মো: তরিকুল আলম: লেখার শুরুতেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধিনে রিসোর্স শিক্ষক হিসেবে কর্মরত থাকায় মন্ত্রনালয়ের সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করছি পাশাপাশি এই লেখাটিকে ছাত্র- শিক্ষক ও শিক্ষানুরাগী মহলের ভাবনা এবং প্রধান উপদেষ্টা কর্তৃক প্রাপ্ত স্বাধীনভাবে লিখতে পারার অধিকার চর্চার মাধ্যম হিসেবে বিষয়টিকে গ্রহণ করার জন্য পাঠকদের-প্রতি অনুরোধ করছি।
গত সপ্তাহজুড়ে শিক্ষা ক্যাডার, প্রশাসনের কর্মকর্তা, ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিদের কাছে একটি বহুল আলোচিত বিষয় হচ্ছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক নিয়োগে শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের বিজ্ঞপ্তি। আপাত দৃষ্টিতে বিষয়টি স্বভাবিক মনে হলেও শিক্ষা ক্যাডার এর এই সর্বোচ্চ পদে একজন মহাপরিচালক কর্মরত থাকা অবস্থায় এই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ অনেক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ৬ অক্টোবর প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদে কাজ করতে আগ্রহী বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের ১৬তম এবং তদূর্ধ্ব ব্যাচের কর্মকর্তাদের আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ জীবনবৃত্তান্তসহ অফলাইনে আবেদন করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে । বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয় যে আগ্রহী প্রার্থীকে সৎ, দায়িত্বপরায়ণ ও প্রশাসনিক কাজে দক্ষ হতে হবে।
উক্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হলে বর্তমানে চলতি দায়িত্বে থাকা মহাপরিচালক অধ্যাপক ডক্টর মোহাম্মদ আজাদ খান আত্মসম্মান রক্ষার্থে শারীরিক অসুস্থতা জনিত কারণ দেখিয়ে গত ৭ অক্টোবর মহাপরিচালক পদ থেকে নিজের অব্যাহতি চেয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বরাবর লিখিত আবেদন করেন।
প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আজাদ গত ২০ ফেব্রুয়ারি ২৫ তারিখ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর এর মহাপরিচালক হিসেবে যোগদান করেন। ডিজি হিসেবে যোগদানের পূর্বে তিনি জামালপুরের সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মাউশির ডিজি হিসেবে যোগদানের পর তিনি নিজেকে নিষ্টাবান, সৎ ও কর্তব্যপরায়ণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন । মাউশির মহাপরিচালক হিসাবে তার অন্যতম দৃশ্যমান সফলতা হলো মাসের শুরুতেই শিক্ষকদের বেতন প্রদান, অধস্তন অফিসও কর্মিদের মনিটরিং এবং দাপ্তরিক কাজ সম্পাদন, অনিয়ম দূরীকরণে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ ও মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত সেসিপ প্রকল্পের আর্থিক স্বচ্ছতা ও প্রকল্পের উদ্দেশ্য অর্জনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন। সেসিপ প্রকল্পের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর হিসাবে এর সফলতা ও প্রয়োজনীয়তা উচ্চ মহলে সফলভাবে উপস্থাপন করলে এই প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি পায় এবং দীর্ঘ পাঁচ মাস পর প্রায় ১৮০০ জন শিক্ষক কর্মকর্তা কর্মচারীর বেতন ভাতা চালু হয় ও মাধ্যমিক শিক্ষায় গতি ফিরে আসে।
সম্প্রতি মাননীয় শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডঃ চৌধুরী রফিকুল আবরার মহোদয় সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেন একজন কর্মকর্তা একটি নিদৃষ্ট পদে পদায়নের জন্য ১ কোটি টাকার প্রস্তাব দেন এবং তিনি তা প্রত্যাখান করে সৎতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তিনি ঐ কর্মকর্তার নাম উল্লেখ না করলেও পরবর্তিতে শিক্ষক-কর্মচারি প্লাটফর্মের ব্যানারে আয়োজিত ১৪/৯/২৫ তারিখের সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষক নেতারা একজন পরিচালকের নাম উল্লেখ করেন যিনি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মনিটরিং এন্ড ইভালুয়েশান উইং এ পরিচালক হিসাবে কর্মরত ছিলেন।
মনিটরিং এন্ড ইভালুয়েশান উইং এর ঐ পরিচালকই সেই এক কোটি টাকার অফার দাতা কিনা তা নিশ্চিত হওয়া না গেলেও মাউশির মহাপরিচালক প্রফেসর ড.মোহাম্মদ আজাদ খানের প্রতি ঐ পরিচালকের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরনের একাধিক ঘটনা সম্প্রতি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় উঠে আসে।
বিশেষ করে মহাপরিচালক প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আজাদ খান মহোদয় বিভিন্ন উইং এর পরিচালকদের সাথে নিয়ে প্রত্যেকের সদিচ্ছায় বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সামাজিক চিন্তাবিদ ফরহাদ মজহার স্যার এর সাথে অধিদপ্তরের হলরুমে শিক্ষা দর্শন বিষয়ে মতবিনিময় করেন তখন উক্ত পরিচালক কাজী কাইয়ুম শিশির হল রুম ত্যাগ করেন এবং ফেসবুক পোষ্টের মাধ্যমে ফরহাদ মাজারকে স্ত্রী কোটায় উপদেষ্টা বলে কটুক্তি করেন যা বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। প্রফেসর মোহাম্মদ আজাদ খান তাকে জোর করে এই মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণ করিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন।
পরবর্তীতে সেই পরিচালকের কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই অধিদপ্তরের পরিচয় দিয়ে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করা এবং ভুক্তভোগী সাংবাদিক মহাপরিচালক বরাবর কাজী কাইয়ুম শিশির স্যারের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিলে অধিদপ্তর কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করে।
উক্ত ঘটনাগুলোকেই শিক্ষিত মহল মহাপরিচালক পরিবর্তনের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের কারণ হিসেবে বিবেচনা করছেন। মহাপরিচালক মহোদয় অপরাধ করলে বা নিজেকে মহাপরিচালক পদে যোগ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে না পারলে তাকে অব্যাহতি দেয়া বা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যেত যেহেতু এরকম কোন কিছুই ঘটেনি তাই অনেকেই ধরেই নিচ্ছে কোন একটা পক্ষকে খুশি করার জন্যই এই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে।
সরকারি চাকরিতে শূন্য পদের বিপরীতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের বিধান রয়েছে কিন্তু শিক্ষা ক্যাডারের সর্বোচ্চ এই পদে একজন কর্মকর্তা কর্মরত থাকাকালীন সময়েই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশকে অনেকেই স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছেন না এবং আইনের ব্যত্যয় ঘটেছে বলে সংশয় প্রকাশ করছেন। এই ঘটনাকে কেউ কেউ কোন ব্যক্তির মারা যাওয়ার আগেই তার নামাজে জানাজা আদায়ের মতো ঘটনাকে তুলনা করছেন যার মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ের নৈতিক নগ্নতার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে বলে মনে করা হচ্ছে।
৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতন হলে তৎকালীন মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক নেহাল আহমেদ মহোদয়২১আগস্ট ২০২৪ তারিখ পদত্যাগ করেন। এই শূন্য পদে ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন অধ্যাপক এবি এম রেজাউল করিম মহোদয় এবং ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪ সালে তিনি চলতি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি অবসরে গেলে পদটি আবার শূন্য হয়। দীর্ঘ এক মাস শূন্য থাকার পর ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখ নিয়োগ পান অধ্যাপক এহতেসাম উল হক মহোদয় কিন্তু ১৯ দিনের মাথায় শিক্ষক নেতাদের আন্দোলনের মুখে তাকে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করে মাউশি থেকে প্রত্যাহার করা হয়। মহাপরিচালকের এই পদ টি আবার শূন্য হলে ২০ফেব্রুয়ারি২০২৫ তারিখ প্রফেসর ডঃ মুহাম্মদ আজাদ খান মহোদয় কে নিয়োগ দেয়া হয়। ৫ আগস্ট ২০২৪ এর পর এই ১৩ মাসেই পঞ্চম মহাপরিচালক নিয়োগের উদ্দেশ্যে গত ৬ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে এই বিজ্ঞপ্তি টি প্রকাশিত হয় যা অনেক আলোচনার জন্ম দিচ্ছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে একজন সৎ,নিষ্ঠাবান ও কর্তব্য পরায়ণ ব্যক্তি বঞ্চিত হলে তিনি অপমান বোধ করেন এবং অপমান থেকে সৃষ্টি হয় অভিমান আর দুষ্কৃতকারী বঞ্চিত হলে সৃষ্টি হয় ক্ষোভ ও ষড়যন্ত্র যা জুলাই চেতনাকে ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট।
লেখক: রিসোর্স শিক্ষক (ইংরেজি), সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম
শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
