সেফ এক্সিটের রাজনীতি: কে যেতে চায়, কে থাকতে চায়?

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।। 

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রতিটি সংকটই নতুন এক বাস্তবতার জন্ম দেয়। এই বাস্তবতাগুলো কখনো নতুন পথ দেখায়, কখনো আবার পুরোনো ক্ষতকে পুনর্জাগরিত করে। সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত শব্দ—‘সেফ এক্সিট’—রাজনীতির অভিধানে এখন নতুন এক সংযোজন। এই শব্দটি কেবল একদল বা এক নেতার প্রস্থান নয়, বরং ক্ষমতার কাঠামোর ভিতরকার ভাঙচুর, দ্বন্দ্ব ও আত্মরক্ষার প্রবণতার প্রতিফলন। কে যেতে চায়, কে থাকতে চায়—এই প্রশ্নটি এখন কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং রাষ্ট্রীয়, সাংবিধানিক এবং নৈতিকতার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাজনীতির প্রকৃতি কখনো একরৈখিক নয়। সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম তত্ত্ব—‘দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ’—বলছে, প্রতিটি পরিবর্তনের ভিতরেই লুকিয়ে থাকে দুই বিপরীত শক্তির সংঘাত। কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডারিক এঙ্গেলস এই তত্ত্বের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেখিয়েছিলেন, সমাজের উন্নয়ন কখনো নিস্তব্ধতায় নয়, বরং দ্বন্দ্বে ও সংঘাতে ঘটে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক যে “জাতীয় ঐকমত্য কমিশন” গঠিত হয়েছে, তা এক অর্থে সেই দ্বন্দ্বেরই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।

৩০টি রাজনৈতিক দল, ভিন্ন মত, ভিন্ন মতাদর্শ—সবাই এক টেবিলে বসেছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তনের প্রত্যাশায়। কিন্তু অচিরেই দেখা গেছে, ঐকমত্যের জায়গা যতটা প্রশস্ত হওয়ার কথা ছিল, বাস্তবে ততটা হয়নি। দ্বন্দ্বের মধ্য থেকেই আবার জন্ম নিচ্ছে নতুন নতুন প্রশ্ন, নতুন ধারণা। এরই ধারাবাহিকতায় এসেছে ‘জুলাই সনদ’, গণভোটের বিতর্ক, আর তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘সেফ এক্সিট’-এর আলোচনাও।

গণভোট নিয়ে যে ঐকমত্যের ঘোষণা এসেছে, তা আপাতদৃষ্টিতে আশাব্যঞ্জক হলেও বাস্তব জটিলতা ভয়াবহ। রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছে যে জনগণের মতামত নেওয়া জরুরি, কিন্তু ‘কীভাবে’ নেওয়া হবে—এখানেই শুরু হয়েছে নতুন দ্বন্দ্ব। বিএনপি ও এনসিপি চাইছে নির্বাচনের দিনেই গণভোট হোক, জামায়াত চাইছে নভেম্বরেই আগে করা হোক। কেউ বলছে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক আদেশে করা হোক, কেউ বলছে সংবিধান সংশোধন ছাড়া তা আইনত সম্ভব নয়।

এই মতভেদের মধ্যে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠছে—গণভোট আদৌ কতটা প্রয়োজনীয়? যদি প্রশ্নগুলোর মধ্যে দ্ব্যর্থতা থাকে, যদি ‘না’ বা ‘হ্যাঁ’—এই দুই শব্দে কোনো জটিল প্রশ্নের উত্তর না মেলে, তবে সেই ভোটের মানে কী? ইতিহাস বলছে, বাংলাদেশে এর আগে তিনটি গণভোট হয়েছে—১৯৭৭, ১৯৮৫ ও ১৯৯১ সালে—প্রতিবারই একটি স্পষ্ট প্রশ্ন রাখা হয়েছিল। এবারের প্রস্তাবিত গণভোটের প্রশ্নগুলো তেমন নয়। তাই হোসেন জিল্লুর রহমান যথার্থই বলেছেন—“যে প্রশ্নের একাধিক অংশে ভিন্ন ভিন্ন জবাব হতে পারে, সেটি গণভোটের বিষয় হতে পারে না।”

এই সাংবিধানিক বিভ্রান্তি ও প্রশাসনিক জটিলতার মাঝেই এসে পড়েছে নতুন আলোচ্য বিষয়—সেফ এক্সিট।

রাজনীতিতে ‘সেফ এক্সিট’ শব্দটি সাধারণত ব্যবহৃত হয় ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে কৌশলগত, নিরাপদে সরে যাওয়ার প্রক্রিয়া বোঝাতে। এটি কখনো আত্মরক্ষার কৌশল, কখনো পরাজয়ের স্বীকারোক্তি, কখনো নতুন সুযোগ তৈরির উপায়। বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেক্ষাপটে এই শব্দটি আবার নতুনভাবে আলোচিত হচ্ছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সাম্প্রতিক মন্তব্য—“উপদেষ্টাদের অনেকেই রাজনৈতিক দলের সঙ্গে লিয়াজোঁ করেছেন, তাঁরা সেফ এক্সিটের পথ খুঁজছেন”—এই বক্তব্য এক ঝটকায় খুলে দিয়েছে বহু অন্দরমহলের পর্দা। জনমনে প্রশ্ন জেগেছে—অন্তর্বর্তী সরকারের কেউ কি সত্যিই বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন? কেউ কি ভবিষ্যতের ক্ষমতার মানচিত্রে নিজের নিরাপত্তার জায়গা খুঁজছেন?

সরকারের পক্ষ থেকে এতদিন এই প্রশ্নের উত্তর আসেনি। তবে উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বক্তব্যে নতুন এক বার্তা এসেছে—“দেশের ঝড়-ঝঞ্ঝায় কখনো পালিয়ে যাইনি, ভবিষ্যতেও যাব না।” তাঁর এই দৃঢ় অবস্থান দেখায় যে, অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরেও স্পষ্ট বিভাজন আছে—কেউ লড়াইয়ে থাকতে চায়, কেউ হয়তো শান্তিপূর্ণ বিদায় খোঁজে।

এই প্রশ্নের উত্তর কেবল ব্যক্তিগত নয়, কাঠামোগত। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘থাকা’ মানে শুধু পদে থাকা নয়, প্রভাবের মধ্যে থাকা। আর ‘যাওয়া’ মানে কেবল পদত্যাগ নয়, বরং রাজনৈতিক অস্তিত্বের ঝুঁকি নেওয়া।

অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু উপদেষ্টা হয়তো উপলব্ধি করছেন, পরিবর্তনের অস্থির স্রোতে তাদের অবস্থান ক্রমে দুর্বল হচ্ছে। কেউ কেউ হয়তো আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণে তাদের স্থান থাকবে না। আবার অন্যদিকে, কিছু উপদেষ্টা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন—তারা যে প্রক্রিয়া শুরু করেছেন, তার সমাপ্তি ঘটাতে হবে তাঁদের হাতেই। এই দুই মানসিকতার সংঘাতই এখন ‘সেফ এক্সিট’-এর বিতর্কের ভিতরে রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব হিসেবে কাজ করছে।

কিন্তু জনগণের দৃষ্টিতে প্রশ্নটি একেবারে সরল—যারা রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ করছে, তারা কি দায়বদ্ধ? যদি কেউ ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক সমর্থন বা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সুবিধার চিন্তায় ‘সেফ এক্সিট’ খোঁজেন, তবে তা রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্বহীনতার শামিল।

অন্তর্বর্তী সরকারের জন্মই হয়েছিল ন্যায়বিচার, সংস্কার ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে। এখন যদি এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই কেউ নিজেকে রক্ষা করার রাজনীতি শুরু করেন, তবে পুরো উদ্যোগটাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। সেফ এক্সিট যদি হয়ে ওঠে আত্মরক্ষার কৌশল, তবে জনগণের বিশ্বাস ধ্বংস হবে। কিন্তু যদি এটি হয় শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক রূপান্তরের অংশ, তবে তা ইতিবাচকও হতে পারে—শর্ত হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দায়িত্ব নেওয়ার চেয়ে দায় এড়ানোর প্রবণতাই বেশি দৃশ্যমান। রাজনীতিবিদরা ব্যর্থ হলে তারা বলেন, ‘আমার ওপর ষড়যন্ত্র হয়েছে’। আবার সফল হলে বলেন, ‘আমিই সব করেছি’। এই আত্মরক্ষামূলক মানসিকতা থেকেই ‘সেফ এক্সিট’ সংস্কৃতি তৈরি হয়।

কিন্তু একটি সভ্য রাষ্ট্রে ক্ষমতায় থাকা মানে শুধু সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়, বরং সিদ্ধান্তের দায় নেওয়া। রাজনৈতিক নৈতিকতার মৌলিক ভিত্তি হলো—দায় স্বীকার করার সাহস। যদি প্রতিটি সংকটে নেতৃত্ব সরে দাঁড়ায়, যদি প্রতিটি ব্যর্থতার পর নিরাপদ প্রস্থানই হয় একমাত্র লক্ষ্য, তবে গণতন্ত্রের বিকাশ অসম্ভব।

‘সেফ এক্সিট’ বিতর্কের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক গভীর শিক্ষা—ঐক্য কেবল চুক্তিপত্রে হয় না, তা হয় মানসিকতায়। ঐকমত্য কমিশনের প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়, কিন্তু দলগুলো যতক্ষণ পর্যন্ত নিজেদের অবস্থান স্বচ্ছভাবে পরিষ্কার না করে, এই ঐকমত্য কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

বিভিন্ন দল গণভোটের মাধ্যমে জনগণের মত নিতে চায়, কিন্তু জনগণ চায় একটাই—দায়বদ্ধ ও নৈতিক রাজনীতি। তারা চায় না কারও নিরাপদ পালানোর নাটক। চায় নেতৃত্বের দৃঢ় অবস্থান, সাহসী সিদ্ধান্ত, আর জনগণের প্রতি আন্তরিক প্রতিশ্রুতি।

দ্বন্দ্ব মানেই অশান্তি নয়; বরং দ্বন্দ্ব থেকেই জন্ম নেয় বিকাশের সুযোগ। কিন্তু যদি সেই দ্বন্দ্ব পরিণত হয় কলহে, আর কলহে জন্ম নেয় আত্মরক্ষার প্রবণতা, তবে তা সমাজকে পেছনে টেনে নেয়।

আজ বাংলাদেশের রাজনীতি এক সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে আছে সংস্কার, ন্যায়বিচার ও নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি; অন্যদিকে আছে সংশয়, দ্বন্দ্ব ও সেফ এক্সিটের ছায়া। জনগণ এই মুহূর্তে একটাই আশা করছে—দুই বিপরীতের এই দ্বন্দ্ব যেন নতুন বিকাশের জন্ম দেয়, বিভেদের বিষে যেন সমাজ কলুষিত না হয়।

কারণ রাজনীতি তখনই অর্থবহ, যখন নেতৃত্ব পালানোর নয়, টিকে থাকার সাহস দেখায়। সেফ এক্সিটের রাজনীতি নয়, দায়বদ্ধতার রাজনীতি—এটাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চাহিদা।

লেখা: শিক্ষক ও গবেষক। 

শিক্ষাবার্তা /এ/১২/১০/২০২৫

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.