এইমাত্র পাওয়া

“শিক্ষকদের সম্মানে সংসদে ৩০ আসন: সেলিম ভুঁইয়ার ঐতিহাসিক দাবি”

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।। 

শিক্ষক সমাজ একটি জাতির মূল চালিকা শক্তি। একটি দেশের উন্নয়ন, সভ্যতা ও সংস্কৃতির ভিত্তি রচিত হয় শিক্ষা ও শিক্ষকদের হাত ধরে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে শিক্ষক সমাজের কণ্ঠস্বর খুব কমই প্রতিফলিত হয়। ফলে শিক্ষানীতি প্রণয়ন থেকে শুরু করে বাজেট বণ্টন, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি—সবক্ষেত্রেই শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ মতামত প্রায় অনুপস্থিত থাকে। এ কারণে শিক্ষা খাতের প্রকৃত চাহিদা ও বাস্তব সমস্যা সংসদীয় অঙ্গনে যথাযথভাবে আলোচিত হয় না।

এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মো: সেলিম ভুঁইয়া আগামী জাতীয় সংসদে শিক্ষকদের জন্য ৩০টি আসন বরাদ্দ রাখার দাবি তুলেছেন। তার মতে, যেমন কৃষক, শ্রমিক কিংবা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়, তেমনি শিক্ষা খাতের প্রাণশক্তি শিক্ষক সমাজকেও সংসদে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ দিতে হবে। কারণ শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতি উন্নত হতে পারে না, আর শিক্ষা খাতের উন্নয়ন নির্ভর করে শিক্ষকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হওয়ার ওপর।

জাতীয় সংসদে ৩০টি আসন শিক্ষকদের জন্য বরাদ্দ হলে তারা সরাসরি আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারবেন। এতে শিক্ষাখাতের সমস্যাগুলো স্পষ্টভাবে উপস্থাপন ও সমাধানের পথ খুঁজে বের করা সহজ হবে। একইসঙ্গে এটি শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধি করবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

সেলিম ভুঁইয়ার এই দাবি মূলত শিক্ষক সমাজকে নীতিনির্ধারণী অঙ্গনে শক্তিশালী কণ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার আহ্বান। তার মতে, শিক্ষা খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হলে সংসদে শিক্ষকদের জন্য নির্দিষ্ট আসন বরাদ্দ করাই সময়ের দাবি।

বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে শিক্ষা খাতকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে ধরা হয়। একটি জাতিকে এগিয়ে নিতে হলে প্রয়োজন আলোকিত প্রজন্ম, আর সেই প্রজন্ম গড়ে তোলেন শিক্ষকরা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, দেশের সবচেয়ে বড় শিক্ষিত ও প্রভাবশালী শ্রেণি হয়েও জাতীয় সংসদে শিক্ষকদের সরাসরি কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মো: সেলিম ভুঁইয়া জাতীয় সংসদে শিক্ষকদের জন্য ৩০টি আসনের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর এই দাবি শুধু শিক্ষকদের স্বার্থ রক্ষার জন্য নয়, বরং সমগ্র জাতির অগ্রগতির জন্যও একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ হতে পারে।

প্রথমত, শিক্ষকরা সমাজে আলোকবর্তিকা। তাঁদের হাতে গড়ে ওঠে ডাক্তার, প্রকৌশলী, আমলা, রাজনীতিক—অর্থাৎ দেশের ভবিষ্যত নেতৃত্ব। অথচ নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে তাঁদের কণ্ঠস্বর প্রায় অনুপস্থিত। সংসদে শিক্ষকদের জন্য সংরক্ষিত আসন থাকলে শিক্ষা নীতি প্রণয়ন, পাঠ্যক্রম সংস্কার, শিক্ষকদের অধিকার এবং মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার প্রতিফলন ঘটবে।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষা খাতের সমস্যাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই অবহেলিত। যেমন—শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, পদোন্নতিতে বৈষম্য, অবসর ভাতা ও কল্যাণ ট্রাস্টে অনিশ্চয়তা, গবেষণার অপ্রতুল সুযোগ ইত্যাদি। সংসদে শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্ব থাকলে এসব সমস্যা সরাসরি আলোচনায় আসবে এবং নীতি নির্ধারণে কার্যকর সমাধান সম্ভব হবে।

তৃতীয়ত, বর্তমানে জাতীয় সংসদে ব্যবসায়ী, কৃষক ও শ্রমিকদের প্রতিনিধি রয়েছেন। শিক্ষা খাত, যা উন্নয়নের প্রাণশক্তি, সেখানে সরাসরি কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। অথচ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শিক্ষার ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাই শিক্ষকদের জন্য ৩০টি আসন শুধু একটি দাবি নয়, এটি জাতীয় প্রয়োজনও বটে।

এই দাবি বাস্তবায়িত হলে শিক্ষকদের মর্যাদা, পেশাগত নিরাপত্তা এবং শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে গভীর প্রভাব পড়বে।

শিক্ষকরা বলছেন- সংসদে শিক্ষকদের জন্য সংরক্ষিত আসন শিক্ষক সমাজের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করবে। বর্তমানে শিক্ষকদের চাকরির নিরাপত্তা ও আর্থিক সুবিধা সীমিত, যা তাদের পেশাগত উৎসাহকে কমিয়ে দেয়। সংসদে প্রতিনিধিত্ব তাদের কণ্ঠকে শক্তিশালী করবে, ফলে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা, অবসর বয়স বৃদ্ধি এবং জাতীয়করণের মতো দাবি দ্রুত বাস্তবায়নের সম্ভাবনা বাড়বে। শিক্ষকদের সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত মান উন্নয়নে সহায়ক হবে। শিক্ষকরা শিক্ষা নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সরাসরি অংশ নিতে পারবেন। ফলে, শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক ও বৈষম্যহীন শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এছাড়া, শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা শিক্ষা সংস্কারে নতুন মাত্রা যোগ করবে। এই উদ্যোগ শিক্ষকদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও ঐক্য বাড়াবে। তারা অনুভব করবেন যে তাদের পেশার মূল্যায়ন হচ্ছে, যা শ্রেণিকক্ষে উন্নত পাঠদানে উৎসাহিত করবে। তবে, এই দাবি বাস্তবায়নে রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। রাজনৈতিক প্রভাব থেকে শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্ব মুক্ত রাখা চ্যালেঞ্জ হবে।

জাতীয় সংসদে শিক্ষকদের জন্য ৩০টি আসন বরাদ্দের দাবি শিক্ষক সমাজে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শিক্ষকরা এই প্রস্তাবকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন। অনেক শিক্ষক এই দাবিকে সমর্থন করছেন, কারণ তারা মনে করেন, সংসদে শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্ব শিক্ষা খাতের সমস্যাগুলো তুলে ধরতে এবং নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণ, বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ও উৎসব ভাতার মতো দাবিগুলো সংসদে শক্তিশালী উপস্থাপনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন সম্ভব বলে তারা বিশ্বাস করেন।

তবে, কিছু শিক্ষক এই দাবির ব্যবহারিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা মনে করেন, ৩০টি আসন বরাদ্দের দাবি অবাস্তব হতে পারে, কারণ এটি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সংসদের গঠনতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। কেউ কেউ আশঙ্কা করেন, এই দাবি শিক্ষক সমাজকে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে টেনে আনতে পারে, যা শিক্ষার নিরপেক্ষতা ও পেশাগত মর্যাদাকে প্রভাবিত করতে পারে।

অন্যদিকে, শিক্ষকদের একটি অংশ এই দাবিকে শিক্ষক সমাজের দীর্ঘদিনের অবহেলার প্রতিবাদ হিসেবে দেখছেন। ঠাকুরগাঁও জেলা শিক্ষক কর্মচারী ঐক্য জোটের সভাপতি  মোঃ তাজউদ্দীন তাজু বলছেন, শিক্ষকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য এমন একটি পদক্ষেপ সময়ের দাবি। সামগ্রিকভাবে, এই দাবি শিক্ষকদের মধ্যে উৎসাহের পাশাপাশি বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। এটি শিক্ষা খাতের উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, তবে এর বাস্তবায়ন নির্ভর করবে রাজনৈতিক ঐক্য ও কৌশলগত পরিকল্পনার উপর।

 অধ্যক্ষ মো. সেলিম ভূঁইয়ার  দাবি এই আসন বরাদ্দ  শিক্ষক সমাজের মর্যাদা ও প্রভাব বৃদ্ধির একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ। শিক্ষকরা জাতির ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, কিন্তু তাঁদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাব শিক্ষার গুণগত মানকে প্রভাবিত করে। সেলিম ভূঁইয়ার এই দাবি শিক্ষকদের সম্মান ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারে তাঁদের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রয়াস। জাতীয় সংসদে শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্ব শিক্ষানীতি প্রণয়নে তাঁদের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত করবে, যা শিক্ষার মানোন্নয়নে সহায়ক হবে। তিনি উল্লেখ করেছেন, শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণ, বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ও উৎসব ভাতার মতো সুবিধা প্রদান এবং অবসরের বয়স ৬৫ বছর করার মতো দাবিগুলো বাস্তবায়নে সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব গুরুত্বপূর্ণ। এই দাবি শিক্ষকদের প্রতি সামাজিক ও রাজনৈতিক অবহেলা কমাতে এবং তাঁদের কণ্ঠকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরতে সহায়ক হবে। তবে, এই প্রস্তাব বাস্তবায়নে রাজনৈতিক ঐকমত্য, আইনি কাঠামো এবং ব্যবহারিক প্রয়োগের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন। শিক্ষকদের জন্য সংরক্ষিত আসন শিক্ষা খাতে বৈষম্য কমাতে এবং শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এই উদ্যোগ শিক্ষক সমাজের দীর্ঘদিনের দাবিকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার সার্বিক উন্নয়নে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

লেখক: যুগ্ম-মহাসচিব,

বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটি।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading