বেসরকারি শিক্ষকদের ন্যায্য দাবী পুরনে সব সরকারই উদাসীন কেনো?

।। বিন-ই-আমিন।।

“শিক্ষা” যেকোনো দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশও ব্যতিক্রম নয়। গুরুত্বপূর্ণ এই সেক্টরের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে মাধ্যমিক শিক্ষা। সাধারন শাখায় স্কুল, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা নিয়ে বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষা জড়িত । প্রতিষ্ঠান স্থাপনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে অপ্রয়োজনীয় জায়গায় ও অল্পদুরত্বের ব্যবধানে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেছে। সেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান নিয়েও আছে নানান প্রশ্ন। কিন্তু সে দায় বহন করতে হচ্ছে পুরো বেসরকারি শিক্ষক সমাজকে। একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হচ্ছে এসএসসি।

এই পরীক্ষায় একজন শিক্ষার্থীকে প্রস্তত করতে একজন শিক্ষককে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। বিভিন্ন কোয়ালিটির মেধাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের সবাইকে উত্তীর্ণ করতে অনেক মেধাশ্রম খরচ করে একজন শিক্ষার্থীকে এসএসসি পাস করতে সহায়তা করেন একজন মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষক। দিনশেষে মাত্র ৪২০ টাকা বেতন থেকে চাকরি জীবন শুরু। ক্ষেত্র বিশেষে এই সামান্য বেতনের তারতম্য থাকলেও সময় ও চাহিদার তুলনায় তা খুবই অপ্রতুল। যেখানে একজন দিনমজুর দৈনিক কমপক্ষে ৭০০ টাকা মজুরিতে মাসে ২১০০০ টাকা আয় করেন। সেখানে একজন কমপক্ষে স্নাতক ডিগ্রিধারী ব্যক্তির বেতন মাত্র ৪২০ টাকা! ভাবা যায়!!
তারপরও থেমে নেই একজন শিক্ষক। একজন মানুষ গড়ার কারিগর। একজন মহান পেশার মানুষ। তার সংসার আছে। আত্নীয় পরিজন আছে। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করতে হয়। ছেলেমেয়েদের নতুন জামাকাপড় কিনে দিতে হয়। কিন্তু এসবের জন্য বাড়তি টাকা কোথায়? ২০০৪ সাল থেকে উৎসব ভাতার মাত্র ২৫ ভাগ পেয়ে আসছিলো বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষক। যার শিক্ষাগত যোগ্যতা কমপক্ষে ডিগ্রি। উৎসবেরও ভাগ হয় তা কেবল বাংলাদেশে।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার শিক্ষকদের উৎসবভাতা শতকরা ২৫ ভাগকে ৫০ ভাগে উন্নীত করেছে। সরকারের স্বদিচ্ছা থাকলেও কোনো এক অদৃশ্য কারনে শিক্ষকদের দাবী পুরন হচ্ছেনা তা শিক্ষক সমাজ জানে। বিভিন্ন সময়ে সরকার ও রাজনৈতিক দল বেসরকারি শিক্ষকদের নিয়ে এতো উদাসীনতা কেনো? অথচ সরকারের সকল ভালো কাজের প্রশংসা ও প্রচার বেসরকারি শিক্ষক – কর্মচারীদের মাধ্যমেই প্রচারিত হয় বেশি। সরকারী কোনো কর্মসূচীই বেসরকারি শিক্ষক শিক্ষার্থী ছাড়া সফল হয়না। বিগত সময়ে নতুন পে-স্কেলে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সংবাদে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে, রাস্তায় নেমে সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর ইতিহাস একমাত্র বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারীদের। অথচ বেতন বাড়ে সবার। রাস্তায় নেমে মাইক বাজিয়ে কৃতজ্ঞতা জানায় বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারীগণ। সবচেয়ে বেশি সুবিধা নেয় সরকারি কর্মকর্তা- কর্মচারীরা। আর সন্তুষ্টির প্রচার করে বেসরকারি শিক্ষক সমাজ।

বেসরকারি শিক্ষক সমাজ অল্পতেই তুষ্ট। তাদের সামান্য বেতনে তিন বেলা খেয়ে দিনাতিপাত করাই যেখানে চ্যালেঞ্জ, সেখানে আত্নীয়-স্বজনের সাথে সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখা কঠিন।। অথচ একজন সরকারি দপ্তরের পিওনের বাড়ি- গাড়ি থাকে। বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন থেকে প্রতি মাসে ১০% কর্তণ করা হয় অবসর ও কল্যাণ তহবিলের জন্য। ৬% অবসর ও ৪% কল্যাণ তহবিলের এই টাকা শিক্ষক কর্মচারীদের অবসরে ৪-৫ বছর পর হাতে পাওয়ার সৌভাগ্য হয়। অনেকে না পাওয়ার বেদনায় পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। টেনশনে টেনশনে কেউ আবার বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হন। বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারীদের সহিত দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বৈষম্যের অবসান কী কোনো আমলেই হবেনা?

শিক্ষাকে জাতির মেরুদণ্ড বিবেচনা করে চলে আসা দীর্ঘদিনের প্রচলন শুধু মুখে মুখে এবং কাগজে কলমে। বাস্তবে নাই কিছুই। একজন শিক্ষকের মেরুদণ্ড সোজা করে চলার মতো আর্থিক সুযোগ -সুবিধা কেউ কখনো দেয়নি। সবাই কেবল খাটিয়েছে তাদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য।

মাসে ১হাজার টাকা বাড়িভাড়া বাংলাদেশের কোথায় আছে? একজন শিক্ষককে নতুন জামাকাপড় পড়ে,নিজেকে স্মার্ট করে,পরিচ্ছন্ন ভাবে ক্লাসে আসতে হয়। কারন তাকে অনুসরণ করে সবাই। কথায় বলে পেটে দিলে- পিঠে সয়। বেসরকারিদের শুধু পিঠে সইতে হচ্ছে। পেটে কিছু জুটছে না। শিক্ষকদের অভুক্ত রেখে কোনো জাতির মঙ্গল হয়না। যেদেশে একজন মন্ত্রীর কাজের লোক ৪শ কোটি টাকার মালিক। একজন মন্ত্রীর বিভিন্ন দেশে হাজারো বাড়ি,মন্ত্রীর উপদেষ্টা লেবাসধারী সেজে লুটেপুটে খায় দেশের অর্থনীতি ও শেয়ারবাজার , সেই দেশে শিক্ষকদের ঠকিয়ে কে কতো বড় হতে পেরেছে? ইতিহাস থেকে আমরা শিক্ষা নেই না। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করেনা। সম্পদের সুষম বন্টন না হলে,”শক্তের ভক্ত নরমের জম” – নীতি বেশি দিন টেকসই হয়না। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য শক্তিশালীদের সকল সুবিধা দিয়ে ক্ষমতা থাকার পরও বৈষম্য ও অবিচারের জন্য বিচারকের বিচার একদিন হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

বেসরকারি শিক্ষক সমাজ যুগ যুগ ধরে অবহেলিত। তাদের নিয়ে ভাবার সময় কারো নেই। কেউ বলে -“সাধ আছে,সাধ্য নাই”, কেউ বলে শিক্ষকদের আন্দোলন কিভাবে দমন করতে হয় তা জানা আছে,কেউ বলে “বঙ্গোপসাগরে সব জল তেল হলে বেসরকারি শিক্ষা জাতীয়করণ সম্ভব”, কেউ নিজেদের নামের প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করে,কেউ বলে কোনো চাকরী না পেয়ে শিক্ষক হয় এবং ঘটনাক্রমে শিক্ষক, কেউ আবার বেতনকে অমুদান হিসেবে চালিয়ে দেয়। আজ তারা কোথায়? বেসরকারি শিক্ষক সমাজ ঠিকই মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে আছে। যখন যারাই বেসরকারি শিক্ষকদের অবহেলা করেছে, সৃষ্টিকর্তার হিসাবও সেভাবে হয়েছে। শিক্ষকদের ন্যায্য দাবীর আন্দোলনে মরিচের গুঁড়া নিক্ষেপ, শিক্ষকদের রাস্তায় ফেলে পিটানো, মাদরাসা সুপারের মাথায় মল ঢালা,প্রধান শিক্ষককে জনসমক্ষে কান ধরে ওঠবস করানোর পরিনতি কখনও ভালো হয়নি।

সময়ের কাজ সময়ে করা ভালো। বেসরকারি শিক্ষক সমাজ নিয়ে কেউ ভাবলে তাকে সহযোগিতা করা রাজনৈতিক দলের নৈতিক দায়িত্ব। এখানে রাজনীতি করলে ফল সুখকর হয়না।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ও মাননীয় শিক্ষা উপদেষ্টার প্রতি বেসরকারি শিক্ষক সমাজের প্রাণের দাবী,এই মুহূর্তে সকল বেসরকারি শিক্ষক- কর্মচারী জাতীয়করণ সম্ভব না হলেও কমপক্ষে ৩০ শতাংশ বাড়িভাড়া,সরকারি নিয়মে চিকিৎসা ভাতা,উৎসবভাতা,বদলী সহ তাদের আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধি করে তাদের জীবন মানের উন্নতি করে সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশে শিক্ষা দানের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন এ আশা বেসরকারি শিক্ষক সমাজের। ক্ষমতা কারো চিরস্থায়ী নয়। আপনাদের অবস্থান থেকে বেসরকারি শিক্ষকদের প্রতি চলে আসা দীর্ঘদিনের অন্যায়,অবিচার থেকে তাদের যৌক্তিক দাবী পুরনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন এ প্রত্যাশা দেশের সকল বেসরকারি শিক্ষক সমাজর।##

লেখক:

বিন-ই-আমিন
সভাপতি, মাধ্যমিক শিক্ষক ফোরাম নলছিটি
শিক্ষক, নলছিটি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঝালকাঠি।
শিক্ষাবার্তা’র সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য।
মোবাইল :০১৭১২৬৩৭৭২২


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.