।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
বাংলাদেশের শিক্ষা-অঙ্গন এক ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষার মান, অবকাঠামো কিংবা প্রশাসনিক জটিলতা নিয়ে আমাদের বহুদিনের আলোচনা থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে প্রবণতা সবচেয়ে ভয়ঙ্করভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে তা হলো—শিক্ষকের প্রতি শিক্ষার্থীর লাঞ্ছনা, হামলা কিংবা অপমান। এক সময় সমাজে শিক্ষক ছিলেন শ্রদ্ধার আসন অলংকৃত ব্যক্তিত্ব। কিন্তু আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি, শিক্ষক তাঁরই ছাত্রের হাতে অপমানিত হচ্ছেন, এমনকি প্রাণ হারাচ্ছেন। এই চিত্র কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, পুরো সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি।
ঘটনার তালিকা দীর্ঘ। কেবল গত কয়েক বছরেই নানা স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের প্রতি অসম্মান, আক্রমণ ও লাঞ্ছনার ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। আমরা কয়েকটি ঘটনা দেখে আসি।
সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এক শিক্ষককে লাঞ্ছিত করার প্রতিবাদে শিক্ষকরা মানববন্ধন করেছেন।
৩ মে ২০২৫ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস ও সভ্যতা ডিসিপ্লিনের প্রভাষক হাসান মাহমুদকে সাবেক শিক্ষার্থী শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। এ ঘটনায় শিক্ষক হাসপাতালে ভর্তি হন।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে লোকপ্রশাসন বিভাগের এক প্রভাষককে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে একজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
নভেম্বর ২০২৩ নোয়াখালীর একটি দাখিল মাদ্রাসায় শিক্ষক শিক্ষার্থীর হাতে লাঞ্ছিত হন।
রাজশাহীর এক কলেজে এক ছাত্রী শিক্ষককে ছুরিকাঘাত করে। কারণ ঐ ছাত্রী পরীক্ষার হলে নকল করার দায়ে প্রতিষ্ঠান থেকে টিসি দেওয়া হয়।
চুয়াডাঙ্গায় পরীক্ষায় নকল করতে না দেওয়ায় ছাত্র শিক্ষককে মারধর করে।
জুন ২০২২ সাভারে শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারকে শিক্ষার্থী পিটিয়ে হত্যা করে।
জুন ২০২২ নড়াইলে অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে শিক্ষার্থীরা লাঞ্ছিত করে।
মে ২০২৫ ফরিদপুরে শিক্ষার্থীরা প্রধান শিক্ষক মোখলেছুর রহমান অরুণকে মারধর করে বিদ্যালয় থেকে বের করে দেয়।
এসব ঘটনায় স্পষ্ট বোঝা যায়—এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এক ধরনের ধারাবাহিকতা তৈরি হয়েছে। শিক্ষকের প্রতি অশ্রদ্ধা, হিংস্রতা এবং আক্রমণ এখন এক ভয়ঙ্কর সামাজিক প্রবণতায় পরিণত হচ্ছে।
বাংলা সমাজে শিক্ষককে “গুরু”, “মুরুব্বি” বা “আলোকবর্তিকা” হিসেবে শ্রদ্ধা করার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। গ্রামীণ সমাজে যেমন শিক্ষক ছিলেন সমাজের সম্মানিত ব্যক্তি, তেমনি উচ্চশিক্ষার পরিসরেও শিক্ষক ছিলেন দিকনির্দেশক। প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশে বলা হতো—“গুরু ব্রহ্মা, গুরু বিষ্ণু, গুরু মহেশ্বর”—অর্থাৎ শিক্ষকই জ্ঞানের পূর্ণ প্রতীক।
কিন্তু আজ সেই সম্পর্ক যেন ভেঙে যাচ্ছে। শিক্ষককে শুধু একজন চাকুরে বা প্রশাসনিক পদে বসানো মানুষ হিসেবে ভাবা হচ্ছে। শিক্ষার্থীর চোখে শিক্ষক আর আলোকবর্তিকা নয়, বরং প্রতিপক্ষ। এই ধারণার পরিবর্তন সমাজের জন্য এক অশুভ সংকেত।
সমাজ সচেতনরা বলছেন শিক্ষকের প্রতি এই অসম্মান বা আক্রমণের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে—
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক রাজনীতি নতুন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষকরা যেভাবে নগ্নভাবে দলীয় কোন্দলে জড়িয়ে পড়েছেন, তাতে তাঁদের নৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়েছে। শিক্ষার্থীরা যখন দেখে শিক্ষকও দলবাজি করছেন, তখন তাদের কাছে শিক্ষকের মর্যাদা খাটো হয়ে যায়।
পরিবার ও সমাজে শিক্ষককে সম্মান করার যে শিক্ষা আগে দেওয়া হতো, তা এখন অনেকাংশে অনুপস্থিত। সামাজিক মূল্যবোধে ভাটা পড়েছে।
শিক্ষাকে এখন অনেক ক্ষেত্রেই সেবার বদলে পণ্য হিসেবে দেখা হয়। ফি, পরীক্ষা, গ্রেড—সবকিছু যেন এক ধরনের বাণিজ্য। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক হয়ে গেছে ‘সেবা প্রদানকারী’ ও ‘গ্রাহক’-এর সম্পর্ক। ফলে স্বাভাবিক শ্রদ্ধাবোধ নষ্ট হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সামান্য একটি বিষয়ও তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। শিক্ষকের বিরুদ্ধে ক্ষোভ দ্রুত সহিংস রূপ নিচ্ছে।
অস্বীকার করার উপায় নেই, অনেক শিক্ষকও অনৈতিক আচরণ করেন, শিক্ষার্থীদের প্রতি বৈষম্য, দুর্ব্যবহার, এমনকি হয়রানি করেন। এগুলো শিক্ষকের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে এবং শিক্ষার্থীর আস্থা নষ্ট করে।
তবে যত দোষই থাকুক না কেন, শিক্ষকের প্রতি আচরণের একটি রেড লাইন রয়েছে—যেটি কোনোভাবেই অতিক্রম করা উচিত নয়।
শিক্ষকের প্রতি আঘাত মানে কেবল একজন ব্যক্তিকে অপমান করা নয়, বরং পুরো জ্ঞান ও শিক্ষাব্যবস্থাকে আঘাত করা। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনিরাপদ হয়ে পড়ে।নতুন প্রজন্ম মনে করে, যে কারও প্রতি অসন্তুষ্ট হলে সহিংসতা চালানো বৈধ।ভবিষ্যৎ নাগরিক গড়ে ওঠে সহিংস ও অবিবেচক।
সমাজের বিশিষ্ট ব্যাক্তিদের অভিমত-শিক্ষক যদি দায়িত্বে অবহেলা করেন বা দুর্ব্যবহার করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে নীতিগত ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু সেটি হবে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে, সহিংসতায় নয়।
ছাত্র রাজনীতির নিয়ন্ত্রকরা যেন কঠোরভাবে ঘোষণা দেয়—শিক্ষকের প্রতি অসম্মান বা আক্রমণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
পাঠ্যক্রমে নৈতিক শিক্ষা ও শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিতে হবে।
পরিবারে শিশুদের শেখাতে হবে—শিক্ষক বাবা-মায়ের মতোই সম্মানীয়।
শিক্ষক লাঞ্ছনা বা আক্রমণের ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া এ প্রবণতা ঠেকানো সম্ভব নয়।
মিডিয়া যেন এসব ঘটনা শুধু প্রচার না করে, বরং শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষায় সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়।
শিক্ষকের ভুল থাকতে পারে, থাকতে পারে অনিয়ম। কিন্তু শিক্ষার্থীর হাত থেকে শিক্ষক লাঞ্ছিত হওয়ার দৃশ্য কোনো সভ্য সমাজের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। সমাজকে বুঝতে হবে—শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা মানে নিজের সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করা।
আইনের ব্যাখ্যায় বলা আছে -দণ্ডবিধি (Penal Code, 1860) অনুযায়ী। ধারা ৩২৩ ও ৩২৫ – স্বেচ্ছায় আঘাত বা গুরুতর আঘাত করলে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
ধারা ৩৫২ – কারো প্রতি অশোভন বা অপমানজনক আক্রমণ/ব্যবহারও অপরাধ।
ধারা ৩৫৪ – শিক্ষককে শারীরিকভাবে টানা-হেঁচড়া, লাঞ্ছিত করা “assault or criminal force” হিসেবে গণ্য হবে।
ধারা ৫০৬ – হুমকি-ধমকি বা ভয় দেখানোও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আইন ও নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষকের প্রতি অসদাচরণ, লাঞ্ছনা বা আঘাত করলে শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার বা স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করার বিধান আছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ধারা ১৭ বলছে—“রাষ্ট্র জনগণের জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করবে।” সেই শিক্ষা কেবল তথ্য বা পাঠ্যবই নয়, বরং নৈতিক ও সাংস্কৃতিক শিক্ষা। শিক্ষককে অসম্মান করা মানে আসলে সেই সাংবিধানিক অঙ্গীকারের প্রতি আঘাত।
ফৌজদারি আইনে এসব অপরাধের জন্য কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নীতিমালায় শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার, সনদ আটকে দেওয়া, স্থায়ীভাবে বহিষ্কার ইত্যাদি শাস্তি দেওয়া হয়।
শিক্ষককে লাঞ্ছনা করা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুতর গোনাহের কাজ।
রাসুল (সা.) বলেন:
“যে ব্যক্তি আলেমকে সম্মান করে, সে আসলে আল্লাহকে সম্মান করল।”
— মিশকাতুল মাসাবিহ
আলেম বা জ্ঞানদাতা (শিক্ষক) কে লাঞ্ছিত করা মানে আল্লাহকেই অসম্মান করা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন:“সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়, যে ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং বড়দের সম্মান করে না।
সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুর্খেইম বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলো সামাজিক নিয়ন্ত্রণের প্রধান জায়গা। শিক্ষককে অসম্মান করা মানে সমাজের নৈতিক শৃঙ্খল ভেঙে পড়া।
কোরআন-হাদিস যেমন শিক্ষকের মর্যাদা অটুট রাখতে নির্দেশ দিয়েছে, সমাজবিজ্ঞানীরাও বলেন শিক্ষক–শিক্ষার্থী সম্পর্ক নষ্ট হলে গোটা সমাজই অবক্ষয়ের পথে ধাবিত হয়। তাই এখনই প্রয়োজন কঠোর আইন প্রয়োগ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পর্যন্ত শিক্ষক সম্মান সংস্কৃতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। অন্যথায়, জ্ঞানবিরোধী এই প্রবণতা একদিন পুরো জাতির জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনবে।
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক।
শিক্ষাবার্তা/এ/২৩/০৯/২৫
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
