এইমাত্র পাওয়া

সরকার–শিক্ষক দ্বন্দ্বে ক্ষতিগ্রস্ত নিরীহ শিক্ষার্থীরা: এ কোন প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা?

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।। 

সারাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে আজ যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, তা বাংলাদেশের শিক্ষা–অঙ্গনে নতুন নয়, কিন্তু এতো ব্যাপকভাবে দীর্ঘস্থায়ী জটিলতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কমই দেখা গেছে। সরকার ও সহকারী শিক্ষকদের চলমান দ্বন্দ্ব এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সবচেয়ে অসহায় ও নিরীহ অংশ—শিক্ষার্থীরাই—ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

৬৫ হাজার বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ, তিন লাখ ৮০ হাজারেরও বেশি শিক্ষক কর্মবিরতিতে, সামনে বার্ষিক পরীক্ষা বর্জনের হুমকি—এসব পরিস্থিতি প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার দূর্বলতা, রাষ্ট্রীয় অদক্ষতা ও দীর্ঘমেয়াদি অব্যবস্থাপনার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। প্রশ্ন উঠছে—এটাই কি সেই শিক্ষাব্যবস্থা, যার ওপর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকবে?

সহকারী শিক্ষকরা গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বেতন কাঠামো, গ্রেড উন্নয়ন, পদোন্নতি—এসব বিষয়ে দাবি জানিয়ে আসছেন। প্রধান শিক্ষকরা ইতোমধ্যে দশম গ্রেডে উঠলেও সহকারী শিক্ষকরা এখনও ১৩তম গ্রেডে পড়েই আছেন। রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে নিচের স্তরের শিক্ষকেরা যদি এমন বঞ্চনার শিকার হন, তবে তাদের ক্ষোভ ও দাবিকে অস্বাভাবিক বলা যায় না।

অন্যদিকে, সরকারও দাবি করেছে যে বাজেট, প্রশাসনিক কাঠামো ও স্কেল–পুনর্বিন্যাসের কারণে সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগছে।

কিন্তু সমস্যার জায়গা হলো—এই “সময় লাগছে” নীতি শিশুর কোনো পাঠসময়কে ফেরত দিতে পারে না।

শিক্ষকেরা বলেন—‘দাবি পূরণ না হলে পরীক্ষা বর্জন ছাড়া উপায় নেই।’ কিন্তু এর ফলাফল কে ভোগ করবে? শিক্ষকরা নয়। সরকার নয়। ভোগ করবে ৮–১০ বছরের ছোট ছোট শিশুরা, যারা জানে না গ্রেড কী, স্কেল কী, আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত কী—তারা কেবল স্কুলে পাঠ নিয়ে শেখার অপেক্ষায় থাকে।

আন্দোলন গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। অধিকার আদায়ের পথও। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় তখন, যখন আন্দোলনের পদ্ধতি এমন হয়ে ওঠে যে তাতে নিরীহ মানুষ—বিশেষত শিশু—ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাড়ে ৬৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ থাকা, বার্ষিক পরীক্ষার অনিশ্চয়তা, বছরের শেষেই শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের অচলাবস্থা—এসবই শিশুদের মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও শিক্ষাগত বিকাশকে সরাসরি আঘাত করছে।

শিশুরা স্কুলে না গেলে তারা শুধু শিক্ষায় পিছিয়ে পড়ে না—তারা হারায় প্রতিদিনের শৃঙ্খলা, সামাজিকীকরণ, সহপাঠীদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ, শিক্ষার প্রতি আগ্রহ। দীর্ঘমেয়াদে এটি তাদের জীবনদক্ষতা ও আত্মবিশ্বাসেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

তাহলে প্রশ্ন উঠে— শিক্ষকের ন্যায্য দাবি পূরণ না হওয়া যেমন সমস্যা, শিশুদের পাঠদানে বাধা দেওয়া কি তার সমাধান? শিক্ষকদের আন্দোলন যৌক্তিক, কিন্তু পদ্ধতি কি যৌক্তিক?

সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব, প্রয়োজনীয় বাজেট না বরাদ্দ, প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা বাস্তবায়নে অনাগ্রহ—সব মিলিয়ে রাষ্ট্রই শিক্ষকদের ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। গত ৮–১২ নভেম্বর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচির পর আলোচনা হয়েছিল, প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ধীরগতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আন্দোলনকারীদের ফের রাস্তায় নামতে বাধ্য করেছে।

তার ওপর পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে দেড় শতাধিক শিক্ষক আহত হওয়ার ঘটনা শিক্ষকদের ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এভাবে সংঘাত বাড়তে বাড়তে এখন যেখানে এসে পৌঁছেছে তা আগেই অনুমান করা যেত। রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতার অভাব, অদক্ষ সমন্বয় ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি—এসবই আজকের সংকটকে তৈরি করেছে।

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত—পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই,প্রশিক্ষণের অভাব,শিক্ষকের মানোন্নয়নে বিনিয়োগ কম,শিশুবান্ধব পাঠদান পরিবেশ দুর্বল,বকেয়া অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সবচেয়ে বড় সমস্যা—শিক্ষক নিয়োগে দীর্ঘসূত্রিতা ও দায়িত্ববোধহীনতা।এই আন্দোলন সেই সব সমস্যাকে আরও প্রকট করে তুলেছে।দেশে তিন লাখ ৮০ হাজার শিক্ষক, অথচ একটি স্থিতিশীল কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা যায়নি।

উন্নত বিশ্বে যেখানে প্রাথমিক শিক্ষকরা সর্বোচ্চ সম্মানিত পেশার মধ্যে একটি, বাংলাদেশে সেখানে শিক্ষককে আন্দোলনে গিয়ে নিজের বেতন–গ্রেডের জন্য লড়াই করতে হয়। এটাই শিক্ষাব্যবস্থার বড় ব্যর্থতা।সরকার বলছে, ‘সমাধানের চেষ্টা চলছে।’শিক্ষকরা বলছেন, ‘দাবির নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চলবে।’এই দুই বক্তব্যের মাঝখানে কোথায় শিক্ষার্থীর কথাটি বলা হলো?

কোথায় তাদের শেখার অধিকার?এক দিনের পাঠদানও যখন শিশুর জ্ঞানের ধারাবাহিকতায় প্রভাব ফেলে, তখন দিনের পর দিন স্কুল বন্ধ থাকা কীভাবে গ্রহণযোগ্য?

প্রধান শিক্ষকরা দশম গ্রেডে—সহকারী শিক্ষকরা ১৩তম গ্রেডে। এমন বৈষম্য অবশ্যই দূর করতে হবে।
কিন্তু বৈষম্য দূর করতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে যারা—তারা কোনোদিনও তাদের হারানো সময় ফেরত পাবে না।

এই সংকটকে শুধুই শিক্ষক বনাম সরকারের দ্বন্দ্ব বলে দেখা ভুল হবে। এটি বহুস্তরীয় ব্যর্থতার ফল—শিক্ষকদের গ্রেড উন্নীতকরণ নিয়ে বছরের পর বছর কোনো বাস্তব সিদ্ধান্ত না হওয়া।বাজেট বরাদ্দ নামমাত্র বৃদ্ধি—এমন একটা দেশে যেখানে জনসংখ্যার চার ভাগের এক ভাগ শিশু।মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা হয়নি।প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে সমন্বিত নীতি ও কাঠামো নেই—যা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের স্থিতিশীলতা দিতে পারে।

এই কারণগুলো মিলে আজকের সংকট তৈরি করেছে।শিক্ষকরা যদি সম্মান না পান, শিক্ষার্থীরা যদি নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত শিক্ষাজগৎ না পায়—তবে উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন কাগজে–কলমেই থেকে যাবে।

সংকট সমাধান অসম্ভব নয়, বরং সহজ—যদি রাষ্ট্র ও আন্দোলনকারী উভয় পক্ষেই সদিচ্ছা থাকে। সমাধানের পথ হলো—অবিলম্বে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দিতে হবে—গ্রেড উন্নয়নের সময়সীমা, উচ্চতর গ্রেডের কাঠামো, বিভাগীয় পদোন্নতি শতভাগের রোডম্যাপ, শিক্ষকদের আস্থায় আনতে হবে। কথায় নয়, কাগজে–কলমে সিদ্ধান্ত।

ইউরোপ–মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশে শিক্ষা–অধিকারকে “অরাজনৈতিক” হিসেবে ধরা হয়। বাংলাদেশেও পরীক্ষাকে অক্ষত রাখা জরুরি। পরীক্ষা বন্ধ করে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া—এ সংস্কৃতি শিক্ষক সমাজের মর্যাদাকেও ক্ষুণ্ন করে।

স্বাধীন শিক্ষা–বিশেষজ্ঞ, সাবেক আমলা ও শিক্ষানীতিবিদদের নিয়ে একটি কার্যকর মধ্যস্থতা বোর্ড গঠন করা জরুরি। সরকার ও শিক্ষক উভয় পক্ষের কথা শুনে বাস্তব সমাধান দেবে।

শিক্ষকেরা সমাজ গঠন করেন। পর্যাপ্ত বেতন, গ্রেড উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ—এসব বাধ্যতামূলক করতে হবে।
একজন সম্মানিত শিক্ষকই একজন আত্মবিশ্বাসী ছাত্র তৈরি করতে পারে।

আজকের এই প্রাথমিক শিক্ষার সংকট শুধু গ্রেড বা বেতন–বৈষম্যের সংকট নয়। এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে রাষ্ট্রের উদাসীনতার প্রমাণ। আমরা যদি আগামী প্রজন্মকে দক্ষ, মানবিক, উন্নত মানসিকতার নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে চাই, তবে শিক্ষার ভিত্তি—প্রাথমিক শিক্ষা—কে রাজনীতি, আমলাতন্ত্র ও রাস্তার আন্দোলনের বাইরে রাখতে হবে।

শিক্ষকরা ন্যায্য দাবি তুলছেন—এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু রাষ্ট্রও তাদের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে যে পক্ষটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সে পক্ষটি সবচেয়ে নিরীহ—শিশুরা।

রাষ্ট্র, শিক্ষক, প্রশাসন—কেউই যেন ভুলে না যায়:
প্রাথমিক শিক্ষার মূল কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে একটি শিশু। তার হাসি, তার শেখা, তার ভবিষ্যৎ—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

আজকের প্রশ্নটি তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ— সরকার–শিক্ষক দ্বন্দ্বে ক্ষতিগ্রস্ত এই নিরীহ শিক্ষার্থীদের দিয়েই কি আমাদের ভবিষ্যৎ জাতি গঠিত হবে? এ কোন প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা?

লেখা: শিক্ষক ও গবেষক। 

শিক্ষাবার্তা /এ/৩০/১১/২০২৫

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading