।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় দীর্ঘদিনের একটি চিত্র হলো শিক্ষক সংকট। একদিকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, অন্যদিকে অনুমোদিত শিক্ষকের পদগুলো বছরের পর বছর খালি পড়ে আছে। অথচ এই শূন্য পদ পূরণ করা নিয়েই যেন কর্তৃপক্ষের টালবাহানা। এর মধ্যে নতুন করে বিতর্ক উঠেছে—প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত শিক্ষক আগে দরকার, নাকি ধর্মীয় শিক্ষক? বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে অগ্রাধিকার নির্ধারণের প্রশ্ন হলেও আসলে এটি বাংলাদেশের শিক্ষানীতির দিকনির্দেশনা ও বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ৬৫ হাজার ৪৫৭টি, যার মধ্যে ৩৪ হাজার ১০৬টি শূন্য। সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ৩ লাখ ৫৫ হাজার ৬৫৩টি, সেখানে ২৪ হাজার ৫৩৬টি পদ শূন্য। সব মিলিয়ে শিক্ষক শূন্যপদ দাঁড়াচ্ছে ৫৮ হাজার ৬৪২। অর্থাৎ দেশের প্রায় প্রতিটি বিদ্যালয়ই কমবেশি শিক্ষক সংকটে ভুগছে।
এই বিশাল শূন্যপদ শিক্ষার্থীর শিক্ষার মানকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তেমনি প্রাথমিক শিক্ষাকে মানুষ অনাগ্রহের চোখে দেখছে। এখন প্রশ্ন হলো—যেখানে মৌলিক পদই ফাঁকা, সেখানে সংগীত বা ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক করা কতটা যৌক্তিক?
মফস্বল ও গ্রামীণ এলাকায় গেলে প্রাথমিক শিক্ষার চিত্র আরও স্পষ্ট হয়। যেমন কুষ্টিয়ার একটি গ্রামে দেখা গেছে, একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকের সংখ্যা যথেষ্ট হলেও শিক্ষার্থী কম। আবার অন্য কোনো বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী অনেক বেশি হলেও শিক্ষক নেই। ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত সর্বত্র ভারসাম্যপূর্ণ নয়।
আরেকটি বাস্তবতা হলো—কওমি মাদ্রাসা ও কেজি স্কুলের প্রসার। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে এরা দ্রুত বেড়ে উঠছে। অনেক অভিভাবক সন্তানকে কওমিতে ভর্তি করান শুধু এই আশায় যে, তাদের সন্তান অন্তত জানাজার নামাজ পড়াতে পারবে। অন্যদিকে কেজিগুলোও শিক্ষার মানে না হলেও অভিভাবকদের টানছে রঙিন বই-পুস্তক, ইংরেজি মাধ্যমের ছদ্মবেশ, কিংবা শৃঙ্খলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে।
বাংলাদেশ একটি ধর্মীয়ভাবে সংবেদনশীল সমাজ। অভিভাবকেরা চান, সন্তান ছোট থেকেই ধর্মীয় বিষয়ে জানুক। ইসলাম ধর্মাবলম্বী অভিভাবকেরা যেমন চান সন্তান কোরআন পড়তে শিখুক, নামাজ-কালেমা জানুক; অন্য ধর্মাবলম্বীরাও চান তাঁদের সন্তানেরা নিজ নিজ ধর্মীয় মূল্যবোধ সম্পর্কে ধারণা পাক।
যদি সরকার প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ দেয়, তবে এর সুফল হতে পারে—
অভিভাবকের আস্থা বাড়বে, ফলে কওমিতে সন্তান পাঠানোর প্রবণতা কমবে।
বিদ্যালয়ের ভর্তি হার বৃদ্ধি পাবে, ঝরে পড়া কমবে।
ধর্মীয় শিক্ষা একটি কাঠামোবদ্ধ উপায়ে শেখানো যাবে, যেখানে মান ও পদ্ধতি সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে।
অন্য ধর্মের শিক্ষকেরাও নিয়োগ পেলে বহুত্ববাদী শিক্ষা পরিবেশ তৈরি হবে।
অন্যদিকে সংগীত শিক্ষা শুধু গান শেখানো নয়, বরং শিশুদের মানসিক বিকাশ, সাংস্কৃতিক চর্চা ও সৃজনশীলতাকে বিকশিত করার অন্যতম মাধ্যম।
বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যদি নিয়মিতভাবে দেশাত্মবোধক গান, লোকগীতি, হামদ-নাত কিংবা বিশ্বসংগীত শেখানো যায়, তবে শিশুরা একদিকে সংস্কৃতির শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত হবে, অন্যদিকে শিল্প-সাহিত্যের প্রতি আগ্রহী হবে।
এখানে আরও একটি দিক গুরুত্বপূর্ণ—আমাদের মসজিদে আজান কিংবা ওয়াজ মাহফিলে সুরের উপস্থিতি স্পষ্ট। ফলে সঙ্গীত ও ধর্মকে পরস্পরবিরোধী ভাবার কিছু নেই। বরং সুর শিক্ষা থাকলে শিশুদের পাঠদানের মানও বেড়ে যাবে।
আজকের বাংলাদেশে কওমি ও কেজি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান mushroom-এর মতো বেড়ে উঠছে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রশিক্ষণহীন। অনেক কওমিতে পড়ানো হয় ধর্মীয় শিক্ষা, কিন্তু শিশু মনস্তত্ত্ব অনুযায়ী শেখানো হয় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কেজিতেও অধিকাংশ শিক্ষক মাত্র এসএসসি/এইচএসসি পাস, তাও কোনো পেশাগত প্রশিক্ষণ ছাড়াই।
প্রশ্ন হচ্ছে—শিশুদের কি আমরা এই অপ্রশিক্ষিত শিক্ষকের হাতে ছেড়ে দেব, নাকি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ভেতরে এনে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক শিক্ষা উভয়ই নিশ্চিত করব?
এই যখন বাস্তবতা তখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংগীত ও শারীরিক শিক্ষা–বিষয়ক শিক্ষক নিয়োগে সরকারের প্রজ্ঞাপনকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। একই সঙ্গে যাঁরা সংগীত শিক্ষক নিয়োগের বিরোধিতা করছেন, তাঁদের প্রতি তীব্র নিন্দা জানিয়ে তাঁদের রুখে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে উদীচী।
অপরদিকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গানের শিক্ষকের পরিবর্তে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের দাবি তুলেছে জামায়াতে ইসলামীসহ পাঁচটি ইসলামপন্থী দল। তাদের হুঁশিয়ারি—এ দাবির ব্যতিক্রম হলে ইসলামপ্রেমিক জনগণ রাজপথে নামতে বাধ্য হবে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার
প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য সংগীত ও নৃত্যের শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্তকে ‘জাতির জন্য আত্মঘাতী’ বলেছেন। তিনি বলেন ‘কোমলমতি প্রজন্মকে সংগীত ও নৃত্য শিক্ষা দেওয়ার জন্য শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকার মূলত শিক্ষার্থীদের নৈতিকভাবে অবক্ষয় ও অনৈতিক সমাজ গঠনে উৎসাহিত করছে।’
এই দ্বন্দ্ব যখন তুঙ্গে তখন দেশের ৫১ নাগরিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত ও নৃত্যের শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে বিরোধ পরিহারের আহ্বান জানিয়েছেন ।
তারা বলছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সঙ্গীত শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত বাতিল চেয়ে একটি পক্ষের লাগাতার বক্তব্য, বিবৃতি, কর্মসূচি গভীর উদ্বেগ তৈরি করছে।
তারা আরও বলছেন, সঙ্গীতের শিক্ষক নিয়োগ বিষয়ে বিরোধিতা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার বিপরীত। ‘স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের শাসনের বিরুদ্ধে জুলাই গণবিস্ফোরণে সকল শ্রেণি-পেশা এবং ধর্ম-মতের মানুষ অংশ নিয়েছিল। তবে সফল অভ্যুত্থানের পরপরই নানা ধরনের বিভক্তি তৈরির অপপ্রয়াস চলছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সঙ্গীত ও নাচের শিক্ষক বাতিলের দাবি এ বিভাজনকে আরও জটিল পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাবে।’
‘আমরা মনে করি, শিশুর নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা যেমন প্রয়োজন রয়েছে, তেমনি মেধা ও মননের বিকাশে সঙ্গীত এবং নৃত্যকলার প্রয়োজনও রয়েছে। সংস্কৃতি চর্চার মধ্য দিয়ে শিশুরা আধ্যাত্মিক সৌন্দর্যকে নিজের ভেতরে ধারণ করতে সক্ষম হবে। বিশ্ব সংস্কৃতির পরিসরে বাংলাদেশের হয়ে তারা অংশ নিতে পারবে।
এই পরিস্থিতিতে সমাধানের উপায় হিসেবে প্রথম কাজ হলো শিক্ষক সংকট নিরসন। যতদিন ৫৮ হাজার শূন্য পদ পূরণ না হবে, ততদিন মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা কেবল কাগজে-কলমেই থাকবে।
ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ দিলে অভিভাবকের আস্থা বাড়বে, সংগীত শিক্ষক নিয়োগ দিলে শিক্ষার্থীর সাংস্কৃতিক বিকাশ ঘটবে। উভয় ক্ষেত্রেই শিক্ষার পরিবেশ সমৃদ্ধ হবে।
যে শিক্ষকই নিয়োগ পান না কেন, তাঁদের শিশুমনস্তত্ত্ব, আধুনিক পাঠদানের কৌশল, প্রযুক্তির ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে।
সরকারের উচিত কওমি ও কেজিকে মানদণ্ডের আওতায় আনা। ন্যূনতম যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণ ছাড়া কাউকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের অনুমতি দেওয়া যাবে না।
শিক্ষকদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ ছাড়াই নীতি নির্ধারণ হয়। অথচ তাঁরা মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সবচেয়ে ভালো জানেন। তাই নীতি প্রণয়নে তাঁদের মতামতকে প্রাধান্য দিতে হবে।
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাকে ঘিরে বিতর্ক নতুন নয়। কখনো কওমি বনাম প্রাথমিক, কখনো কেজি বনাম সরকারি বিদ্যালয়, কখনো সংগীত বনাম ধর্মীয় শিক্ষক। কিন্তু আসল সমস্যা হলো শিক্ষক সংকট ও মানসম্মত শিক্ষকের অভাব।
ধর্মীয় শিক্ষা হোক বা সংগীত শিক্ষা—দুটিই শিশুদের মানসিক বিকাশে অপরিহার্য। কিন্তু এর আগে নিশ্চিত করতে হবে শিক্ষক পদ পূরণ, প্রশিক্ষণ ও মানসম্মত পাঠদানের পরিবেশ।
প্রাথমিক শিক্ষাকে যদি আমরা কেবল বিতর্কের মধ্যে ফেলে রাখি, তবে এটি হবে সেই সুন্দরী আম্বিয়ার মতো, যাকে ঘিরে গণ্ডগোল চলতেই থাকবে, কিন্তু বিয়ে আর সহজে হবে না। তাই সময় এসেছে বিতর্ক সরিয়ে রেখে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার।
লেখা -শিক্ষক ও গবেষক।
শিক্ষাবার্তা/এ/২৫/৯৯/২৫
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
