।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
ঢাকার এক ব্যস্ত মোড়ে মফিজের ( ছদ্দ নাম) ছোট্ট চায়ের দোকান। দোকান ছোট, আয় কম, কিন্তু পরিশ্রমে সংসার চলে। সরকার বদলের পর সে ভেবেছিল শহরে হয়তো কিছুটা স্বস্তি ফিরবে।
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে মানুষ হালকা আশার আলো দেখেছিল—হয়তো এবার রাজনৈতিক দখলদারি কমবে, হয়তো ফুটপাত দখল কমবে, হয়তো চাঁদা দাবির ভয়াবহতা কমে যাবে।
কিন্তু মফিজের বাস্তবতা উল্টো পথে হাঁটল।
দোকানে প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন দলের পরিচয়ে লোক আসে—
“এলাকার উন্নয়নে লাগবে।”
“কমিটির ফান্ড।”
“এই মাসের রেট।”আগে ১০০ টাকা নিলে এখন ২০০, কখনো ৩০০ টাকা দাবি করে।
একদিন তিনজন যুবক এসে দাঁড়ালো। “নতুন চাঁদা লাগবে। রেট ডাবল। সবাই দিচ্ছে। তুমি বাদ যাবে কেন?”
মফিজ আর নীরব থাকতে পারল না। ফুসে ওঠা ক্ষোভ এক শ্বাসে বেরিয়ে এলো—“ভাই, ভিক্ষার দরকার নাই। আমরা ভিক্ষা চাই না, আমরা শান্তিতে বাঁচতে চাই। আপনারা আগে নিজেদের মানুষ সামলান। প্রতিদিন নতুন নতুন দলের নামে যারা আসে তাদের থামান। নইলে দোকান চালাব কীভাবে?”
তার কণ্ঠের ক্লান্ত দৃঢ়তা যুবকদের থামিয়ে দিল। তারা একে অন্যের দিকে তাকিয়ে বলল, “চল, লোকটা আর পারছে না।” তারপর সরে গেল।
সেদিন মফিজ বুঝল—সাধারণ মানুষের সত্যিকারের চাপা ক্ষোভ এখন আর চাপিয়ে রাখা যাচ্ছে না।
চাঁদাবাজি হঠাৎ বেড়ে যায় না। এর পেছনে থাকে রাজনৈতিক অব্যবস্থাপনা, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক দখলদারি, এবং ক্ষমতাহীন প্রশাসন।
আগস্টের শুরুতে নতুন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলেও প্রশাসনে স্থিতি আনতে সময় লেগেছে। এই সময়টুকুই নানা দখলদারির জন্য উর্বর ভূমি হয়ে ওঠে। যখনই ক্ষমতার রদবদল ঘটে, তখন কিছু মানুষ নিজেদের সুযোগসন্ধানী পরিচিতি পুনর্গঠন করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ফলে—ফুটপাত দখল বাড়ে,পরিবহন খাতে চাঁদা বাড়ে,বাজার নিয়ন্ত্রণ বেসামাল হয়,ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ দ্বিগুণ হয়।
বিভিন্ন দলের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নতুন নতুন গ্রুপ তৈরি করেছে। প্রতিটি গ্রুপ নিজেকে “এলাকার নিয়ন্ত্রক” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ফলে একই এলাকায় ৩–৪টি গ্রুপ চাঁদার ভাগ চায়।
আগে যেখানে একদল নিয়ন্ত্রণ করতো, এখন তিন দল দাবি করছে। ব্যবসায়ীদের জীবন সেখানে জ্বালাও-পোড়ানোর মতোই।
ঢাকার ফুটপাত এখন আর শুধু পথচারীর জন্য নয়—এটা হয়ে গেছে এক বিশাল অর্থনৈতিক বাজার।ফুটপাত,হকার স্পট,পার্কিং স্পট,লোড-আনলোড,স্থানভিত্তিক সুরক্ষা ফি।
সব মিলিয়ে পুরো শহরই যেন হয়েছে “ভাড়া তোলা অর্থনীতির রংবাজার”
নতুন প্রশাসন এখনও সব জায়গায় শক্তভাবে দাঁড়াতে পারেনি। সিসিটিভি আছে, পুলিশ আছে—কিন্তু মাঠপর্যায়ে নজরদারি দুর্বল। দখলদাররা সুযোগ পেয়ে গেছে।
যারা রাজনীতি নিয়ে গবেষণা করছেন, তারা বলছেন এটি কেবল অর্থনৈতিক সংকট নয়—এটি একটি রাজনৈতিক আচরণের সংকট।
রাজনীতি বিজ্ঞানীরা বলছেন-বাংলাদেশে অনেক দিন ধরেই “ক্ষমতায় থাকা মানে সুবিধা নেওয়ার সুযোগ”—এই মানসিকতা রাজনীতির মূল কাঠামোতে ঢুকে গেছে।
ক্ষমতা → দখল → অর্থ → প্রভাব → আবার ক্ষমতা।এই চক্র ভাঙা হচ্ছে না।
যে সব কর্মীরা একসময় মেসে ভাত জুটাতে পারত না, এখন তারা দামি গাড়িতে ওঠে—এমন মন্তব্য সমাজে আলোচনার কেন্দ্রে। এটা রাজনৈতিক নেতৃত্বের নৈতিকতা প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
যখন চাকরি নেই, আয় কম, আর রাজনৈতিক দখলদারি বেশি—তখন চাঁদাবাজি অনেকের কাছে “একটা সহজ অর্থ আয়ের পথ” মনে হয়।
এটা ভয়ংকর।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন-বাজারে অস্থিরতা, চাল-ডাল-তেল-কাঁচামাল—সবই বাড়ছে।ডলার সংকটের কারণে আমদানি খরচ বেড়েছে। বাণিজ্য খাতে অস্থিরতা ক্ষুদ্র ব্যবসাকে চাপের মুখে ফেলেছে।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, “চাঁদাবাজি এখন একটি অনিয়ন্ত্রিত ‘পরোক্ষ কর ব্যবস্থায়’ পরিণত হয়েছে, যা রাষ্ট্র নয়—দলীয় গোষ্ঠীরা চালাচ্ছে।”
সামাজিক কর্মীরা বলছেন—“আমরা উন্নয়ন চাই না তা নয়; কিন্তু আগে আমাদের নিরাপত্তা ফেরত দিন। আমরা ভিক্ষা চাই না, আমাদের দম বন্ধ করা চাঁদাবাজি বন্ধ করুন।”
শহরের মধ্যবিত্ত, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, রিকশাচালক, হকার—সবাই একই কথা বলছে: “আমাদের বাঁচতে দিন।”
এই দৌরাত্ম্য থামাতে হলে-চাঁদাবাজি বন্ধ করা সম্ভব—যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে।প্রতিটি দলের উচিত নিজেদের গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা।দলে অপরাধী শাখা থাকতে পারে না।রাজনৈতিক পরিচয় অপরাধের ঢাল হতে পারে না।দখলদারদের সরাসরি শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।দলগুলোর এই আত্মশুদ্ধি ছাড়া কোনো উন্নতি হবে না।
মানুষ যত বেশি মুখ খুলছে, দখলদাররা তত বেশি পিছিয়ে যাচ্ছে। মফিজের মতো মানুষের কণ্ঠস্বরই একদিন চাঁদাবাজির চক্র ভাঙবে । ড. আকবর আলী খানের ‘শুয়োরের বাচ্চা অর্থনীতি’—আজ কেন প্রাসঙ্গিক?
ড. আকবর আলী খান একসময় ব্যাখ্যা করেছিলেন, বাংলাদেশে এমন এক ধরনের অর্থনীতি তৈরি হয়েছে যেখানে সবাই নিজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়, আর সাধারণ মানুষের স্বার্থ উপেক্ষিত থাকে। তিনি একে নাম দিয়েছিলেন “শুয়োরের বাচ্চা অর্থনীতি”—যেখানে,কেউ কারও ভালো চায় না,সবাই শুধু নিজের লাভ দেখে, সমাজের সামষ্টিক স্বার্থ বিলীন হয়ে যায়।
আজকের চাঁদাবাজি, ফুটপাত দখল, রাজনৈতিক সুবিধা—সবই সেই তত্ত্বকে আবারও প্রমাণ করছে।এই অর্থনীতি মানুষকে নয়—লোকদেখানো ক্ষমতা, দখল, দাদন, আর অসৎ উপার্জনকে বড় করে তোলে। ফলে রাষ্ট্র দুর্বল হয়, সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর মানুষের মন থেকে ন্যায়বোধ হারিয়ে যায়।
মানুষ আজ একটাই কথা বলছে—“আমরা ভিক্ষা চাই না। আমাদের নিরাপত্তা দিন, শান্তিতে বাঁচতে দিন। দেশকে আবার মানুষের জন্য ফিরিয়ে আনুন।”
যদি রাজনীতি এই কথার মূল্য দিতে না পারে, তাহলে সমাজ আরও গভীর অবক্ষয়ের দিকে যাবে। আর যদি মূল্য দেয়—তাহলেই ড. আকবর আলী খানের সতর্কবাণী সত্যিকার অর্থে পূর্ণ হবে: অর্থনীতি ও রাজনীতির নোংরা চক্র ভেঙে একটি মানবিক রাষ্ট্র গড়ে উঠবে।
শিক্ষাবার্তা /এ/২৫/১১/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
