।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান ।।
আধুনিক বিশ্বে তরুণ প্রজন্মকে সবচেয়ে বড় যে সংকটগুলো ঘিরে ধরছে তার একটি হলো তামাক ও নেশার অভ্যাস। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নেই। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি হলো ছাত্র-ছাত্রী, কিন্তু উদ্বেগজনকভাবে দেখা যাচ্ছে তারা ক্রমেই তামাক ও নানা ধরনের নেশার দিকে ঝুঁকছে। গবেষণা বলছে, প্রতিবছর বাংলাদেশে প্রায় ১ লাখ ৬১ হাজার মানুষ তামাকজনিত কারণে প্রাণ হারাচ্ছে, যা সড়ক দুর্ঘটনা, পানিতে ডুবে মৃত্যু বা হত্যাকাণ্ড মিলিয়েও ছাড়িয়ে যায়। শুধু মৃত্যুই নয়, লাখো মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে কর্মক্ষমতা হারাচ্ছে। এর সঙ্গে যখন শিক্ষার্থীরা আসক্ত হচ্ছে, তখন তা শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং জাতীয় ক্ষতিতে পরিণত হচ্ছে।
তামাক ও নেশা প্রথমে কৌতূহল কিংবা সহপাঠীর প্রভাবে শুরু হলেও পরে তা অভ্যাসে পরিণত হয়। সিগারেট, বিড়ি, গুটখা, জর্দা থেকে শুরু করে ই-সিগারেট পর্যন্ত সহজলভ্য হওয়ায় ছাত্র-ছাত্রীরা এ ফাঁদে জড়িয়ে পড়ছে দ্রুত। এর ফলে তাদের মনোযোগ নষ্ট হচ্ছে, শিক্ষা জীবনে পিছিয়ে পড়ছে, এমনকি চরিত্র ও নৈতিকতার অবক্ষয়ও ঘটছে। নেশায় আসক্ত অনেক শিক্ষার্থী অপরাধ প্রবণতা, সহিংসতা এবং অবাধ জীবনযাপনের দিকে ঝুঁকছে, যা পরিবার ও সমাজের জন্যও বড় হুমকি।
তামাক ব্যবহার শুধু স্বাস্থ্য ও নৈতিকতার ক্ষতি করে না, বরং জাতীয় অর্থনীতির জন্যও ভয়াবহ বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। সরকার তামাক থেকে কিছু রাজস্ব আয় করলেও এর পেছনে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হচ্ছে আরও বেশি। তামাক আসক্তি ধীরে ধীরে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে, যা শিক্ষা, নৈতিকতা, স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য মারাত্মক অশনিসংকেত।
তামাকের ব্যবহার বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্য হুমকি, যা প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন কেড়ে নেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) অনুসারে, তামাকের কারণে বছরে ৮ মিলিয়নের বেশি মানুষ মারা যায়, যার মধ্যে ৭ মিলিয়ন সরাসরি তামাক ব্যবহার থেকে এবং ১.৩ মিলিয়ন সেকেন্ডহ্যান্ড ধূমপান থেকে। এই মৃত্যুর সংখ্যা বিশ্বের মোট মৃত্যুর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করে, যা হৃদরোগ, ক্যান্সার, ফুসফুসের রোগ এবং অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার কারণে ঘটে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি, যেখানে বিশ্বের ৮০% তামাক ব্যবহারকারী (প্রায় ১.৩ বিলিয়ন) বাস করে।
২০১৯ সালে তামাকের কারণে ৭.৬৯ মিলিয়ন মৃত্যু এবং ২০০ মিলিয়ন অক্ষমতা-সমন্বিত জীবনবছর (DALYs) হারিয়েছে বিশ্ব। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একাই প্রতি বছর ৪৮০,০০০ মানুষ তামাকের কারণে মারা যায়, যা মোট মৃত্যুর পাঁচ ভাগের এক ভাগ। ২০শ শতাব্দীতে তামাক ১০০ মিলিয়ন মানুষকে হত্যা করেছে, এবং ২১শ শতাব্দীতে এ সংখ্যা ১ বিলিয়ন ছাড়িয়ে যেতে পারে যদি প্রতিরোধ না হয়। ধূমপান কেবল ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য নয়, অর্থনীতিকেও ধ্বংস করে। বছরে তামাকের অর্থনৈতিক খরচ ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা বিশ্বের জিডিপির ১.৮% সমান। পরিবারের খাদ্য ও আশ্রয়ের খরচ তামাকের দিকে ঘুরে যায়, যা দারিদ্র্য বাড়ায়।
শিশু এবং নন-স্মোকাররাও সেকেন্ডহ্যান্ড ধূমপানে প্রভাবিত হয়, যা প্রতি বছর ৬৫,০০০ শিশুর মৃত্যু ঘটায়। গর্ভবতী মায়ের ধূমপান শিশুর দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য সমস্যা সৃষ্টি করে। তামাক শিল্পের প্রচারণা যুবকদের আকৃষ্ট করে, যা ভবিষ্যতের মৃত্যুর সংখ্যা বাড়াবে।
প্রতিরোধের জন্য দরকার কঠোর নীতি, কর বৃদ্ধি এবং সচেতনতা। WHO-এর MPOWER প্যাকেজ এবং FCTC চুক্তি এতে সাহায্য করতে পারে। তামাক ছাড়লে মৃত্যুর ঝুঁকি ৯০% কমে যায় যদি ৪০ বছরের আগে ছাড়া হয়।
২০১৭-১৮ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, তামাক থেকে সরকার রাজস্ব পেয়েছিল প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা।
অথচ তামাকজনিত সাতটি রোগের চিকিৎসায় ব্যয় হয়েছিল ৩০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
অর্থাৎ, সরকারের আয় থাকলেও সামগ্রিকভাবে এটি একটি ঘাটতির ব্যবসা। তামাকের কারণে ফুসফুস ক্যান্সার, ব্রংকাইটিস, হৃদরোগ, স্ট্রোক, দাঁতের ক্ষয়, প্রজনন সমস্যা ইত্যাদি বাড়ছে। শুধু মৃত্যু নয়, লাখ লাখ মানুষ স্থায়ীভাবে অসুস্থ হয়ে জীবনের উৎপাদনশীল সময় হারাচ্ছে।
আজকের যুবসমাজে, বিশেষ করে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে নেশার (যেমন অ্যালকোহল, মারিজুয়ানা, প্রেসক্রিপশন ড্রাগস এবং অন্যান্য অবৈধ পদার্থ) বিস্তার একটি গুরুতর সমস্যা হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাপী পরিসংখ্যান দেখায় যে, কলেজ এবং হাইস্কুল স্টুডেন্টদের মধ্যে এই প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে, যা মেন্টাল হেলথ, একাডেমিক পারফরম্যান্স এবং ভবিষ্যতকে প্রভাবিত করছে। ২০২৩-২০২৫ সালের তথ্য অনুসারে, যদিও কোভিড-১৯ মহামারীর পর কিছু ড্রাগের ব্যবহার কমেছে, তবু ওভারডোজ ডেথ রেট বেড়েছে, এবং নতুন ট্রেন্ড যেমন নিকোটিন পাউচ ব্যবহার বাড়ছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Monitoring the Future (MTF) সার্ভে ২০২৪ অনুসারে, ৮ম গ্রেড থেকে ১২ম গ্রেডের স্টুডেন্টদের মধ্যে অ্যালকোহল, নিকোটিন ভ্যাপিং এবং ক্যানাবিসের ব্যবহার স্থিতিশীল বা কমেছে, কিন্তু ১০ম গ্রেডে নিকোটিন পাউচ ব্যবহার ১.৯% থেকে ৩.৪% বেড়েছে। কলেজ স্টুডেন্টদের মধ্যে, ৪৯% ফুল-টাইম স্টুডেন্টস পাস্ট মান্থে অ্যালকোহল সেবন করেছে, ২৯% বিঙ্গ ড্রিঙ্কিংয়ে জড়িত, এবং মারিজুয়ানা ব্যবহার ৪২%। ২০২৩-এ, ২.৪% কলেজ স্টুডেন্টস অ্যাডেরালের নন-মেডিক্যাল ইউজ রিপোর্ট করেছে। বিশ্বব্যাপী, ১২-১৭ বছরের টিনদের মধ্যে ১১.২% পাস্ট ইয়ারে মারিজুয়ানা ব্যবহার করেছে, এবং ৫.৯% ওভারডোজ ডেথ ১৫-২৪ বছরের গ্রুপে।
এই বিস্তারের কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে একাডেমিক স্ট্রেস, পিয়ার প্রেশার, স্বাধীনতার অনুভূতি এবং সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব। কলেজ ক্যাম্পাসে অ্যালকোহল এবং ড্রাগস সহজলভ্য, যা সোশ্যালাইজিংয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। মেন্টাল হেলথ সমস্যা যেমন অ্যাঙ্গজাইটি এবং ডিপ্রেশন (১ ইন ৫ অ্যাডোলেসেন্টসে) এটাকে ত্বরান্বিত করে। ফলে, একাডেমিক ফেলিওর, সেক্সুয়াল অ্যাসল্ট (১ ইন ৫ কলেজ উইমেন), অ্যাক্সিডেন্টস এবং অ্যাডিকশন বাড়ছে। প্রতি বছর ১,৫১৯ কলেজ স্টুডেন্টস অ্যালকোহল-রিলেটেড ইনজুরিতে মারা যায়।
প্রতিরোধের জন্য দরকার সচেতনতা প্রোগ্রাম, কাউন্সেলিং এবং প্যারেন্টাল গাইডেন্স। স্কুল এবং কলেজগুলোতে প্রিভেনশন স্ট্র্যাটেজি যেমন MPOWER-এর মতো প্রয়োগ করা উচিত। নেশামুক্ত যুবসমাজ গড়তে সম্মিলিত প্রচেষ্টা জরুরি, অন্যথায় ভবিষ্যত প্রজন্মের ক্ষতি অপূরণীয় হবে।
বাংলাদেশে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০০৫ সালে প্রণয়ন এবং ২০১৩ সালে সংশোধন করা হয়। এতে জনসমাগমস্থলে ধূমপান নিষিদ্ধ, বিজ্ঞাপন ও প্রচার সীমিত, তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে সতর্কীকরণ বার্তা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
তবে সমস্যাটি হলো, তামাক কোম্পানির প্রভাব। আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিলেই তারা “রাজস্ব ক্ষতির ভয়” দেখায়। অথচ বাস্তবতা হলো:
২০০৫ সালের পর থেকে সরকারের রাজস্ব আয় বেড়েছে সাড়ে ১২ গুণ।
২০০৯ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে তামাক ব্যবহার ১৮% কমলেও রাজস্বে কোনো ক্ষতি হয়নি।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে উপদেষ্টা কমিটিতে তামাক কোম্পানির মতামত নেওয়ার সিদ্ধান্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এফসিটিসি আর্টিকেল ৫.৩-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এতে জনস্বাস্থ্য বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) Framework Convention on Tobacco Control (FCTC) প্রণয়ন করেছে, যেখানে তামাক নিয়ন্ত্রণের জন্য কঠোর নীতি গ্রহণের সুপারিশ রয়েছে। বিশেষ করে আর্টিকেল ৫.৩ অনুযায়ী, তামাক কোম্পানির নীতি প্রণয়নে হস্তক্ষেপ প্রতিহত করতে হবে। বাংলাদেশ এই কনভেনশনে স্বাক্ষর করলেও বাস্তবায়নে পিছিয়ে রয়েছে।
এই ভয়াবহতা রোধে –জনসমাগমস্থলে ধূমপান পুরোপুরি নিষিদ্ধ করতে হবে।তামাক কোম্পানির বিজ্ঞাপন ও স্পন্সরশিপ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে।তামাকজাত দ্রব্যের দাম বাড়িয়ে সহজলভ্যতা কমাতে হবে।স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে তামাক ও নেশার ক্ষতিকর দিক নিয়ে পাঠ্যসূচি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে “তামাকবিরোধী আন্দোলন” গড়ে তুলতে হবে।পরিবার থেকেই সন্তানকে নেশামুক্ত জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।সমাজের সচেতন মহলকে তামাকবিরোধী প্রচারণায় যুক্ত করতে হবে।তামাক চাষিদের জন্য বিকল্প ফসল চাষে প্রণোদনা দিতে হবে।তামাক শিল্পের শ্রমিকদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।গণমাধ্যমে ধারাবাহিক প্রচারণা চালাতে হবে।তামাকজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে আরও গবেষণা করতে হবে।বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষার জন্য এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
তামাক শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা নয়; এটি অর্থনৈতিক ক্ষতি, সামাজিক অবক্ষয় ও জাতীয় উন্নয়নের অন্তরায়। সরকার, অভিভাবক, শিক্ষক, গণমাধ্যম ও তরুণ সমাজকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের প্রত্যেকের অঙ্গীকার করতে হবে—
“তামাক নয়, জীবন চাই; নেশা নয়, সুস্থ ভবিষ্যৎ চাই।”
লেখক: সম্পাদক, শিক্ষাবার্তা।
শিক্ষাবার্তা /এ/ ২৭/০৮/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
