।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
উইলিয়াম শেক্সপিয়ার বিদায়ের মর্মযন্ত্রণা আর মায়ার মিশ্র অনুভূতিকে বর্ণনা করতে লিখেছিলেন— “Parting is such sweet sorrow.” সত্যিই, বিদায় এমন এক অদ্ভুত অনুভূতি, যেখানে দুঃখের সাথে মিশে থাকে কৃতজ্ঞতা, স্মৃতি আর ভালোবাসার মধুরতা। আজ ঠিক সেই মধুর-তিক্ত আবেগেই আমরা মুখোমুখি হয়েছি এক প্রিয় শিক্ষক, এক আলোকবর্তিকার অবসর মুহূর্তের।
যিনি চার দশকেরও বেশি সময় ধরে শুধু পাঠদান করেননি—গড়েছেন মানুষ, জাগিয়েছেন স্বপ্ন, ছড়িয়েছেন শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও মানবিকতার আলো। তাঁর হাসি, তাঁর কথাবার্তা, তাঁর উপস্থিতি ছিল প্রতিষ্ঠানের জন্য এক আশ্রয়বৃক্ষের মতো। আজ তিনি কর্মজীবনের সমাপ্তি টানছেন, কিন্তু তাঁর অবদান, তাঁর ছাপ, তাঁর অনুপ্রেরণা—সবকিছুই থেকে যাবে চিরজাগ্রত হয়ে।
উত্তম কুমার হাজরা স্যারের পথচলা শুরু হয়েছিল রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উইলস লিটিল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজে আশির দশকে। তিনি শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেননি শুরুতে—কিন্তু সময়ের চাহিদা, পরিস্থিতির প্রয়োজনে এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে তিনি শিক্ষকতার পথ বেছে নেন। আর এই পথটাই পরিণত হয় তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ পরিচয়ে।
৪১ বছর ৬ মাস ১০ দিনের কর্মজীবন—বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় খুব কম মানুষের এমন দীর্ঘস্থায়ী, নিষ্ঠাবান ও সফল যাত্রার উদাহরণ আছে। তিনি সহকারী শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, পরে হয়েছেন শাখা প্রধান, আর শেষ পর্যন্ত প্রভাতি বাংলামাধ্যম শাখার সর্বজন-প্রিয় নেতৃত্ব।
এই দীর্ঘ সময়জুড়ে তিনি ছিলেন এক নিয়মতান্ত্রিক, পরিশ্রমী, নৈতিক ও ইতিবাচক মানুষ। যাঁরা তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন, তাঁরা বলেন—উত্তম স্যার কখনো রাগ দেখাতেন না, কখনো অহঙ্কার করতেন না, কখনো কাউকে অপমান করতেন না। বরং প্রতিটি সমস্যার কাছে যেতেন হাসিমুখে, খুঁজতেন সবচেয়ে মানবিক সমাধান।
নেতৃত্ব অনেক সময় পদ দিয়ে হয় না; নেতৃত্ব আসে চরিত্র দিয়ে। উত্তম কুমার হাজরা স্যার ছিলেন ঠিক তেমনই একজন—যাঁর নেতৃত্ব ছিল আচরণে, বন্ধুত্বে, ইতিবাচকতায়।
তিনি বিশ্বাস করতেন—“নেতা মানে সবার কাছে যাওয়া, সবাইকে নিয়ে এগোনো; শত্রুতা নয়, সহযোগিতা।”তাঁর সহকর্মীরা বলেন—যে কোনো সমস্যায় প্রথম যে নামটি মনে হতো, তা হলো উত্তম স্যার। কেউ ব্যক্তিগত সমস্যায়, কেউ অফিসিয়াল জটিলতায়, কেউ শিক্ষার্থীর আচরণগত ইস্যুতে—সব জায়গায় তিনি ছিলেন আশ্রয়। তিনি কখনো কাউকে বিব্রত করেননি, ভুল ধরলে তা করেছেন ভদ্রতার সঙ্গে, আবার প্রশংসা করলে দিয়েছেন আন্তরিকতা দিয়ে।
একজন শাখা প্রধান হিসেবে তিনি ছিলেন ভারসাম্যপূর্ণ, পরিণত, সমাধানমুখী। তাঁর নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় গুণ—নিজে উদাহরণ হয়ে থাকা। সময়ানুবর্তিতা ছিল তাঁর কাছে ধর্মের মতো, দায়িত্ববোধ ছিল তাঁর নৈতিক ভিত্তি, আর সহকর্মীদের প্রতি শ্রদ্ধা ছিল তাঁর চরিত্রের স্থায়ী অলংকার।
উত্তম কুমার হাজরা স্যার বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন তাঁর বাংলা পড়ানোর অনন্য দক্ষতার জন্য। বাংলা ব্যাকরণ, রচনা, সাহিত্য—এগুলোকে তিনি শুধু পাঠ্যবইয়ের অংশ হিসেবে পড়াতেন না; বরং শিক্ষার্থীর জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে আগ্রহজাগানিয়া করে তুলতেন। ক্লাসরুমে তাঁর উপস্থিতি ছিল প্রাণবন্ত, সহজ, সাবলীল—একটি নিরাপদ শেখার পরিবেশ।
শিক্ষার্থীরা বলতেন—“স্যার আমাদের রাগ দেখান না, কিন্তু শেখান ভালোবাসা দিয়ে।” আর ভালোবাসা দিয়ে শেখানো শিক্ষাই হৃদয়ে গেঁথে যায়।
একজন বাংলা শিক্ষক হিসেবে তিনি নতুন প্রজন্মকে ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল, শুদ্ধ উচ্চারণে পারদর্শী এবং লেখালেখির প্রতি আগ্রহী করে তুলতে অনবদ্য ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর মতো শিক্ষক যে একটি প্রতিষ্ঠানের অমূল্য সম্পদ, তা বলাই বাহুল্য।
একজন সহকর্মী স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এক বেদনাদায়ক সত্য তুলে ধরলেন—এই প্রতিষ্ঠানে এমনও শাখা প্রধান আছেন , যিনি দায়িত্বের স্থানে থেকেও ক্যান্টিনের টাকা আত্মসাৎ করেছিলেন। স্কুল ম্যানেজিং কমিটির কাছে সারাজীবন তোষামোদ করেছেন, ভুলকে সত্যে রূপান্তর করতে দ্বিধা করেননি।অসত্যের সঙ্গে আপস করেছেন, ক্ষমতার লোভে নীতিকে বিকিয়ে দিয়েছেন।
সেখানে উত্তম কুমার হাজরা স্যার ছিলেন এক দৃঢ় ভরসার নাম। তিনি কখনো অসত্যের সঙ্গে আপস করেননি, ক্ষমতার লোভে নীতিকে বিকিয়ে দেননি। ইস্পাতের মতো শক্ত নৈতিকতা ছিল তাঁর চরিত্রের মূলে। সততা, দায়িত্ববোধ ও নীতিতে অটল থেকে তিনি দেখিয়ে গেছেন—একজন মানুষ চাইলে প্রতিষ্ঠানকে নয়, নিজের সত্তাকেই উন্নত করতে পারেন। তাঁর মতো মানুষই প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সম্পদ। তাঁর অবসর শুধু কর্মজীবনের শেষ নয়; এটি এক সৎ, নীতিবান মানুষের বিজয়ীর মতো বিদায়।
উত্তম কুমার হাজরা স্যারের আরেকটি পরিচয়—তিনি ছিলেন উইলস স্কাউট গ্রুপের গ্রুপ স্কাউট লিডার।স্কাউট মানে চরিত্র গঠন, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ, জাতীয় মূল্যবোধ—এ সবকিছু তিনি নিজের জীবনে ধারণ করেছেন, এবং তা শিখিয়েছেন শিক্ষার্থীদের।
তাঁর নেতৃত্বে স্কাউট গ্রুপ এমন শক্ত ভিত্তি পায় যে উইলসের শিক্ষার্থীরা দেশের বাইরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলন, জ্যাম্বোরি, স্কাউট ক্যাম্পে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। যে শিক্ষক নিজের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিয়ে যেতে পারেন—তিনি নিঃসন্দেহে অগ্রজ, দূরদর্শী, এবং একটি প্রজন্মের স্বপ্ন তৈরি করেন।স্কাউট সদস্যরা তাঁকে বলতেন—“স্যার আমাদের পাশে থাকলে সবকিছু সহজ লাগে।”এই সহজতা কোনো দক্ষতার ফল নয়; এটি আসে হৃদয়ের মহত্ত্ব থেকে।
একজন ভালো শিক্ষক হওয়া কঠিন; কিন্তু একজন ভালো মানুষ হওয়া আরও কঠিন। উত্তম স্যার সেই কঠিন কাজটি সহজ করেছেন তাঁর পজিটিভ মাইন্ডসেট দিয়ে।তাঁর শত্রু ছিল না—এটি কোনো প্রশংসাবাক্য নয়, এটি বাস্তবতা।
তিনি কখনো কারও সম্পর্কে খারাপ কথা বলতেন না, কাউকে ছোট করতেন না, ঈর্ষা—অহংকার অসন্তোষ—এসবের কাছে তিনি কখনো মাথা নত করেননি।সহকর্মীরা তাঁকে ডাকতেন—“হাসিমুখের মানুষ”।
এই মানুষটাই আজ অবসর নিলেন। এ যেন প্রতিষ্ঠানের আঙিনা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
একটি চেয়ার খালি হলো, কিন্তু যে জায়গা তিনি রেখে যাচ্ছেন—তা কখনো পূরণ হওয়ার নয়।
একেবারে ঘরোয়া ভাবে স্যারের অবসর অনুষ্ঠান করা হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আ. ন. ম. শামসুল হক খান, শিক্ষক, কর্মচারী, স্কাউট সদস্য ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। কেক কাটা, শুভেচ্ছা, স্মৃতিচারণ—সবই ছিল, কিন্তু এর চেয়েও বেশি ছিল আবেগ।কারণ, তাঁকে কেন্দ্র করেই তো দীর্ঘদিন একটি শাখা পরিচালিত হয়েছে সফলভাবে।
অধ্যক্ষ আন-ম-ম শামসুল হক খান উল্লেখ করেন—
“উত্তম স্যার শুধু একজন শিক্ষক নন; তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের প্রাণ, একটি পরিবারিক ঐক্যের প্রতীক।”
একজন প্রশাসনিক প্রধানের মুখে এমন মূল্যায়নই বলে দেয়—এই মানুষটি কতটা শ্রদ্ধার আসনে ছিলেন।
প্রভাতি শাখার প্রধান, বাংলা শিক্ষক, স্কাউট লিডার—উত্তম কুমার হাজরা স্যার ছিলেন বহুমাত্রিক মানুষ।
সহকর্মীরা তাঁকে ডেকে বলেছিলেন—“স্যার, আপনি আমাদের অভিভাবক।”শিক্ষার্থীরা বলেছে—“স্যার, আপনাকে ছাড়া আমাদের স্কুল অসম্পূর্ণ।”অভিভাবকেরা বলেছেন—“স্যার সবসময় হাসিমুখে কথা বলেন।”
এমন মানুষ আজকাল ক’জনই বা দেখা যায়?এই প্রশ্নই বলে দেয় তিনি কত বড় জায়গা দখল করে ছিলেন সকলের হৃদয়ে।
একজন মানুষের জীবনের সার্থকতা তখনই পূর্ণতা পায় যখন তার কর্ম পৃথিবীতে আলোর রেখা রেখে যায়। কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা বলেন—
“যে ব্যক্তি একটি প্রাণকে জীবিত রাখে, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে জীবিত রাখল।” (সূরা মায়েদা, ৫:৩২)
শিক্ষকতা ঠিক সেই মহৎ কাজ—যা মানুষের মন, চরিত্র, চিন্তা ও জীবনের দরজা খুলে দেয়। একজন শিক্ষক তার জ্ঞান ও নৈতিকতার মাধ্যমে অসংখ্য মানুষকে “জীবিত” করে দেন—মানসিকভাবে, নৈতিকভাবে, বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে। উত্তম কুমার হাজরা স্যারও তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে ঠিক এই কাজটিই করে গেছেন—মানুষ গড়েছেন, আলো বপন করেছেন।
হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—“মানুষ মারা গেলে তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়; তিনটি ছাড়া—সদকায়ে জারিয়া, উপকারী জ্ঞান, এবং নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।”(সহিহ মুসলিম)
একজন প্রকৃত শিক্ষক তাঁর রেখে যাওয়া উপকারী জ্ঞান এর মাধ্যমে মৃত্যুর পরও সওয়াব পেতে থাকেন। তাঁর দেওয়া শিক্ষা যখনই কোনো শিক্ষার্থীর জীবনে কাজে আসে, তখনই তা হয় “সদকা জারিয়া”—চলমান নেকি।
উত্তম কুমার হাজরা স্যার তাঁর চার দশকেরও বেশি সময় ধরে যে জ্ঞান, নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও মানবিকতার আলো বিলিয়েছেন—তা নিঃসন্দেহে তাঁর কর্মজীবনকে করে তুলেছে “চলমান আমল”-এর সমতুল্য। এ কারণেই তাঁর অবসরকে “অবসান” বলা গেলেও এ আলো নিভে যায়নি—বরং ছড়িয়ে পড়েছে অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবনে, প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে এবং সহকর্মীদের হৃদয়ে।
কোরআনে আরও বলা হয়েছে—“নিশ্চয়ই ভালো কাজ কখনো নষ্ট হয় না।” (সূরা ইয়ুসুফ, ৯০) একজন সৎ, নিবেদিতপ্রাণ, হাসিমুখের শিক্ষক হিসেবে উত্তম স্যার যে সুকাজের ভাণ্ডার রেখে গেলেন—তা আল্লাহর কাছে অবশ্যই কবুল হবে, ইনশাআল্লাহ।
অতএব, তাঁর অবসর কোনো শূন্যতা নয়; এটি এক আলোকিত অধ্যায়ের সুন্দর সমাপ্তি এবং নতুন সম্ভাবনা ও প্রার্থনার সূচনা। আমি প্রার্থনা করি—আল্লাহ তাঁকে সুস্থ রাখুন, শান্তিতে রাখুন, এবং তাঁর কর্মকে কবুল করুন। আমিন
লেখা: সম্পাদক, শিক্ষাবার্তা।
শিক্ষাবার্তা /এ/৩০/১১/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
