শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান: উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা

নিউজ ডেস্ক.।।

২০১১ সালে হাইকোর্ট শিশুদের শারীরিক শাস্তি দেওয়ার বিষয়টি বেআইনি এবং অসাংবিধানিক ঘোষণা করে। আর হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে একটি পরিপত্র জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু তারপরও প্রায়ই ঘটছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী নির্যাতনের ঘটনা। রাজধানীর নামকরা একটি স্কুলে শিক্ষকের পিটুনিতে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীর পিঠের হাড় ভেঙে গেছে। বরিশালে শিক্ষকের মারধরে দাঁত ভাঙল এক শিক্ষার্থীর। রাজধানীর পল্টনে শারমিন একাডেমি নামে একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে চার বছরের শিশু শিক্ষার্থীকে মারধর করেন দুই শিক্ষক, যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এদিকে বাড়ির কাজ না আনা, লিখতে-পড়তে ভুল করা, দুষ্টুমি করার মতো কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুকে দাঁড় করিয়ে রাখা, চুল টানা, কান মলা, সহপাঠীদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে পাঠদানে বিরত রাখা, বকাঝকা করার মতো শাস্তি অহরহ দেওয়া হচ্ছে অধিকাংশ স্কুলে।

অভিভাবক, শিক্ষা ও শিশু অধিকার সংশ্লিষ্টরা বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারি করা পরিপত্রের প্রয়োগ কম। নির্যাতনের ঘটনায় নজরদারিও কম। এ কারণে শিশু নির্যাতন বাড়ছে। অনেকে আবার বিষয়টি তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে এড়িয়ে যান। ফলে এমন নির্যাতনের জাঁতাকল থেকে শিশুদের রেহাই মিলছে না।’ এ নিয়ে অভিভাবকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার দাঁড়িয়াল ইউনিয়নের কামারখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সম্প্রতি দুই কোমলমতি শিক্ষার্থীকে ভয়াবহ নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে এক শিক্ষার্থীর দাঁত ভেঙে ফেলেন একজন শিক্ষক। অন্য শিক্ষকের মারধরে আরেক শিক্ষার্থীর মেরুদণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে বিদ্যালয়টি শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বদলে ভয় ও আতঙ্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন অভিভাবক ও স্থানীয়রা। গত বছর একটি স্কুলের শ্রেণিকক্ষে দুষ্টুমি করায় ১২ বছরের এক শিশুকে বেত দিয়ে পিটিয়ে আহত করেন শিক্ষক।

পেটানোর সময় শিক্ষকের নির্দেশে দুই ছাত্র শিশুটির হাত-পা চেপে রাখে। কেন মারা হয়েছে—জানতে অভিভাবকেরা এলে শিশুটির বাবাসহ চার জনকে একটি কক্ষে আটকে রেখে মারধর করেন এলাকাবাসী। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে কল পেয়ে পুলিশ তাদের উদ্ধার করে। শিক্ষককে গ্রেফতার করা হয়। ঘটনাটি ঘটে গত বছর ৪ ফেব্রুয়ারি, মাদারীপুরের ডাসার উপজেলার একটি মাদ্রাসায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী নির্যাতনের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে ঘটে আসছে। রাজধানীর ধানমন্ডি আইডিয়াল কলেজ হোস্টেলে ২০১৮ সালের ২৬ মার্চ রাত ১২টার পর এইচএসসি পরীক্ষার্থী ৯ জন ছাত্র বন্ধুর জন্মদিন পালন করছিল। তাতে ক্ষুব্ধ হন হোস্টেল সুপার এবং পৌরনীতি ও সুশাসন বিষয়ের শিক্ষক মনিরুল ইসলাম সোহেল। তিনি জন্মদিন পালন বন্ধ করে দিয়ে ৯ ছাত্রকে এক লাইনে দাঁড় করান। এরপর আধাঘণ্টা ধরে অ্যালুমনিয়ামের রড দিয়ে তাদের পিটিয়ে রক্তাক্ত করেন। পরে নির্যাতিত ছাত্ররা তাদের রক্তাক্ত ছবি ফেসবুকে পোস্ট দিলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।

শিশু নির্যাতন নিয়ে গবেষণায় ভয়াবহ চিত্র : ২০২৩ সালের মে মাসে বেসরকারি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেস (বিইউএইচএস) প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ৮৮ শতাংশ শিশু কমপক্ষে এক বার এবং ৫৫ শতাংশ শিশু একাধিক বার শারীরিক (মারধর, চড়, লাথি, চুল টানা, কান মলা, হাত মোচড়ানো), মানসিক (বকাঝকা, চিত্কার, গালি, অপমান) ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। পরিবারে ৫৮ শতাংশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৫৬ শতাংশ, খেলার মাঠে ৬৫ শতাংশ শিশু শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়। ‘ভায়োলেন্স এগেইনস্ট চিলড্রেন অ্যান্ড ইটস অ্যাসোসিয়েটেড ফ্যাক্টরস ইন আরবান এরিয়া অব ঢাকা, বাংলাদেশ’ শিরোনামের গবেষণাটি হয় ২০১৯ সালে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন মিরপুরের দুটি ওয়ার্ডে করা এই গবেষণায় নিম্নবিত্ত পরিবারের ১০ থেকে ১৬ বছর বয়সি ৪০১টি শিশু অংশ নেয়। বিইউএইচএসের গবেষণা অনুসারে, ১০ বছর বয়সের আগেই বেশির ভাগ শিশুর প্রথম নির্যাতনের অভিজ্ঞতা হয়। পরিবারের সদস্যরাই শিশুদের নির্যাতন করে বেশি। এই হার ৩৯। শিক্ষক, আগন্তুক, বন্ধু, প্রতিবেশী ও অন্যরা যথাক্রমে ১৭, ১৫, ১৩, ৫ ও ১১ শতাংশ নির্যাতন করে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী নিষিদ্ধ করা শাস্তিগুলো হলো : হাত-পা বা কোনো কিছু দিয়ে আঘাত বা বেত্রাঘাত, শিক্ষার্থীর দিকে চক বা ডাস্টার জাতীয় বস্তু ছুড়ে মারা, আছাড় দেওয়া ও চিমটি কাটা, কামড় দেওয়া, চুল টানা বা চুল কেটে দেওয়া, হাতের আঙুলের ফাঁকে পেনসিল চাপা দিয়ে মোচড় দেওয়া, ঘাড় ধাক্কা, কান টানা বা উঠবস করানো, চেয়ার, টেবিল বা কোনো কিছুর নিচে মাথা দিয়ে দাঁড় করানো বা হাঁটু গেড়ে দাঁড় করিয়ে রাখা, রোদে দাঁড় করিয়ে বা শুইয়ে রাখা কিংবা সূর্যের দিকে মুখ করে দাঁড় করানো এবং ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে এমন কোনো কাজ করানো, যা শ্রম আইনে নিষিদ্ধ। এই পরিপত্রে শাস্তির কথাও বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কেউ শিশুদের শারীরিক শাস্তি দিলে ১৯৭৯ সালের সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালার পরিপন্থি হবে এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। অভিযোগের জন্য অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ১৯৮৫-এর আওতায় অসদাচরণের অভিযোগে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে। প্রয়োজনে ফৌজদারি আইনেও ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে।

শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সচেতনতার অভাব : শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক নির্যাতনের প্রবণতা বন্ধ না হওয়ার জন্য শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সচেতনতার অভাবকেই দায়ী করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন অধ্যাপক। তিনি বলেন, ‘সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের এ নিয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তা নেই। এটা বাধ্যতামূলক করা দরকার। আইন দিয়ে সব কিছু হয় না। যে শিক্ষক ছাত্রদের শারীরিক নির্যাতন করছেন তিনি হয়তো বুঝতেই পারছেন না তিনি খারাপ কাজ করছেন। এজন্য তাদের কাউন্সেলিং দরকার।’

শিশু নির্যাতনকারীদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি : বিইউএইচএসের জনস্বাস্থ্য অনুষদের ডিন এবং প্রজনন ও শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক বেগম রওশন আরা সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেন, শিশুদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি বন্ধ অবশ্যই করতে হবে। তা না হলে শিশুর বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে ও মানসিক বিষণ্নতা তৈরি হবে। এটা শুধু শিশুর জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্য ক্ষতিকর। শিশুর বিকাশ না হলে দেশ সুস্থ জাতি পাবে না। শিশু নির্যাতনকারীদের শাস্তির আওতায় এনে উদাহরণ তৈরি করতে হবে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, আগের চেয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের শাস্তি দেওয়া বা শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা বেশ কমেছে। নজরদারি বাড়ালে নির্যাতনের ঘটনা আরো কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল কবির দুলু বলেন, কোমলমতি শিক্ষার্থীরা স্কুলে কেন নির্যাতিত হবে? যেসব শিক্ষক শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করছে, তাদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি। এ বিষয়ে শিক্ষা উপদেষ্টা এবং শিক্ষা সচিবের দ্রুত দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।

এখনো অনেক শিক্ষক ও অভিভাবক বিশ্বাস করেন, ‘মাইরের ওপর ওষুধ নাই’ : শিক্ষা নিয়ে গবেষণা করা একজন গবেষক গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, এখনো অনেক শিক্ষক ও অভিভাবক বিশ্বাস করেন, ‘মাইরের ওপর ওষুধ নাই’। এই মনোভাব সামাজিক-সংস্কৃতির একদম গভীরে প্রোথিত। শিশুদের যে কোনো ধরনের শাস্তির বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করা প্রয়োজন বলে তিনি জানান।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.