টানটান উত্তেজনা আর তীব্র বিক্ষোভের মুখে অবশেষে পরিবর্তন হলো ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের ভোটগ্রহণের তারিখ। ৩০ জানুয়ারির পরিবর্তে এই দুই সিটিতে ভোটগ্রহণ হবে ১ ফেব্রুয়ারি। আর ১ ফেব্রুয়ারি শুরু হতে যাওয়া এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার তারিখ ২ দিন পিছিয়ে নির্ধারিত হলো ৩ ফেব্রুয়ারি।
শনিবার রাত সাড়ে ৮টায় নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে জরুরি বৈঠক শেষে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। তবে এর আগে ২০২০ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা পূর্বনির্ধারিত তারিখ ১ ফেব্রæয়ারির (শনিবার) পরিবর্তে ৩ ফেব্রুয়ারি (সোমবার) থেকে শুরু করার কথা জানায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করেই ভোটের তারিখ পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে জানিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদা সাংবাদিকদের বলেন, শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে আমরা কথা বলেছি।
পরীক্ষার তারিখ পেছালে সমস্যা হবে কি না। তিনি বলেছেন সমস্যা হবে না। মন্ত্রণালয় পরীক্ষার তারিখ ২ দিন পিছিয়ে ৩ ফেব্রুয়ারি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণেই আমরা ৩০ জানুয়ারির পরিবর্তে ১ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয়েছি। তিনি বলেন, ৩০ জানুয়ারি নির্বাচনের জন্য ঘোষিত তারিখে সরস্বতী পূজা পড়ে যাওয়ায় কারও ধর্মানুভ‚তিতে যাতে আঘাত না লাগে সে কারণে নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন করা হয়েছে। আমরা যখন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করি তখন সরস্বতী পূজার তারিখ ২৯ জানুয়ারি উল্লেখ ছিল।
সে কারণে তারিখ নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। তাহলে প্রার্থীরা প্রচারণা কবে পর্যন্ত চালাতে পারবে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি তা পরবর্তী সময়ে জানিয়ে দেওয়া হবে বলে মন্তব্য করেন। আসন্ন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের তারিখ এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সরস্বতী পূজার তারিখ একই হওয়ায় শুরু থেকে নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে আসছিল বিভিন্ন মহল। কোনো কিছুতেই নির্বাচন কমিশন তারিখ পরিবর্তন না করায় আদালতের দ্বারস্থও আইনজীবীরা।
কিন্তু আদালতও ৩০ জানুয়ারিই ভোটগ্রহণের তারিখ নির্ধারণের সিদ্ধান্ত বহাল রাখায় ভোটের তারিখ পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলনে নামে সাধারণ শিক্ষার্থীসহ সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। দিন যত কমতে থাকে আন্দোলনের মাত্রা ততই বাড়তে বাড়তে তা উত্তাপ ছড়াতে থাকে রাজধানীতে। এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার দেশ জুড়ে অবরোধের ডাক দেয় বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ।
শাহবাগে আমরণ অনশনরত শতাধিক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে ভর্তি হয় হাসপাতালে। এ প্রেক্ষাপটে অবশেষে নাছোড়বান্দা নির্বাচন কমিশন বাধ্য হয় নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তনে। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতারা নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তনের দাবিতে আগামী ২৫ জানুয়ারি দেশ জুড়ে অবরোধের পাশাপাশি ২০ জানুয়ারি বিকালে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ, ২৪ জানুয়ারি সকাল-সন্ধ্যা গণ-অবস্থান, ২৫ জানুয়ারি অবরোধ এবং ২৭ জানুয়ারি প্রতীকী অনশনের ঘোষণা দেয়।
এ দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে আমরণ অনশনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১২ জন অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৬ জানুয়ারি থেকে আমরণ অনশনে শনিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত টানা ৪৬ ঘণ্টা একই স্থানে অবস্থান নেন তারা। অনশনে অংশগ্রহণকারী জগন্নাথ হল ছাত্রলীগের সহসম্পাদক ও মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী অভিদাস প্রীতম ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। বাকি অসুস্থ শিক্ষার্থীদের রাজু ভাস্কর্যের নিচে স্যালাইন লাগিয়ে রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে জগন্নাথ হল ছাত্র সংসদের ভিপি উৎপল বিশ্বাস বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের ভরসার প্রতীক। তিনি অসাম্প্রদায়িক চেতনা লালন করেন।
আশা করি, তিনি বিষয়টি বিবেচনা করবেন। আমাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অনশন কর্মসূচি চলবে। এ প্রেক্ষাপটে নির্বাচন ভবনে ভোটের তারিখ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিতে দুই দফা বৈঠকে বসেন সিইসির নেতৃত্বে অন্য কমিশনাররা। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ভোটের তারিখ পরিবর্তনের কথা জানান সিইসি নিজেই। নিজেদের দাবি বাস্তবায়িত হওয়ায় খুশিতে ভাসছে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতা রানা দাশগুপ্ত বলেন, আমাদের শিক্ষার্থীরা সারা বছর এ একটি দিনের অপেক্ষায় থাকে। এদিন সিটি করপোরেশনের ভোটগ্রহণের মতো সংবেদনশীল একটি বিষয় সংগঠিত হলে তা খুবই অন্যায় হতো।
তবে আমাদের দাবি মেনে নেওয়ায় এ বিষয়ে আমাদের আর কিছু বলার নেই। আমরা আমাদের দেওয়া প্রতিরোধের কর্মসূচিও তুলে নিচ্ছি। সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নির্মল ভট্টাচার্যও। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, সরস্বতী বিদ্যার দেবী। সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা সারা বছর অপেক্ষা করে এ দিনটির জন্য। দেশের বেশিরভাগ স্কুল-কলেজেই এ পূজা হয়ে থাকে। বিশেষ করে ঢাকা শহরে পালন করা হয় সাড়ম্বরে। আবার ভোটগ্রহণের স্থানও স্কুল-কলেজই।
যদি ভোটকেন্দ্রগুলোর আশপাশে ১৪৪ ধারা জারি থাকে পূজা উদযাপন করাটা ছিল অসম্ভব। তবে দেরিতে হলেও নির্বাচন কমিশন তাদের অবস্থান থেকে সরে এসেছে। এ জন্য আমরা তাদের অভিনন্দন জানাই। অন্যদিকে এ সিদ্ধান্তের পরপরই নিজেদের আমরণ অনশনের কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ভোটের তারিখ পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়েছেন প্রার্থীরাও। ঢাকা উত্তরের আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়রপ্রার্থী আতিকুল ইসলাম তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আমাদের দেশ সম্প্রীতির।
হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও মুসলমান সবাই একসঙ্গে বসবাস করি এবং বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আমরা অংশ নিই। নির্বাচনের তারিখটি আরও আগেই পরিবর্তন করা উচিত ছিল। এখন করেছেন এর জন্য নির্বাচন কমিশনকে আমরা ধন্যবাদ জানাই। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়রপ্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, পূজার দিনে ভোটের তারিখ নির্ধারণ করায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ভাই-বোনের মধ্যেও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছিল। তাদের মন ক্ষুণœ ছিল। এখন তারা স্বাতন্দ্র্যে ভোট দিতে পারবেন। এর জন্য নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ জানাই। তবে পরীক্ষা না পিছিয়ে ভোট এগিয়ে দিলে এসএসসি শিক্ষার্থীদের জন্য ভালো হতো।
শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা অনেক দিন থেকে প্রস্তুতি নিয়েছিল। এছাড়া নির্বাচনি কার্যক্রমেও তাদের ব্যাঘাত ঘটছে। এর জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি। একইভাবে নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন দক্ষিণের বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী ইশরাক হোসেন। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, শুরু থেকেই আমি আমার নির্বাচনি প্রচারণা চালানোর সময় সরস্বতী পূজা উপলক্ষে ভোটের তারিখ পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে আসছিলাম। দেরিতে হলেও নির্বাচন কমিশন তারিখ পরিবর্তন করেছে সে জন্য আমি তাদের ধন্যবাদ জানাই। এক্ষেত্রে প্রচারণায় কোনো প্রভাব পড়বে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, না কেন প্রচারণায় প্রভাব পড়বে? প্রচারণা যেভাবে চলছে সেভাবেই চলবে।
কোনো সমস্যা হবে না। এক তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় শনিবার রাতে বিএনপির ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়রপ্রার্থী তাবিথ আউয়াল নির্বাচনে ভোটগ্রহণের তারিখ পেছানোয় নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ভোটগ্রহণের তারিখ পেছানোর কারণে এখন সব সম্প্রদায়ের লোকেরা উৎসাহের সঙ্গে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারবেন। এটি সবার জন্য ভালো হয়েছে। কারণ আমরা সবাইকে নিয়ে পথ চলতে চাই।’ তাবিথ বলেন, ‘গত ২২ ডিসেম্বর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করার পরই আমরা নির্বাচন কমিশনকে সতর্ক করেছিলাম। আমরা বলেছিলাম, ভোটের এই তারিখ নিয়ে একটি বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে। কারণ আমরা বলেছিলাম ৩০ জানুয়ারি হিন্দুধর্মের একটি পূজা রয়েছে। বিশেষ করে ওই পূজাটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হয়ে থাকে। এ পরপরই এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
