ঘুষখোরদের চাকরিতে বহাল: আইনের অপমান

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।। 

বাংলাদেশে দুর্নীতি নতুন কোনো শব্দ নয়। রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে, প্রশাসন থেকে শিক্ষা কিংবা কর ব্যবস্থাপনা—সব জায়গাতেই দুর্নীতি যেন একটি অঘোষিত সংস্কৃতিতে রূপ নিয়েছে। মাঝে মাঝে কারও গ্রেপ্তার বা বরখাস্তের খবর সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়, কিন্তু বাস্তবতা হলো—অধিকাংশ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা বহাল তবিয়তে থেকে যান। কেউ হয়তো কেবল বদলি হন, কেউ আদালতে রিট করে আগের পদে বহাল হয়ে যান, আবার কেউ প্রভাব-প্রতিপত্তি ব্যবহার করে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। প্রশ্ন জাগে, তাহলে দুর্নীতিবাজদের এভাবে টিকে থাকার পেছনে দায় কার?

২০২৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত এক সংবাদে জানা যায়, বগুড়া কর অঞ্চলের সহকারী কর কমিশনার অভিজিৎ কুমার দে ঘুষের অর্ধলাখ টাকাসহ আটক হওয়ার পর চাকরিচ্যুত হয়েছেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়। নিঃসন্দেহে এটি একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। কারণ ঘুষ নেওয়ার মতো জঘন্য অপরাধের জন্য রাষ্ট্র একজন কর্মকর্তাকে শাস্তি দিয়েছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে—এমন পদক্ষেপ কি সব ক্ষেত্রে নেওয়া হয়?

একই বছরের জুলাই মাসে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়িতে প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নুর মোহাম্মদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়। অভিযোগ ছিল, তিনি নীলফামারী থেকে বদলি হয়ে আসলেও দুর্নীতিপরায়ণ ও ঘুষখোর কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় মানুষজন তাঁকে ফুলবাড়িতে যোগদান করতে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায়—জনগণ দুর্নীতিবাজদের আর সহ্য করতে রাজি নয়। কিন্তু রাষ্ট্র কি একইভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়? দুর্নীতির অভিযোগের পরও এ ধরনের কর্মকর্তারা প্রভাব খাটিয়ে টিকে যান, বরং অনেক সময় ভুক্তভোগী জনগণকেই হয়রানির শিকার হতে হয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) পরিচালক অধ্যাপক কাজী মো. আবু কাইয়ুম শিশির দুর্নীতির অভিযোগে বহুল আলোচিত। ঘুষ ও চাঁদাবাজির অভিযোগ ছাড়াও তিনি অফিসার্স ক্লাবের সদস্য পদ থেকে বরখাস্ত হয়েছেন। এরপর তিনি আদালতে রিট করেছেন এবং বিভিন্ন সময়ে প্রভাবশালী কর্মকাণ্ডে যুক্ত থেকেছেন। এখানেই মূল সমস্যা প্রকট হয়ে ওঠে—একজন সরকারি কর্মকর্তা যখন বারবার দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হন, তখন তাঁর বিরুদ্ধে কেবল সামাজিক প্রতিক্রিয়া নয়, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কার্যকর শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তিনি এখনও বহাল তবিয়তে পদে থেকে যাচ্ছেন।

দুর্নীতি কেন টিকে আছে, তার মূল কারণ হলো—জবাবদিহিতার অভাব। একদিকে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার পায় না, অন্যদিকে ক্ষমতাশালী দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা আদালত, রাজনীতি কিংবা প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে নিজেদের রক্ষা করেন। অনেক সময় দেখা যায়, অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত বা বদলি করা হলেও পরে আবার একই পদে পুনর্বহাল করা হয়। এর ফলে দুর্নীতি দমন কার্যক্রমের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়।

ফুলবাড়ির ঘটনায় আমরা দেখেছি, সাধারণ মানুষ সরব হয়েছে। তারা দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে, তাঁকে যোগদান করতে বাধা দিয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র যদি জনগণের এ দাবির প্রতি সাড়া না দেয়, তবে আন্দোলন সাময়িক হলেও দুর্নীতিবাজরা থেকে যাবে বহাল তবিয়তে। আর এতে করে জনসচেতনতা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে এবং মানুষ রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে।

বাংলাদেশে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আছে, আইন আছে, আদালত আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কতটা কার্যকর এসব প্রতিষ্ঠান? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দুর্নীতিবাজরা আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে পার পেয়ে যান। অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রচ্ছায়ায় এরা অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে।

দুর্নীতির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষা ও রাজস্ব খাত। শিক্ষা খাতে দুর্নীতির ফলে যোগ্যতার পরিবর্তে ঘুষ দিয়ে চাকরি বা পদোন্নতি হয়, ফলে পুরো প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর রাজস্ব খাতে দুর্নীতি হলে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়, যার বোঝা পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর।

সাধারণ মানুষের অভিমত, দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে কোনো কর্মকর্তা যেন আর চাকরিতে বহাল না থাকতে পারেন।দুর্নীতি দমন কমিশন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত করতে হবে। জনগণকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব হতে হবে, তবে সেটি যেন টেকসই হয়। কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও বদলিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। এক-দুটি দৃষ্টান্তমূলক বিচারের মাধ্যমে বোঝাতে হবে যে দুর্নীতি করলে রেহাই নেই।

অভিজিৎ কুমার দে-র মতো কিছু কর্মকর্তা গ্রেপ্তার হয়ে চাকরিচ্যুত হলেও অধিকাংশ দুর্নীতিবাজ এখনও বহাল তবিয়তে আছেন। কাইয়ুম শিশির কিংবা নুর মোহাম্মদদের মতো ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় পদে থাকা প্রমাণ করে যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই এখনও অর্ধেক পথেই থেমে আছে। এভাবে চলতে থাকলে কেবল প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হবে না, বরং পুরো সমাজ দুর্নীতির কাছে আত্মসমর্পণ করবে। তাই রাষ্ট্রকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—দুর্নীতিবাজদের বহাল তবিয়তে রাখবে, নাকি দুর্নীতিমুক্ত একটি প্রশাসন গড়ে তুলবে।

লেখক : যুগ্ম- মহাসচিব,  বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটি।

 


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.