।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
শিক্ষা একটি জাতির প্রাণ, আর সেই শিক্ষার ভিত্তি গড়ে ওঠে মাধ্যমিক পর্যায়ে। প্রাথমিক শিক্ষা যেমন শিশুদের বুনিয়াদ তৈরি করে, ঠিক তেমনি মাধ্যমিক শিক্ষা তাদের ভবিষ্যৎ গড়ার সোপান। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে মাধ্যমিক শিক্ষা দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক বৈষম্য, নীতিগত অবহেলা এবং কাঠামোগত জটিলতার শিকার। ফলে এই স্তরের শিক্ষকরা বঞ্চিত হচ্ছেন, শিক্ষার্থীরাও মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। গবেষক থেকে শিক্ষক—সবাই এককথায় স্বীকার করছেন, এখনই সময় আলাদা মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর গঠনের।
২০০৩ সালে অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মিয়ার নেতৃত্বে জাতীয় শিক্ষা কমিশন প্রথমবারের মতো মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে আলাদা করার প্রস্তাব করে। কারণ, এক ছাতার নিচে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা পরিচালনার ফলে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়। ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষা কমিশনও একই প্রস্তাব পুনরায় দেয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন জেলা প্রশাসক, শিক্ষা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং শিক্ষক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও একই দাবি জোরালোভাবে তোলা হয়।
কিন্তু দুঃখজনক হলো, দুই দশকেরও বেশি সময় পার হলেও বাস্তবে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি। নীতিপত্রে প্রস্তাব থাকলেও তা আজও ফাইলবন্দি। ফলে মাধ্যমিক শিক্ষা আজও প্রশাসনিক অবহেলার শিকার।
বর্তমানে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) একই সঙ্গে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, কলেজ, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের বিভিন্ন কার্যক্রম তদারকি করছে। এতো বিশাল দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা যেসব সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে তা হলো- একই দপ্তর থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা তদারকি করতে গিয়ে মাউশির কাজের চাপ বেড়ে যায়। ফলে মাঠপর্যায়ে মনিটরিং দুর্বল হয়।
৯৭ শতাংশ এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান মাধ্যমিক স্তরে থাকলেও প্রশাসনে একজনও মাধ্যমিক শিক্ষক কর্মকর্তা পদে নেই। এতে শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
গবেষকরা বারবার বলেছেন, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। কিন্তু বর্তমান প্রশাসনিক মডেলে তা সম্ভব হচ্ছে না।
অনেক দেশেই শিক্ষা পর্যায়ভিত্তিক পৃথক অধিদপ্তর রয়েছে। আমাদের দেশে মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষার জন্য আলাদা অধিদপ্তর থাকলেও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা এখনও একই কাঠামোয় আবদ্ধ।
সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বারবার অভিযোগ করেছেন যে, তারা পদোন্নতি ও প্রশাসনিক ক্ষমতায় বঞ্চিত। শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা দপ্তরে সব পদে অধিষ্ঠিত থাকলেও মাঠপর্যায়ের শিক্ষকরা শুধু ক্লাসরুমেই সীমাবদ্ধ থাকেন। ফলে তাদের অভিজ্ঞতা প্রশাসনে কাজে লাগানো হয় না।
বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরাও একই অভিযোগ করেন। তাদের মধ্যে অনেকেই দক্ষ প্রশাসক হওয়ার যোগ্যতা রাখলেও তারা কোনো প্রেষণ বা দায়িত্ব পান না।
বিয়াম ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, শিক্ষা প্রশাসন সংস্কার ছাড়া মানসম্মত শিক্ষা সম্ভব নয়। এজন্য দুটি নতুন অধিদপ্তর—মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা অধিদপ্তর গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই কথা বলেছেন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট আয়োজিত কর্মশালার বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, আলাদা অধিদপ্তর শুধু প্রশাসনিক সুবিধা নয়, শিক্ষার মানোন্নয়নের পূর্বশর্ত। মাধ্যমিক শিক্ষা হলো মূলধারার শিক্ষা। এ স্তরের উন্নয়ন ছাড়া পুরো শিক্ষাব্যবস্থাই ভেঙে পড়বে।
শিক্ষক বঞ্চিত মানে শিক্ষার্থীরও বঞ্চনা। মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষকেরা অবহেলিত হওয়ায় তাদের প্রেরণা কমে যাচ্ছে। পদোন্নতির সুযোগ নেই, প্রশাসনিক দায়িত্ব নেই, ফলে অনেক যোগ্য শিক্ষকও হতাশ হয়ে পড়ছেন। এ পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীর ওপর।
এ ছাড়া প্রশাসনিক নজরদারি দুর্বল থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠানে সঠিকভাবে পাঠদান হচ্ছে না, পরীক্ষার অনিয়ম হচ্ছে, শিক্ষক সংকট নিরসনে দেরি হচ্ছে। অথচ মাধ্যমিক পর্যায়েই শিক্ষার্থীরা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়—বিজ্ঞান, মানবিক, ব্যবসায় শিক্ষা কিংবা কারিগরি পথে এগোনোর প্রাথমিক প্রস্তুতি এখান থেকেই শুরু হয়। এই স্তরে অবহেলা মানে দেশের ভবিষ্যৎকে অবহেলা করা।
গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে ভাগ করার প্রস্তাব করেছে। অর্থাৎ সরকার, গবেষক, শিক্ষক—সবাই এখন একমত। কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেই এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সম্ভব।
আমাদের মনে রাখতে হবে, নীতি যদি বাস্তবায়িত না হয় তবে তা কেবল কাগজে-কলমেই থেকে যায়। মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর গঠন মানে কেবল নতুন পদ সৃষ্টি নয়, বরং শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য একটি কাঠামোগত পরিবর্তন।
মাধ্যমিক শিক্ষা হলো জাতির ভিত্তি। এই ভিত্তি যদি দুর্বল হয় তবে কোনো উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে গবেষকরা, শিক্ষকেরা, এমনকি প্রশাসনের ভেতরের অনেকে এই দাবিকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এখন শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন।
লেখা: শিক্ষক ও গবেষক।
শিক্ষাবার্তা /এ/০৪/১০/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
