।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
সকাল সাতটা।
উত্তরবঙ্গের একটি মফস্বল শহরের সরু গলির মসজিদে ফজরের নামাজ শেষে মুসল্লিরা বের হচ্ছেন। মসজিদের দরজার পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন ষাটোর্ধ্ব শহীদুল মিয়া —পাকা দাড়ি, চোখে অভিজ্ঞতার ছাপ। ঠিক তখনই তাঁর চোখে পড়ল পরিচিত এক তরুণ মুখ। এলাকায় সবাই জানে, গত চার বছর যিনি জিনস-প্যান্ট আর হাফ শার্ট ছাড়া কিছুই পরেননি, আজ তিনি ধবধবে সাদা টুপি মাথায়, ইস্ত্রি করা লম্বা পাঞ্জাবি গায়ে।
শহিদুল মিয়া মৃদু হেসে বললেন,
— “বাবা, ভোটের হাওয়া কি তবে লেবাসেও লাগলো?”
তরুণ প্রার্থী একটু অপ্রস্তুত হয়ে উত্তর দিলেন,
— “চাচা, আপনাদের দোয়া নিতে সুন্নতি পোশাকে এলাম।”
শহিদুল মিয়া আর কিছু বললেন না। কিন্তু মনে মনে জানেন—এই টুপি আর পাঞ্জাবি সম্ভবত নির্বাচনের পরদিনই আলমারির কোনো অন্ধকার কোণে আশ্রয় নেবে। কারণ, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটি নতুন কোনো দৃশ্য নয়। নির্বাচনের মৌসুম এলেই অনেক রাজনীতিকের জীবনে হঠাৎ ধর্মীয় জোয়ার বয়ে যায়।
প্রশ্ন হলো—এই পরিবর্তন কি বিশ্বাসের প্রকাশ, নাকি ভোটের অঙ্কে সাজানো এক নিপুণ অভিনয়?
বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ মুসলমান। এখানে ধর্ম শুধু ইবাদতের বিষয় নয়; এটি সামাজিক পরিচয়, নৈতিকতার মাপকাঠি এবং বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতীক। একজন প্রার্থী যখন টুপি-পাঞ্জাবি পরে মসজিদে যান বা নারীরা হঠাৎ ঘোমটা টেনে নেন, তখন তারা ভোটারদের কাছে একটি নীরব বার্তা পৌঁছে দেন—
“আমি ভালো মানুষ, আমি ধার্মিক, আমাকে বিশ্বাস করা যায়।”
সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, এটি এক ধরনের মোরাল শর্টকাট। নীতির চেয়ে লেবাস দ্রুত কাজ করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক বলেন,
“যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, দখল বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ আছে, তারা ধর্মীয় লেবাসকে এক ধরনের ‘নৈতিক ডিটারজেন্ট’ হিসেবে ব্যবহার করেন।”
ধর্ম এখানে হয়ে ওঠে রাজনৈতিক ক্যামোফ্লেজ—অপরাধ আর ব্যর্থতার ওপর চাপানো এক পবিত্র আবরণ।
ইসলাম বাহ্যিকতা নয়, অন্তরের বিশুদ্ধতার ওপর জোর দেয়। কোরআন ও হাদিসে লোক দেখানো আমলের বিষয়ে স্পষ্ট সতর্কতা রয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের চেহারা ও সম্পদ দেখেন না; তিনি দেখেন তোমাদের অন্তর ও তোমাদের কর্ম।”
(সহিহ মুসলিম)
নির্বাচনের সময় যদি কেউ শুধুই মানুষের বাহবা বা ভোট পাওয়ার জন্য ধর্মীয় লেবাস ধারণ করেন, তবে তা ইসলামের ভাষায় লোক দেখানো ইবাদত। হাদিসে এটাকে শিরকে আসগর বা ছোট শিরক বলা হয়েছে।
পবিত্র কোরআনে আরও বলা হয়েছে—
“তোমরা আমার আয়াতসমূহকে সামান্য মূল্যে বিক্রি করো না।”(সূরা বাকারা: ৪১)
ভোটের বিনিময়ে ধর্মীয় প্রতীক বিক্রি করা কি এই আয়াতের স্পষ্ট বিরোধিতা নয়?
ইসলামে ভোট বা সাক্ষ্য একটি আমানত। কোরআনে বলা হয়েছে—
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন আমানত তার হকদারদের নিকট পৌঁছে দিতে।”(সূরা নিসা: ৫৮)
কিন্তু প্রশ্ন হলো—লেবাস আর ধর্মীয় স্লোগানের মাধ্যমে যদি ভোটারকে বিভ্রান্ত করা হয়, তবে কি সেই আমানতের খেয়ানত হয় না?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক এর ভাষায়, “আমাদের সমাজে ধর্মপ্রাণতা আছে, কিন্তু ধর্মীয় বোধে গভীরতা কম। এই দুর্বলতাই রাজনীতির প্রধান পুঁজি।”
ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির কথা বললেও নির্বাচনের সময় অনেক প্রার্থী মসজিদে হাজির হন, কোরআনের উদ্ধৃতি দেন। কারণ, বাংলাদেশে ‘ধর্মহীন’ তকমা রাজনৈতিক আত্মহত্যার শামিল।
ঢাবির এক শিক্ষার্থী বলেন,“ধর্মীয় লেবাস পরে জান্নাতের টিকিট বিক্রি করা রাজনীতির সবচেয়ে বড় ভণ্ডামি।”
জামায়াতে ইসলামী বা ইসলামী আন্দোলনের মতো দলগুলোর প্রার্থীরা সারা বছরই নির্দিষ্ট লেবাসে থাকেন। তবে নির্বাচনের সময় ধর্মীয় বয়ান আরও আবেগী হয়ে ওঠে—প্রার্থিতা প্রত্যাহার ‘কোরবানি’, প্রতীক ‘নাজাতের পথ’।
জিন্নাহর টুপি থেকে শুরু করে সত্তরের নির্বাচনে “আল্লাহু আকবর”, জিয়া-এরশাদের সংবিধানে ধর্মের অন্তর্ভুক্তি, নব্বইয়ের দশকে “নৌকা নূহ নবীর নৌকা”—সবই প্রমাণ করে, ধর্ম এ দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই নির্বাচনী পণ্য।
শুধু লেবাস বদলেছে, কৌশল নয়।ভোটার বদলাচ্ছে, ধীরে হলেও। তবে আশার কথা আছে।
এক ব্যবসায়ী মোবারক হোসেন বলেন,“ভাই, টুপি-পাঞ্জাবি দেখে আর বিশ্বাস হয় না। কাজ না করলে আল্লাহও পক্ষে থাকেন না।”শহর-গ্রামের অনেক ভোটার এখন প্রশ্ন করেন— এই ধর্মীয় মানুষটি ক্ষমতায় গিয়ে কী করেছেন?
শহিদুল মিয়া আবার সেই মসজিদে ফজরের নামাজ পড়ে বের হচ্ছেন। সামনে দিয়ে হেঁটে গেলেন সেই তরুণ রাজনীতিক—এবার প্যান্ট-শার্টে, ফোনে ব্যস্ত। মাথায় আর টুপি নেই।
শহিদুল মিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— “ধর্ম তো গেল না, গেল শুধু ভোটের পোশাক।”
ধর্ম হৃদয়ে থাকলে তা মৌসুমি হয় না।
আর রাজনীতি যদি লেবাসে নয়, চরিত্রে ধার্মিক হয়—তবেই গণতন্ত্র সুস্থ হয়।
টুপি, পাঞ্জাবি, ঘোমটা—এসব সম্মানের প্রতীক।
এগুলো যেন আর ভোটের ঢাল না হয়।
ভোট হোক কর্মের মূল্যায়ন, লেবাসের নয়।
ধর্ম থাকুক ব্যক্তিগত জীবনে,
রাজনীতি হোক দায়িত্ব আর জবাবদিহিতার জায়গা।
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক।।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
