এইমাত্র পাওয়া

৪০ বছর নামমাত্র অনুদানে চলছে ইবতেদায়ি মাদ্রাসা

ঢাকাঃ দেশে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার সংখ্যা সাত হাজার ৪৫১টি, এর মধ্যে মাত্র এক হাজার ৫১৯ মাদ্রাসার শিক্ষকরা সরকারি অনুদান পান। বাকি পাঁচ হাজার ৯৩২ মাদ্রাসার শিক্ষকরা দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে সরকারি বেতন-ভাতা পান না। অথচ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো একই পাঠ্যক্রমে তারা শিক্ষার্থীদের পড়ান। সব প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারীকরণ করায় ইবতেদায়ি শিক্ষকরা চান তাদেরও জাতীয়করণ হোক। এই দাবিতে টানা ১৭ দিন ঢাকার রাজপথে অবস্থান, সমাবেশ, লংমার্চ, ভুখা মিছিল সবই করছেন শিক্ষকরা।

অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর সরকারি অনুদানভুক্ত মাদ্রাসার মধ্যে বাছাই করে এক হাজার ৯০টিকে এমপিওভুক্ত করার জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়। কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ দুই দফা আশ্বাস দেওয়ার পরও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এখনও তা হয়নি। এতে ক্ষুব্ধ শিক্ষকরা গত ১৩ অক্টোবর থেকে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান নিয়েছেন।

সর্বশেষ গতকাল বুধবার প্রেস ক্লাব থেকে সচিবালয় অভিমুখে তাদের মিছিল ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ। এ সময় তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে। পুলিশের লাঠিপেটায় অর্ধশত শিক্ষক আহত হন বলেও অভিযোগ করেছেন আন্দোলনকারীরা।

স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষক ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান কাজী মোখলেছুর রহমান গতকাল বলেন, পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে আমরা শান্তিপূর্ণ ভুখা মিছিল করছিলাম। সচিবালয়ের পঞ্চম গেটের সামনে অবস্থান নিয়ে আমরা শিক্ষা উপদেষ্টার কাছে দাবি-দাওয়া জানাচ্ছিলাম। এ সময় পুলিশ আমাদের লাঠিপেটা করে। এতে অর্ধশত শিক্ষক আহত হয়েছেন।

ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষাচিত্র
ইবতেদায়ি অর্থ প্রাথমিক স্তর। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, অনুদানভুক্ত এক হাজার ৫১৯টি মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা এবং সহকারী শিক্ষকরা তিন হাজার টাকা করে অনুদান পাচ্ছেন। এই টাকাও ছাড় হয় তিন মাস পরপর।

ইসলামী ও সাধারণ শিক্ষার সমন্বয়ে যে শিক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে, সেই আলিয়া মাদ্রাসা পদ্ধতিতে পঠন-পাঠন হয় ইবতেদায়ি মাদ্রাসায়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সমমান এই ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তন হয় ১৯৮৪ সালে। এর পর চার দশক কেটে গেলেও শিক্ষকরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের অনেকেই কর্মজীবন শেষ করেছেন কোনো রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই। অথচ ১৯৭৩ সাল থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ হচ্ছে; ২০১৩ সালেও একসঙ্গে ২৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারি হয়েছে।

দীর্ঘদিন জাতীয়করণের দাবি জানিয়ে আসা স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষকরা জোরালো আন্দোলন গড়ে তোলেন গত বছর ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর। এর মধ্যে এ বছরের শুরুতে তাদের একটি পদযাত্রায় পুলিশ লাঠিপেটা ও জলকামান ব্যবহার করে।
বয়োজ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের পিটুনির সেই ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে। এক পর্যায়ে গত ২৮ জানুয়ারি শিক্ষকদের কর্মসূচিতে এসে এসব মাদ্রাসাকে পর্যায়ক্রমে জাতীয়করণের ঘোষণা দেন মাদ্রাসা অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব এস এম মাসুদুল হক।

দাবি পূরণ কতদূর
গত ৫ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছাড়ার আগে ইবতেদায়ি মাদ্রাসাগুলো এমপিওভুক্তির প্রস্তাবে অনুমোদন দেন সাবেক শিক্ষা ও বর্তমান পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। এর পর সেই প্রস্তাব প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে পাঠানো হয়।

স্বতন্ত্র ইবতেদায়ির শিক্ষক সংগঠনগুলোর মোর্চা স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষক ঐক্যজোটের মহাসচিব শামসুল আলম বলেন, প্রথম যখন প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়, সেখানে সংযুক্ত ইবতেদায়ি মাদ্রাসাগুলোর তথ্যও পাঠানো হয়েছিল। তবে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে পুনঃযাচাইয়ের জন্য নথি ফেরত পাঠানো হয়। এ প্রক্রিয়ায় অনেকটা সময় লেগে যায়। পরে শুধু স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার নথি পাঠানো হয়।

তিনি বলেন, স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা এমপিওভুক্তি ও ধাপে ধাপে সরকারীকরণে সরকার আশ্বাস দিলেও সংযুক্ত মাদ্রাসা নিয়ে কোনো ঘোষণা ছিল না। অথচ মন্ত্রণালয়ের কোনো কোনো আমলা সংযুক্ত ইবতেদায়ি মাদ্রাসাগুলোকে এর সঙ্গে যোগ করেন, ফলে টাকার অঙ্ক অনেক বড় হয়ে যায়, নথি অনুমোদনের প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়। এমনটা না হলে গত মে মাসের শুরুতেই আমরা এমপিও পেতাম।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কারিগরি এ মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের দুজন কর্মকর্তা জানান, এসব মাদ্রাসার এমপিওভুক্তির কাজ চলছে। জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে তথ্য নিয়ে অনুদানভুক্ত ইবতেদায়ি মাদ্রাসাগুলোর মধ্যে প্রাথমিকভাবে এক হাজার ৯০টি এমপিওভুক্ত করতে অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছি। এ জন্য একটি নীতিমালার খসড়াও প্রস্তুত করা হয়। এসব মাদ্রাসার জনবল কাঠামো ও বেতন-ভাতার জন্য ২০১৮ সালে প্রথম নীতিমালা করেছিল কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ। যদিও সেই নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষকরা সুযোগ-সুবিধা পাননি। এখন নতুন করে যে নীতিমালার খসড়া করা হয়েছে, তা অর্থ মন্ত্রণালয়ে গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ নীতিমালায় ইবতেদায়ি প্রধানদের বেতন ১১তম গ্রেডে এবং ইবতেদায়ি শিক্ষক, কারি ও মৌলভি পদের বেতন ১৩তম গ্রেডে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। সূত্র জানায়, প্রতিটি ইবতেদায়ি মাদ্রাসায় সাতটি পদ থাকবে। এর মধ্যে একটি পদ ইবতেদায়ি প্রধানের এবং সহকারী শিক্ষকের পদ পাঁচটি। এর মধ্যে দুজনের পদবি শিক্ষক, একজনের মৌলভি এবং আরেকটি পদের নাম কারি। বাকি পদটি অফিস সহায়কের, যার বেতন হবে ২০তম গ্রেডে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, ইবতেদায়ি মাদ্রাসার এমপিওভুক্তি প্রক্রিয়া অনেকটাই গুছিয়ে আনা হয়েছে। এমপিও নীতিমালার খসড়াও প্রস্তুত।

লাগবে ১০ কোটি টাকা
মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, এমপিওভুক্ত করে এই শিক্ষকদের বেতন দিতে ৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকা লাগবে। অনুদানভুক্ত স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার সংখ্যা এক হাজার ৫১৯টি হলেও বর্তমানে অনুদান পাচ্ছেন এক হাজার ৩৩৮টি মাদ্রাসার চার হাজার ৪৩৭ শিক্ষক। ১৮১টি স্বতন্ত্র এবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষকরা অনুদান নেন না, সেগুলোর বেশির ভাগই নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত হয়।

বর্তমানে চার হাজার ৪৩৭ শিক্ষককে অনুদান দিতে মাসে এক কোটি ৪৮ লাখ ৩৭ হাজার টাকার প্রয়োজন হয়। এমপিওভুক্ত হলে সরকারকে প্রতি মাসে গুনতে হবে ৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকা।

নেতারা যা বলছেন
স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষক ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান কাজী মোখলেছুর রহমান বলেন, দীর্ঘ ৪০ বছর বঞ্চিত এসব মাদ্রাসার শিক্ষকরা। শিক্ষকরা যে অনুদান পান, তাতে কিছুই হয় না। আমরা চাই জাতীয়করণ।

স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষা উন্নয়ন বাংলাদেশের মহাসচিব রেজাউল হক বলেন, ১৯৭৮ সালের অর্ডিন্যান্স ও ১৯৮৪ সালে মাদ্রাসা বোর্ডের নিবন্ধনের মাধ্যমে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার প্রাথমিক শিক্ষার সমতুল্য শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। এক সময় শিক্ষার্থীরা উপবৃত্তি ও ফিডিং সুবিধা পেলেও ২০২২ সাল থেকে তা বন্ধ হয়ে গেছে।

শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/৩০/১০/২০২৫


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading