন্বয় ঘটানো সম্ভব।
গল্পের সেই তরুণ শিক্ষক আরিফের প্রশ্ন আজ কেবল তার ব্যক্তিগত প্রশ্ন নয়; এটি পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার প্রশ্ন।
নেতৃত্ব মানে শুধু বছরের হিসাব নয়, আবার শুধুই উদ্যমও নয়। নেতৃত্ব হলো অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়।
১৮ বছরের শর্ত হয়তো অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করতে চায়, কিন্তু যদি তা যোগ্য ও উদ্ভাবনী নেতৃত্বের পথ রুদ্ধ করে—তবে নীতিনির্ধারকদের পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন।
অতএব, যোগ্যতা না জ্যেষ্ঠতা—এ দ্বন্দ্বে একপক্ষকে বেছে নেওয়া নয়, বরং ভারসাম্য খুঁজে নেওয়াই হতে পারে শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ।
লেখক:শিক্ষক ও গবেষক।
শিক্ষাবার্তা /এ/০৪ /০৩/২০২৬
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল