এইমাত্র পাওয়া

প্রস্তাবিত সেন্ট্রাল বিশ্ববিদ্যালয়: শিক্ষার্থীদের বড় অংশই উচ্চশিক্ষার বাইরে থেকে যাবে

ড. মোহাম্মদ ফজলুর রহমান খান: সম্প্রতি সরকার ঢাকার সাতটি ঐতিহ্যবাহী কলেজকে একত্র করে ‘ঢাকা সেন্ট্রাল বিশ্ববিদ্যালয়’ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। ঘোষণাটি আপাতদৃষ্টিতে ইতিবাচক মনে হলেও শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে এ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, সিদ্ধান্তটি কি আসলেই শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়ন ঘটাবে, নাকি উলটো দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি জনবান্ধব শিক্ষাপ্রবাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে?

ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও সরকারি বাংলা কলেজ-এ সাতটি প্রতিষ্ঠান বহু বছর ধরে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার প্রধান ভরসা। বর্তমানে প্রায় দেড় লক্ষাধিক শিক্ষার্থী এ কলেজগুলোতে অধ্যয়নরত। স্বল্প খরচে অনার্স ও মাস্টার্সে পড়ার সুযোগ দিয়ে এ কলেজগুলো শুধু শিক্ষার কেন্দ্র নয়, বরং সামাজিক উন্নতির এক সোপান হয়ে উঠেছে।

এ বাস্তবতায় সাত কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করার পরিকল্পনা নিয়ে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। প্রথমত, ঢাকায় শিক্ষার্থীর চাপ এমনিতেই চরমে। স্নাতক পর্যায়ে ভর্তির প্রতিযোগিতা এত তীব্র যে, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বহু শিক্ষার্থী সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে জায়গা পান না। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোগত কারণে ভর্তি আসন সীমিত হয়ে গেলে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ উচ্চশিক্ষার বাইরে থেকে যাবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সংকুচিত হবে এবং বৈষম্য বাড়বে। বিশেষ করে নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, কারণ ইডেন ও বদরুন্নেসা মহিলা কলেজের আসনসংখ্যা হ্রাস পেলে, নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বিকল্প সুযোগ সীমিত হয়ে যাবে।

দ্বিতীয়ত, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলে, শিক্ষকদের পদ-পদবি ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। ফলে একদিকে শিক্ষার্থীরা অনিশ্চয়তায় পড়বেন, অন্যদিকে একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, যেসব শিক্ষার্থী স্বল্পব্যয়ে এ কলেজগুলোতে পড়াশোনা করতে পারতেন, তারা বাধ্য হবেন ব্যয়বহুল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে ঝুঁকতে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এটি হবে অসহনীয় বোঝা।

এখানে বাংলাদেশের জনমিতির বাস্তবতাও বিবেচনায় আনা জরুরি। বিভিন্ন গবেষণা বলছে, গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশটি ‘তারুণ্য স্ফীতি’র মধ্যে আছে। বিপুলসংখ্যক তরুণ রয়েছে, যাদের অনেকেই মধ্যমমানের একাডেমিক দক্ষতা নিয়ে এগোচ্ছে। তারা হয়তো আন্তর্জাতিক মানের গবেষক হতে পারবেন না, কিন্তু সঠিক শিক্ষার সুযোগ পেলে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত হতে পারেন। অর্থনীতির গতিশীলতা বজায় রাখতে, এ শিক্ষার্থীদের কার্যকর শিক্ষা অপরিহার্য। সাত কলেজ এতদিন ধরে সেই ভূমিকাই পালন করেছে। একে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের ফলে এ কার্যকারিতা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।

তাহলে সমাধান কী হতে পারে? শিক্ষাবিদদের মতে, প্রস্তাবিত ঢাকা সেন্ট্রাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস গাজীপুর বা ঢাকার বাইরে অন্য কোথাও স্থাপন করে সাত কলেজকে তার অধিভুক্ত করা অধিকতর যৌক্তিক পদক্ষেপ হতো। এতে একদিকে কলেজগুলোর ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন থাকত, অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা ভর্তির সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হতো না। পাশাপাশি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে শিক্ষার মানোন্নয়ন, পাঠ্যক্রম আধুনিকীকরণ ও গবেষণার প্রসার ঘটানো সম্ভব হতো।

আমাদের নীতিনির্ধারকদের মনে রাখা দরকার যে, শিক্ষা খাতে নেওয়া যে কোনো সিদ্ধান্তের প্রভাব তাৎক্ষণিক নয়; তা বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। শিক্ষা হলো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা বা প্রশাসনিক সুবিধার খাতিরে নেওয়া সিদ্ধান্ত, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ এবং দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। সাত কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের উদ্যোগ যদি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, শ্রমবাজারের চাহিদা ও শিক্ষার মান উন্নয়নের বাস্তব দিক বিবেচনা না করে কেবল নাম পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা অদূরদর্শী পদক্ষেপ হিসাবেই ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হবে।

অতএব, এখনই প্রয়োজন সিদ্ধান্তের পুনর্বিবেচনা এবং ঢাকা সেন্ট্রাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস গাজীপুর বা ঢাকার বাইরে অন্য কোথাও স্থাপন করে সাত কলেজকে তার অধিভুক্ত করা। আশা করা যায়, এতে করে শিক্ষার সুযোগ সংকুচিত না হয়ে বরং বিস্তৃত হবে এবং উচ্চশিক্ষার মান সত্যিকার অর্থেই উন্নত হবে।

লেখক: চিফ (ডিএলপি বিভাগ), বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.